আমঝুপি কুঠিবাড়িতে মিলেছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

ঢাকা, বুধবার, ২৪ জানুয়ারি ২০১৮ | ১০ মাঘ ১৪২৪

আমঝুপি কুঠিবাড়িতে মিলেছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

আবু আক্তার করন, মেহেরপুর ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৪, ২০১৮

print
আমঝুপি কুঠিবাড়িতে মিলেছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

ব্রিটিশ আমলে নির্মিত মেহেরপুর জেলার পর্যটনকেন্দ্র ঐতিহাসিক আমঝুপি নীলকুঠি ও আম্রকাননের সৌন্দর্য দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। জেলা শহর থেকে ৫ মাইল পূর্বে অবস্থিত আমঝুপি নীলকুঠি ৭৭ একর ২৮ শতক জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। কুঠিবাড়ির দক্ষিণে কাজলা নদী। সংরক্ষণের অভাবে নীলকুঠির ঐতিহ্য আজ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কুঠিবাড়ির চতুর্দিকে ওয়াল না থাকায় গরু-ছাগলের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। কুঠিবাড়ির বিভিন্ন গাছের ডালপালা চুরি হয়ে যাচ্ছে।

ঐতিহাসিক আমঝুপি নীলকুঠিতে প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষামূলক খনন কাজ শেষ হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও অনুসন্ধানে বিলুপ্ত স্থাপনার সন্ধান পাওয়া গেছে বলে দাবি প্রত্নতাত্ত্ববিদদের। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় আঞ্চলিক কার্যালয়ের তত্বাবধানে ৪ সদস্যবিশিষ্ট অনুসন্ধান দলটি মাটি খুঁড়ে ঐতিহাসিক নীলকুঠিতে কয়েকটি বিলুপ্ত স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করেছে। বৃহৎ আকারে খননের সুযোগ পেলে প্রাক-মোঘল বা প্রাক-মুসলিম সভ্যতার স্থাপত্য নিদর্শন পাওয়া যেতে পারে বলে ধারণা করছেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা।



মেহেরপুরের আমঝুপি কুঠিবাড়ির অনেক জমি বেদখলের পর বর্তমানে জমি রয়েছে ৩৩ একর। এর মধ্যে ৩.৬১ একর জমি ২০১৪ সালের ২২ অক্টোবর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ইতোমধ্যে তার সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। ঐতিহাসিক নীলকুঠির বিলুপ্ত স্থাপনার সন্ধানে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে পরীক্ষামূলক খননের কাজ শুরু হয়। ইতোমধ্যে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে স্থাপত্যিক অবকাঠামোর ধ্বংসাবশেষ ছাড়াও বেশ কিছু প্রত্নবস্তু সংগ্রহ করেছে দলটি। দলটি মাটি খুঁড়ে ২ ফুট গভীরে প্রাচীন বেষ্টনী প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পায়। বেষ্টনী প্রাচীরটি ৩২১ ফুট লম্বা ও ৪৮ সেন্টিমিন্টার প্রস্থ বিশিষ্ট। খনন কাজের তত্ত্বাধানকারী প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খনন দলটি আমঝুপি নীলকুঠি সংলগ্ন কাজলা নদীর তীরে খনন করে পূর্বদিক থেকে পশ্চিম দিকে ধাবমান দেয়ালটির সন্ধান পায়। দেয়ালটিকে প্রাথমিকভাবে ঐতিহাসিক নীলকুঠির বেষ্টনী প্রাচীর বলে শনাক্ত করেছে। এ ছাড়াও খনন দলটি নীলকুঠির ১০০ ফুট পশ্চিম দিকে অবস্থিত ঢিবি খনন করে একটি প্রাচীন অবকাঠামোর সন্ধান পায়। উন্মোচিত স্থাপনাটি ঐতিহাসিক নীলকুঠিতে বসবাসকারী নীলকর সাহেবদের কোনো আবাসিক স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ বলে মনে করছেন প্রত্মানুসন্ধান কাজে নিয়োজিত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খনন দলটি। এ ছাড়াও বর্তমান কুঠিবাড়ি নির্মাণের আগে প্রাক-মোঘল বা প্রাক-মুসলিম সভ্যতার স্থাপত্য নিদর্শন এখানে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। যেটি মাটির নিচে চাপা পড়েছে বলে ধারণা করছেন তারা। ইতোমধ্যে সেখান থেকে মোঘল পর্বের বেশ কিছু পটারিও উদ্ধার করা হয়েছে।



