দুঃখ ভারাক্রান্ত আত্মার জন্য প্রশান্তির বার্তা

ঢাকা, সোমবার, ২৫ জুন ২০১৮ | ১১ আষাঢ় ১৪২৫

দুঃখ ভারাক্রান্ত আত্মার জন্য প্রশান্তির বার্তা

মুহাম্মাদ ফয়জুল্লাহ ৭:১১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৮

print
দুঃখ ভারাক্রান্ত আত্মার জন্য প্রশান্তির বার্তা

আমরা যে সকল দুর্বলপ্রাণ মানুষ দুনিয়ার জীবনের বিভিন্ন বিপদাপদ, ভয়-আশংকা, দুঃখ-কষ্টে-বেদনায় জর্জরিত হয়ে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ি, তাদের জন্য আল্লাহ নিজেই হচ্ছেন সবচেয়ে বড় এবং একমাত্র শান্তি ও সমাধান।

মনে রাখতে হবে, আমাদের জীবনে এই কষ্ট এসেছে আমাদেরকে 'শুদ্ধ' করতে এবং 'মুক্ত' করতে। আপনার মাঝে যদি ঈমান থেকে থাকে, তবে জেনে রাখবেন আল্লাহ এই পরীক্ষা হাজির করেছেন আপনাকে তাঁর দিকে ফিরিয়ে নিতে। আল্লাহ আপনাকে আরো বেশি বেশি ইস্তিগফার ও আ'মল করাতে চান।

মু'মিনদের জীবনে সকল পরীক্ষাই আসে কল্যাণ হিসেবে, তাই অবশ্যই সবর করার চেষ্টা করতে হবে। এই কষ্টগুলো আপনার গুনাহগুলোকে পুড়িয়ে আপনাকে শুদ্ধ করবে যেমন করে সোনা পুড়ে খাঁটি হয়।

দুঃখ ভারাক্রান্ত অবস্থা থেকে উত্তোরণের উপায় হিসেবে বেছে নিন নামাযে দাঁড়িয়ে থাকা, সিজদায় আল্লাহর কাছে বেশি বেশি কান্নাকাটি করার কাজকে৷ কেননা বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে কাছে থাকেন সিজদাকালীন সময়ে।

শেষরাতে উঠে কান্নাকাটি করুন। কেননা আল্লাহ রাতের শেষভাগে আমাদের নিকটবর্তী আসমানে নেমে আসেন যেনো আমাদের ফরিয়াদ শুনে শুনে আমাদেরকে তিনি ক্ষমা করতে পারেন।

আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “তোমরা সবর ও নামাযের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্য্য ধারণকারীদের সাথে আছেন।” (সূরা বাকারাহঃ ১৫৩)

রাতে তাহাজ্জুদে দাঁড়ানো মানে এমন না যে মাঝরাতে উঠে সারারাত নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। বরং, ফজরের সময় হবার ২০ মিনিট আগে উঠে কিছুক্ষণ নামাযে দাঁড়ান৷ নামায শেষে কান্নাকাটি করে অনুভব করুন আপনার সাথে আল্লাহর সেই সম্পর্কটিকে যা কোনদিন হারাবে না। মনে রাখবেন, আপনার এখনকার জীবনের একমাত্র এই সম্পর্কটিই অবিনশ্বর, আর দুনিয়ার সবকিছুই হারিয়ে গেছে, হারিয়ে যায়, হারিয়ে যাবে।

আপনার নিজের বুকের ভালো লাগা ও ভালোবাসার আবেগটুকু দিয়ে গভীর মন দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করা যেতে পারে একথা স্মরণ রেখে যে, এই কথাগুলো এই বিশ্বজগতের প্রতিপালক, যার কাছে আমরা ফিরে যাবো তিনি ঠিক আমার জন্যই পাঠিয়েছেন, এই গ্রন্থটিতে আছে আমার হিদায়াত, আমার মুক্তি, আমার শান্তি ও আমার চিরকালীন সুখ।

খুব দরকারি একটা পরামর্শ হলো, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ, আপনাকে-আমাকে যিনি পৃথিবীর সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন সেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী পড়া।

তাঁর সীমাহীন উঁচু মর্যাদা, সুন্দরতম আ'মল সত্ত্বেও তাঁকে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে যে কঠিন পরীক্ষা, দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়েছিলো তা আমাদের উপলব্ধিকেই বদলে দিবে।

হাতের কাছে রাখুন সাহাবা এবং পূর্বসূরিদের জীবনীগুলো। বাজারে পাওয়া যায় 'আসহাবে রাসূলের জীবনকথা' সিরিজের বইগুলো, যা আপনাকে খুব অল্প কয়েক পাতায় দেখিয়ে দিবে শ্রেষ্ঠ প্রজন্মের মানুষদেরকে। তাদের জীবনকে উপলব্ধি করিয়ে আপনাকে দেখিয়ে দিবে সফলতার মঞ্জিলে যেতে হলে যে পথ পাড়ি দিতে হবে, তা খুব সহজ নয়, কিন্তু তার কষ্টগুলোর মাঝেও আছে অন্যরকম এক প্রশান্তি৷ কেননা এর মাধ্যমে যার কাছে যাওয়া যায় তিনি হলেন শান্তির কেন্দ্র, তিনি হলেন 'সালাম'।

বিপদগ্রস্ত, ঋণগ্রস্তদের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা)-এর শেখানো বেশ কিছু কার্যকরী দু'আ আছে হাদিস গ্রন্থসমূহে। সহজে পেতে চাইলে পড়তে পারেন, ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (র)-এর সংকলিত 'আযকারে মাসসূনাহ' নামের গ্রন্থটি।

সূরা বাকারাহতে আল্লাহর শিখিয়ে দেওয়া দু’আ পড়তে পারেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে,  “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি'উন।” (অর্থঃ নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো।)   

পড়তে পারেন দু'আয়ে ইউনুস হিসেবে প্রশিদ্ধ “লা-ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনায যোয়ালিমিন।”-যা হযরত ইউনুস (আ) বিপদ্গ্রস্ত অবস্থায় মাছের উদরস্থ হয়ে পড়েছিলেন, অতঃপর আল্লাহ তাঁকে উদ্ধার করেন।

অথবা পড়তে পারেন, “আল্লাহুম্মা ইন্নি আ'উযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হুযনি, ওয়া আউযু বিকা মিনাল আজযি ওয়াল কাসলি ওয়া আউযু বিকা মিনাল জুবনি ওয়াল বুখলি ওয়া আউযু বিকা মিন গলাবাতিদ্দাইনি ওয়া কাহরির রিজাল”। (বুখারী)

দু'আ একটি স্বতন্ত্র ইবাদাত, বরং দু’আই হচ্ছে সমস্ত ইবাদতের মূল। দু'আর মাধ্যমে আল্লাহর যিকির হয়, তাঁকে স্মরণ করা হয় ও তাঁর সর্বময় কর্তৃত্বের কাছে নিজেকে সোপর্দ করা হয়। এবং আমাদের সৃষ্টির যে উদ্দেশ্য তা পরিপূর্ণ প্রতিফলিত হয় যখন নিজেদেরকে মাটিতে লুটিয়ে আমরা আল্লাহর কাছে সিজদাবনত থাকি এবং চোখের পানি ঝরিয়ে দু'আ করতে থাকি।

কুরআনের এক দরসে সূরা ‘আলাম নাশরাহ’-এর তাফসীর করতে নিয়ে উস্তাদ বলেছিলেন, দুঃখদুর্দশার সময়ে বান্দা আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে তাঁর কাছে চাওয়ার সময় এমন এক পবিত্র প্রশান্তিময় অনুভূতি পায়, যা হলো ঈমানের অনন্য স্বাদ৷ সেটা হয় কারণ, সে আল্লাহ ছাড়া তখন আর কারো শক্তির প্রতি আশা-ভরসা বা আস্থা রাখে না। ফলে কেবলমাত্র মহান ক্ষমতাধর দয়াময় এক আল্লাহরই স্মরণ করায় হৃদয়ের এই অনুভূতির স্বাদ সে হারাতে চায় না৷ তাই সে চায় তাঁর এই কষ্টকর সময়টা আরও দীর্ঘ হোক। সুবহানাল্লাহ!

আপনার, আমার যে দুর্দশাগ্রস্ত, বিপদগ্রস্ত সময় তা আসলে 'কপাল' নয়, বরং আমাদের কর্মের বিনিময়ে আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনা। জেনে রাখুন, আপনার জীবনে কী ঘটছে তিনি খুব ভালো করে জানেন এবং তিনি নিজেই তা ঘটাচ্ছেন। সুতরাং, জীবনে আসা পরীক্ষার সময়ে আপনি কীভাবে তার 'রিপ্লাই' দিচ্ছেন সে ব্যাপারে খুব সচেতন হোন।

এই দুনিয়ার জীবন তৈরি করা হয়েছে হৃদয়কে ভাঙ্গার জন্য। অবিমিশ্র সুখের জায়গা দুনিয়া না। এখানে পরিপূর্ণ শান্তি চাওয়া কেবলই বোকামি। আল্লাহকে স্মরণ রেখে তাঁর নির্দেশিত পথে চলার চেষ্টা করলে ইনশাআল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার তাওফিক দিবেন এবং আখেরাতেও উত্তম প্রতিদান দান করবেন। নিশ্চয়ই দৃশ্য অদৃশ্যের সকল কিছুর জ্ঞান কেবলমাত্র তাঁরই আছে এবং তিনিই আমাদের রব। আমরা প্রতিটি প্রাণ তাঁরই মুখাপেক্ষী, আর কারো নয়। আমরা সবাই তাঁর কাছেই ফিরে যাবো, যেতেই হবে। তাই আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং তাঁর দিকেই ফিরে থাকা প্রশান্তিময় হৃদয় দিয়ে তাঁর প্রিয়দের অন্তর্ভুক্ত করুন।

[লেখাটির বিষয়বস্তুর অনেকখানিই একাধিক আলেমের আলোচনা থেকে নেয়া। দয়াময় আল্লাহ তাঁদের উত্তম প্রতিদান দান করুন।]

এমএফ/

 
.




আলোচিত সংবাদ