এরশাদ আর নেই

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২০ | ১৫ মাঘ ১৪২৬

এরশাদ আর নেই

পরিবর্তন প্রতিবেদক ৮:৩৪ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০১৯

এরশাদ আর নেই

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

রোববার সকাল পৌনে ৮টার দিকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে আইএসপিআর ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য খালেদ আখতার।

মৃত্যুকালে এরশাদের বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তিনি স্ত্রী বেগম রওশদ, ছেলে এরিক এরশাদসহ (প্রাক্তন স্ত্রী বিদিশার সন্তান) অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

সিঙ্গাপুর থেকে এক দফা চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে গত ২৭ জুন সকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এরশাদ। এরপর তাকে সিএমএইচে ভর্তি করা হয়।

সেখানে স্বাস্থ্যের অবনতি হলে লাইফ সাপোর্ট রাখা হয় এরশাদকে। রক্তে হিমোগ্লোবিনের স্বল্পতা, ফুসফুসে সংক্রমণ, কিডনি জটিলতা ছাড়াও নানা বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন তিনি। অবশেষে ১৭ দিন পর রোববার তারে মৃত্যু হলো।

এরশাদ ১৯৩০ সালের ২০ মার্চ বর্তমানে কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলায় নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈত্রিক নিবাস অবিভক্ত ভারতের কুচবিহার জেলার দিনহাটা মহকুমা শহরে।

বাবা খ্যাতনামা আইনজীবী মৌলভী মকবুল হোসেনের চাকরির সুবাদে তার বেড়ে ওঠা দিনহাটা মহাকুমায়। ৯ ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয় এরশাদের ডাক নাম পেয়ারা।

দিনহাটা হাইস্কুল থেকে ১৯৪৬ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন এরশাদ। পরে চৌকস এই ফুটবলার রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও বাংলা বিভাগে বিএ পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে এমএ-তে ভর্তি হন। একই সঙ্গে তিনি আইনেও ভর্তি হয়েছিলেন। উভয় বিষয়ে প্রিলিমিনারী পাস করেন। কিন্তু, ফাইনাল পরীক্ষার আগেই সেনাবাহিনীতে কমিশন অফিসার হিসেবে চাকরি নেন। ফলে আর এমএ পাস করা হয়নি।

১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি এরশাদ তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের কোহাট সেনানিবাসে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে যোগদান করেন। ১৯৫২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর কমিশন লাভ করেন। ১৯৫৩ সালের ১ মার্চ তিনি কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে পদাতিক বাহিনীর সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদান করেন।

১৯৫৪ সালে এরশাদ ময়মনসিংহের খানসাহেব উমেদ আলীর মেয়ে রওশন আরা ডেইজিকে বিয়ে করেন। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় চুয়াডাঙ্গা সেক্টরে মেজর পদে থেকে একটি কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পান।

১৯৬৬ সালে কোয়েটা স্টাফ কলেজে স্টাফ কোর্স সম্পন্ন করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি শিয়ালকোটে ৫৪তম ব্রিগেডের ডিকিউ ছিলেন। এরপর তিনি সপ্তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ডের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর রংপুরে তৃতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার হিসেবে যোগদান করেন।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ এরশাদকে করাচির মালি ক্যান্টনমেন্টে বদলি করা হয়। বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে বাঙালি অন্য সেনা-অফিসারদের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানে আটকা পড়েন। দেশ স্বাধীন হলে তাকে অন্যদের সঙ্গে পাকিস্তানে বন্দি করা হয়।

বন্দি জীবন থেকে ১৯৭৩ সালে এরশাদ লেফটেন্যান্ট কর্নেল অবস্থায় স্বাধীন বাংলাদেশে আসেন। ১৯৭৩ সালের ১২ ডিসেম্বর কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি পান। পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর ১৯৭৮ সালের ১ ডিসেম্বর এরশাদ সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ নিয়োগ পান। ১৯৭৯ সালের ৭ নভেম্বর লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নীত হন।

১৯৮১ সালের ৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নিহতের পর প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে সরিয়ে ১৯৮৪ সালের ২৪ মার্চ তখনকার সেনাপ্রধান এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি জাতীয় পার্টি গঠনের মাধ্যমে রাজনীতিতে আসেন। পরে ওই বছরের অক্টোবরে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন।

এর আগেই স্বৈরশাসকের তকমা সরাতে এরশাদ ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ গণভোট আয়োজন করেন। তাতে নিজের পক্ষে ৯৪.১৪ শতাংশ আস্থা ভোট লাভের কথা ঘোষণা করেন।

রাজনৈতিক দল গঠনের পর এরশাদ ১৯৮৬ সালের ৭ মে সাধারণ নির্বাচন দেন। তাতে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী অংশ নিলেও বিএনপি বয়কট করে। একতরফা নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ১৫৩ আসন লাভ করে সরকার গঠন করে।

এরপর ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতার মেয়াদ আরেক দফা বাড়ান এরশাদ। কিন্তু, এবারের নির্বাচন সবক’টি শীর্ষ রাজনৈতিক দল বর্জন করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন জোরদার করে। আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ সব দলের যুগপৎ আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পতন হয় স্বৈরাচার এরশাদ জমানার।

এরপর ১৯৯০ সালের ১২ ডিসেম্বর স্ত্রী রওশন, পুত্র শাদ ও মেয়ে জেবিনসহ এরশাদকে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মামলায় কারাগারে যেতে হয়। জেলে বসেই ১৯৯১ সালের নির্বাচনে উত্তরবঙ্গে ৫টি আসনে বিজয়ী হন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও জেলে থেকে ৫টি আসনে বিজয়ী হন। ওই নির্বাচনে এরশাদ আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিলে ২২ বছর পর ক্ষমতায় আসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন দলটি। এরপর ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি মুক্তি পান তিনি।

পরবর্তীতে এরশাদ বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটে যুক্ত হলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাকে জেলে পাঠায়। ৪ মাস ১১ দিন কারাভোগের পর ২০০১ সালে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে মুক্তি পান।

২০০১ সালের নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি এককভাবে অংশ নিলেও নিজে অযোগ্য হন। ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মহাজোট গঠন করেন। এরপরই বিএনপির একগুয়ে অবস্থানের কারণে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আসে আলোচিত ওয়ান-ইলেভেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৩টি আসনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সরকার গঠন করেন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে এরশাদ তার ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটান। বিএনপি ওই নির্বাচন বর্জন করে। আর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে সিএমএইচে থেকেই এমপি হন এরশাদ। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত হন এবং তার দলের নেতারা মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পান।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এরশাদ বিজয়ী হয়ে বিরোধীদলীয় নেতা হয়েছেন।

রাজনৈতিক পরিচয়ে বাইরে এরশাদ ছিলেন কবি, গীতিকার ও প্রাবন্ধিক। কবিতা, প্রবন্ধ ও আত্মজীবনী মিলিয়ে মোট ২৫টি বই প্রকাশিত হয়েছে তার।

ওএস/আরপি

আরও পড়ুন...
ইতিহাসে অমোচনীয় স্বাক্ষর রেখেছেন এরশাদ: বি. চৌধুরী
এরশাদের মতো মানুষ আর আসবে না: ছেলে এরিক
এরশাদের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক
চার স্থানে এরশাদের নামাজে জানাজা
এরশাদের মৃত্যুতে বিদিশার আবেগঘন স্ট্যাটাস

 

জাতীয়: আরও পড়ুন

আরও