প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের টিম প্রধান ও কাস্টোডিয়ান মো. গোলাম ফেরদৌস জানান, প্রত্নতত্ত্ব অনুসন্ধানে পাহাড়পুর থেকে কিছু অভিজ্ঞ শ্রমিক যারা বংশানুক্রমে এ খনন কজের সাথে সংশ্লিষ্ট পাশাপাশি স্থানীয় কিছু শ্রমিকও কাজ করছে। মাটির নিচে লুকায়িত যেসব স্থাপনা পাওয়া গেছে সেগুলো যাতে কোনো প্রকারে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়ে লক্ষ রেখে খনন কাজ করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক পরিমল সিংহ বলেন, ২০১৪ সালে আমঝুপি নীলকুঠি (প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর) অধীনে নেওয়া হয়। তারপর এটিকে একটি ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে সংরক্ষণ করার পাশাপাশি পিপিএনবি নামের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে সংস্কার কাজ করা হচ্ছে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসক ইকো-পার্ক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক ইকো-পার্ক নির্মাণ কাজ শেষ হলে এই স্থানটিতে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়বে বলে তিনি মনে করেন। এ ছাড়াও কোটি টাকার এই প্রকল্পে ইতিমধ্যে প্রাচীরের কাজ, অভ্যন্তরীণ রাস্তা নির্মাণ ও বাড়ির সংস্কার কাজ শেষ হয়েছে। পুরো কাজ শেষ হলে বাড়ির ভেতরে সেই সময়ের কিছু আলোকচিত্র ও কিছু নির্দশন সাজানো হবে।



সুদূর অতীতের স্মৃতি নিয়ে দুটি নীলগাছ এখনো দাঁড়িয়ে আছে। এই দুটি গাছ পরবর্তীকালে লাগানো বলেই মনে হয়। পাতা বাহারের গাছ দিয়ে দুই পাশ সাজানো রয়েছে, শান বাঁধানো ঘাট পযর্ন্ত টেনে নেয়া হয়েছে। মূল ভবনের অভ্যন্তরে রয়েছে মোট ১৫টি কক্ষ। এর মধ্যে ৩টি বড় বেডরুম। কাঠের পাটাতন করা হলরুমে ডানদিকে ফায়ারপ্রেস। পেছনে ডাইনিং রুম। হল রুমটির কনফারেন্স হল এবং নাচ ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে জানা যায়।

মূলভবনে রয়েছে মোট ৪টি সাজ ঘর এবং একটি সার্ভেন্ট কোয়ার্টার। অপেক্ষাকৃত সুশোভিত ঘরটি ব্যবহৃত হচ্ছে ভিআইপি রুম হিসেবে। এ রুমটিতে রয়েছে মসৃণ মেঝে। সংলগ্ন বাথরুমে সাদা টাইলস যা প্রায় ২৬৬ বছরের পুরাতন। কাঠের আসবাবপত্র গুলোও সে আমলের ঐতিহ্য বহন করছে। অধিকাংশ দামি আসবাবপত্র ইতিমধ্যে খোয়া গেছে।

হলরুমের ফ্লোরে যে কাঠ ব্যবহার করা হয়েছিল এখন আর তা নেই। প্রতিস্থাপিত করে সেগুন কাঠ লাগানো হলে তা মসৃন নয়। বাকি কক্ষগুলো ব্রিটিশ আমলের স্মৃতি বহন করছে। মূল ভবনের ডান দিকে রয়েছে কবুতর রাখার জন্য একটি সুন্দর বাসা। জনশ্রুতি রয়েছে ব্রিটিশ বেনিয়ারা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কবুতর ব্যবহার করতো। এই কুঠি থেকে অন্য কুঠিতে চিঠিপত্রের আদান প্রদানের জন্য পায়রার সাহায্য নেয়া হতো। আরো ডানদিকে বাড়ির শেষ প্রান্তে রয়েছে নীল গুদাম। এখানে নীল প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হতো এবং সেখান থেকেই কলকাতা ও কালিকট বন্দরে পাঠানো হতো। মূল ভবনের ডানদিকে এবং বাড়ির শেষপ্রান্তে আস্তাবল। সেখানে এখন আর ঘোড়া নেই। গড়ে উঠেছে জনবসতি।

কুঠিবাড়ি স্থাপত্য নকশা অনুযায়ী মূল ভবনের একটি সাজঘরের মেঝে থেকে পার্শ্ববর্তী নদী পযর্ন্ত একটি সুড়ঙ্গ পথ ছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। নীল চাষীদের ওপর নির্যাতন, অত্যাচার চালানোর পর সুড়ঙ্গ পথেই তাদের গুম করে দেয়া হত।

জনশ্রুতি আছে এই নীলকুঠি বাড়িতে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লাকে উৎখাত করার জন্য রবার্ট ক্লাইভ ও মীর জাফর যড়যন্ত্র করেছিল। আবার ২১৮ বছর পরেশ বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়েছিল এই আমঝুপি কুঠিবাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে।

এএকে/আরপি 

print
 
.

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad