যৌনকর্মে ব্যবহার করা হচ্ছে রোহিঙ্গা শিশুদের

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮ | ১১ বৈশাখ ১৪২৫

যৌনকর্মে ব্যবহার করা হচ্ছে রোহিঙ্গা শিশুদের

পরিবর্তন ডেস্ক ৪:৩০ অপরাহ্ণ, মার্চ ২১, ২০১৮

print
যৌনকর্মে ব্যবহার করা হচ্ছে রোহিঙ্গা শিশুদের

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী রোহিঙ্গা মেয়েদের যৌনকর্মে নিযুক্ত করা হচ্ছে বলে বৃটিশ গণমাধ্যম বিবিসির একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসছে। বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশিরা রোহিঙ্গা শিশুদের খুব সহজেই হাতের নাগালে পেয়ে যাওয়ায় মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা এসব শিশু এখন নতুন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

পরিবারের সবাই নিহত হওয়ার পর মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা আনোয়ারা (১৪) বলেন, কক্সবাজারে দুজন ছেলে তাকে ছুরি ঠেকিয়ে ধর্ষণ করে।

শরণার্থী ক্যাম্পের আশেপাশে এমন ঘটনা প্রচুর ঘটছে। নারী ও শিশুরা এর প্রধান শিকার। তাদেরকে প্রলোভন দেখিয়ে শরণার্থী ক্যাম্পের বাইরে নিয়ে এসে যৌনকর্মে করা হচ্ছে।

ফাউন্ডেশন সেন্টিনেল ও বিবিসির একটি দল বহুশ্রুত এই ব্যবসার নেটওয়ার্ক অনুসন্ধান করতে বাংলাদেশে আসে। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন সেন্টিনেল আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে শিশুদের শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।

শিশু ও তাদের বাবা-মায়েরা বিবিসিকে বলেন, তাদেরকে ঢাকা ও দেশের বাইরের বিভিন্ন স্থানে গৃহপরিচারিকা, হোটেল স্টাফ এবং রাঁধুনির কাজ দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

শরণার্থী ক্যাম্পের বিশৃঙ্খলা শিশুদের যৌনকর্মে নিয়ে আসতে সহায়তা করছে। দালালরা আশাহীন মরিয়া পরিবারগুলোকে উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখানোর মতো নিষ্ঠুর কৌশল ব্যবহার করছে।

বর্তমানে একটি স্থানীয় দাতব্য সংস্থার আশ্রয়ে থাকা মাসুদা (১৪) তার যৌনকর্মে আসার ঘটনা বর্ণনা করে।

মাসুদা বলে, 'আমি জানতাম আমার সাথে কী ঘটতে যাচ্ছে। যে মহিলা আমাকে কাজের প্রস্তাব নিয়ে আসেন, সবাই জানে উনি দালালি করেন। উনি এখানে অনেকদিন ধরে রোহিঙ্গা হিসেবে বাস করছেন। কিন্তু আমার কিছু করার ছিল না। এখানে আমার কিছুই নেই।’

‘আমার পরিবার হারিয়ে গেছে। আমার কাছে কোনো টাকা-পয়সা নেই। মিয়ানমারে আমাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। জঙ্গলে আমার ভাইবোনের সাথে খেলতাম। কীভাবে খেলাধুলা করে এখন আর আমার মনেও নেই।’

অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের আর কখনো দেখতে পাবেন না এই ভয়ে কাঁদেন। আবার অনেকে তাদের আদরের সন্তানের কোনো খবর না পেলেও, উন্নত জীবনের সম্ভাবনায় উৎফুল্ল হয়ে থাকেন।

কিন্তু এসব শিশুদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং কারা নিয়ে যাচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিবিসির অনুসন্ধানী দল সদ্য বাংলাদেশে আসা বিদেশি সেজে শিশুদের যৌনকর্মী হিসেবে পাওয়া যায় নাকি তা খুঁজতে বেরোয়।

মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ছোট ছোট হোটেল আর সৈকতের কটেজে খোঁজ নিয়ে স্থানীয় দালালদের নাম্বার জোগাড় করে ফেলেন তারা। এসব হোটেল আর কটেজ দেহ ব্যসার জন্য কুখ্যাত।

তারা দালালদের জিজ্ঞেস করেন, একজন বিদেশির জন্য কম বয়সী মেয়ে, বিশেষত রোহিঙ্গা মেয়ে, পাওয়া যাবে কিনা।

জবাবে একজন দালাল বলেন, ‘আমাদের কাছে বাচ্চা মেয়ে আছে, কিন্তু রোহিঙ্গা খুঁজছেন কেন আপনারা? ওরা সবচেয়ে নোংরা।’

বিবিসির প্রতিবেদকরা বলেন, অনুসন্ধানের পুরোটা সময় এই বিষয়টি বার বার শোনা গেছে। কক্সবাজারে যৌনপেশায় শ্রেণিক্রমে রোহিঙ্গা মেয়েদের সবচেয়ে সবচেয়ে কম আকর্ষণীয় ও সস্তা বলে বিবেচনা করা হয়।

একটি চক্রের বহু ধরনের দালাল রিপোর্টারদের বিভিন্ন ধরনের মেয়েদের ছবি দেখান। সব মেয়েদের বয়স ১৩ থেকে ১৭ বলে দাবী করেন তারা।

যৌনকর্মে নিযুক্ত মেয়েদের সংখ্যা ও দালালচক্রের বিস্তার রিপোর্টারদের বিস্মিত করে।

অনেক মেয়েই দালালদের পরিবারের সাথে থাকে। কোনও খদ্দেরের সাথে না থাকলে তারা দালালদের বাড়িতে রান্না ও ঘরদোর পরিষ্কারের কাজ করে।

ছদ্মবেশী রিপোর্টারদের দালালরা জানায়, 'আমরা এসব মেয়েদের বেশিদিন রাখি না। মূলত বাংলাদেশিরা আসে এদের জন্য। তারা কিছুদিন পরেই বিরক্ত হয়ে যায়। অল্প বয়সী মেয়েরা অনেক বেশি ঝামেলা করে, একারনে তাদেরকে বিদেয় করে দিই।'

রেকর্ড তথ্য প্রমাণ স্থানীয় পুলিশকে হস্তান্তর করেন রিপোর্টাররা। ফাঁদ পেতে দালালদের ধরার জন্য একটি ছোট দল প্রস্তুত করেন তারা।

দালালের ছবি দেখেই তাকে তৎক্ষণাৎ সনাক্ত করতে সক্ষম হয় পুলিশ। একজন পুলিশ অফিসার বলেন, 'আমি একে চিনি। আমরা একে খুব ভাল করে চিনি।' কিন্তু, সে পুলিশের ইনফর্মার নাকি চিহ্নিত অপরাধী তা বুঝা যায়নি।

এরপর ওই দালালকে ফোন করে রিপোর্টাররা বলেন ছবিতে দেখা দুটি মেয়েকে কক্সবাজারের একটি বিখ্যাত হোটেলের সন্ধ্যা ৮:০০টায় নিয়ে আসতে।

ফাউন্ডেশন সেন্টিনেলের এক কর্মী অনুবাদক হিসেবে হোটেলের বাইরে অপেক্ষা করছিলো।

হোটেলের কার পার্কে অপেক্ষা করছিলো পুলিশ। রাত আটটার দিকে বেশ কিছু ফোন কলের পর একটি গাড়িতে করে ড্রাইভারের সাথে ছবিতে দেখা মেয়ে দুটিকে পাঠানো হয়।

বিদেশী খদ্দের সেজে থাকা ব্যক্তিটি আজ রাতের পরে আরো মেয়ে পাওয়া যাবে কিনা, জানতে চাইলে গাড়ির চালক সম্মতি সূচক মাথা নাড়ে। টাকা হস্তান্তরের পরই পুলিশ গাড়ির চালককে গ্রেফতার করে।

মেয়ে দুটিকে উদ্ধার করে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। দরিদ্র আর যৌনকর্মের জালে যেন এই মেয়ে দুটি আটকে গেছে। তারা জানায় যৌনপেশা ছাড়া জীবন চালানো তাদের জন্য খুব কঠিন।

আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পর্যায়ে নারী ও শিশু পাচারে খুব শক্তিশালী নেটওয়ার্ক দরকার হয়। এ ক্ষেত্রে ইন্টারনেট এখন যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

রোহিঙ্গা মেয়েদের বাংলাদেশের ঢাকা, নেপালের কাঠমান্ডু ও ভারতের কোলকাতায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

কোলকাতায় ব্যস্ত যৌন ব্যবসায় এরকম অনেক নারীদের পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা করে দেয়া হচ্ছে।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে মিলেমিশে যাচ্ছে তারা। এর পর তাদের আজ খোঁজ মিলছে না।

ঢাকায় পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটে গিয়ে জানা গেলো কিভাবে ইন্টারনেটের সহায়তায় পাচারকারীরা মেয়েদের পাচার করে।

এজন্য গড়ে উঠেছে নানা ফেইসবুক পাতা ও এনক্রিপটেড বা গোপন ওয়েবসাইট।

এমন ওয়েবসাইটও পাওয়া গেলো যেখানে কিভাবে রোহিঙ্গা মেয়েদের ব্যবহার করা যায় সেনিয়ে ধাপে ধাপে তথ্য দেয়া হয়েছে।

কিভাবে ধরা পড়ার হাত থেকে বাঁচা যায়, কোন এলাকায় সবচাইতে বেশি শিশু পাওয়া যায় এমন সব তথ্য দিয়েছে এক ব্যক্তি।

এই ওয়েবসাইটটি পুলিশ সরিয়ে ফেলেছে। তবে তার আগে সেটি যাচাই করে জানা গেছে কিভাবে শিশুকামী ও পাচারকারীদের টার্গেট হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা শিশু ও নারীরা।

রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশে নতুন সেক্স ইন্ডাস্ট্রি গড়ে না উঠলেও যৌনকর্মী হিসেবে কাজের জন্য মেয়ে সরবরাহ বেড়ে গেছে। আর সেটির অন্যতম শিকার রোহিঙ্গা মেয়েরা।

এমআর/এএসটি

 
.




আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad