বিচ্ছেদ বাড়ছে দেশে

ঢাকা, বুধবার, ২৩ মে ২০১৮ | ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫

বিচ্ছেদ বাড়ছে দেশে

নিজস্ব প্রতিবেদক ৪:০৪ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৮

print
বিচ্ছেদ বাড়ছে দেশে

বন্ধুত্ব-প্রেম, ভালোবাসা নিয়ে দিবসের কমতি নেই, প্রকাশের আড়ম্বরতারও ঘাটতি নেই কোথাও। এর পরও দিন দিন ভাঙছে সম্পর্ক ও সংসার। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য, পরস্পরের প্রতি সহিষ্ণুতা, ছাড় দেওয়ার মানসিকতা হারিয়ে ফেলা এবং সামাজিক নানা অভিঘাতের ফলে ভালোবাসার বন্ধন মুহূর্তেই ছিন্ন করছে মানুষ।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর গত বছরের এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশে প্রতি হাজারে বিবাহ বিচ্ছেদের হার ১ দশমিক ১ জন। এ হার ২০১৬ সালে ছিল মাত্র দশমিক ৬ জন। বিবাহ বিচ্ছেদ না ঘটিয়ে পৃথক থাকার প্রবণতাও বাড়ছে দিন দিন। পরিসংখ্যান বলছে, এ হার প্রতি হাজারে দশমিক ৬ জনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, এটা আগে ছিল দশমিক ২।

  পরিসংখ্যান ব্যুরো তথ্যমতে দাম্পত্য কলহ, জীবিকার অভাব, অনৈতিক চর্চা, অনিরাময়যোগ্য রোগ, শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নির্যাতন, যৌতুক, অপ্রাপ্তবয়স্ক বিয়ে, বন্ধ্যত্ব আর বহুগামিতার কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ এবং আলাদা থাকার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে নারীরা। এর মধ্যে শহরের চেয়ে গ্রামের নারীরাই বেশি বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনাও শহরের চেয়ে গ্রামে বেশি ঘটছে। পরিসংখ্যান বলছে, অন্তত উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা নারীদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের হার সবচেয়ে বেশি। এ হার প্রতিহাজারে ১ দশমিক ৭। আর অশিক্ষিত নারীদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের হার প্রতি হাজারে দশমিক ৫।  

বিচ্ছেদের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, স্বামীর সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারা, সন্দেহ প্রবণতা, স্বামীর কাছ থেকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, মাদকাসক্তি, পরকীয়া এবং শারীরিক সম্পর্কে অক্ষমতাসহ আরও কয়েকটি কারণে নারীরা বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাচ্ছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, সমাজে তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাবও এর পেছনে ভূমিকার রাখছে। বিশেষ করে মোবাইল ফোন, ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপি, ইমেইলসহ নানা প্রযুক্তির বিকৃত ব্যবহারও সম্পর্কোচ্ছেদে ভূমিকা রাখছে।
এছাড়াও অতিরিক্ত লোভ বা চাহিদা, পরস্পরের প্রতি উদাসীনতা, অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জন, বিদেশি অপসংস্কৃতির প্রভাব ও পারিবারিক শিক্ষার অভাবের কারণে বিচ্ছেদের বেশিরভাগ ঘটনা ঘটেছে।

জাতীয় মহিলা পরিষদ নারীদের তালাকের ক্ষেত্রে প্রধান চারটি কারণ চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো- যৌতুক, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং স্বামীর পরনারীতে আসক্তি। তবে পুরুষরা কী কারণে স্ত্রীদের তালাক দেয় এ ব্যাপার আলাদা কোনো জরিপ মহিলা পরিষদ করেনি। তবে যে সব তথ্য পাওয়া গেছে তা থেকে জানা গেছে নারীকে তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে অধিকাংশ পুরুষই নারীর ‘চরিত্রদোষ’কেই ইঙ্গিত করেছে। এ ছাড়া বনিবনা না হওয়ার ব্যাপারটিও উল্লেখযোগ্য হারে রয়েছে। তবে দুদিক বিবেচনা করে অনেক বিশ্লেষকই বলছেন, ‘পরনারী’ ও ‘পরপুরুষের’ প্রতি আসক্তি বাড়ছে নারী-পুরুষের। এ ক্ষেত্রে ভারতীয় সিরিয়ালকেও অনেকে দায়ী করেছেন বলে উঠে আসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। কারণ ওই সিরিয়ালগুলোর বেশিরভাগ কাহিনীই আবর্তিত হয় পরকীয়া প্রেমকে ঘিরে।

বিবাহ বিচ্ছেদ প্রসঙ্গে মনোবিজ্ঞানী ড. মোহিত কামাল বলেন, পারিবারিক সহিংসতা বাড়ার কারণেও সংসার ভাঙছে। এসব সহিংসতা বাড়ছে কেন? কারণ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। একই ছাদের নিচে বসবাস করলেও তারা কোয়ালিটি টাইম কাটাচ্ছে না। ফলে উভয়ের মধ্যে ইমোশন লেনদেন হচ্ছে না। তাই যে কোনো ছোটখাটো বিষয়ই দুজনের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করছে। এভাবে চলতে চলতে পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ ও আন্তরিকতা কমে যাচ্ছে এবং শেষমেশ সম্পর্কে ফাটল ধরছে।
তিনি বলেন, ফেসবুক বা মোবাইল কালচারের প্রভাবও এখানে রয়েছে। বিশেষ করে ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আমাদের মধ্যে নানা ধরনের আকাক্সক্ষা ও চাহিদা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এখান থেকেই বাড়ছে অপ্রাপ্তিবোধ ও হতাশা।
মোহিত কামাল বলেন, একটা মানুষ সম্পূর্ণ আলাদা আরেকটা মানুষকে বিয়ে করছে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষের গুণ যেমন আছে তেমনি দোষও থাকবে। দুটো মিলিয়েই তো মানুষ। সুতরাং পার্টনারের দোষ-গুণ দুটোই মেনে নিতে না পারলে সংসার টেকানো যাবে না। কেবল অন্যেল দোষ না ধরে নিজের দোষের দিকে তাকালেও অনেক সমাধান আমার পেতে পারি। এটা অ্যাডজাস্টমেন্টের জন্য খুব জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, আমাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং ছাড় দেওয়ার মানসিকতা লোপ পাচ্ছে। এর কারণ অনেক। আগে দু’জনের মধ্যে বিয়ে হলে এর দায় নিতো পুরো পরিবার। কারণ পারিবারিকভাবে প্রত্যেকে দেখেশুনে বিয়ের আয়োজনটি হতো। আর বিয়ের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে অধিকাংশ নিজেরাই। এর সঙ্গে পরিবারের সম্পৃক্ততা থাকছে না। বিয়েতে পরিবারের সম্মতি থাকলে তারা দায় নিচ্ছে না। ফলে দু’জনের দ্বান্দ্বিক সংকটগুলোতে সহযোগিতা করার জন্য কেউ থাকছে না। পরিবার এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের একান্নবর্তী বা যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাওয়াতে এই সমস্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে। তিনি বলেন, পারিবারিক জীবনে দুজন-দুজনকে সময় দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে পরস্পরের পাশে থাকাটা জরুরি।

আরজি/ 

 
.

Best Electronics Products



আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad