যশোর মহাসড়কের গাছ কাটার সিদ্ধান্ত হবে আত্মঘাতী

ঢাকা, রবিবার, ২১ জানুয়ারি ২০১৮ | ৭ মাঘ ১৪২৪

যশোর মহাসড়কের গাছ কাটার সিদ্ধান্ত হবে আত্মঘাতী

যশোর ব্যুরো ১০:০৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৩, ২০১৮

print
যশোর মহাসড়কের গাছ কাটার সিদ্ধান্ত হবে আত্মঘাতী

যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের ২৩০০ ছোট বড় গাছ শুধু ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক বাহক নয়, পরিবেশের সুরক্ষা কবজও বটে। ফলে ৫ মিটার রাস্তা সম্প্রসারণ কাজে এতগুলো গাছ সাবাড়ের সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হবে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা। তবে পরিবেশবিদদের আশঙ্কাকে পাশ কাটিয়ে সর্বশেষ ৬ জানুয়ারি জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক সভায় গাছগুলো কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভায় তিনজন সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, জনপ্রতিনিধি ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এমন সিদ্ধান্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে চলছে তোলপাড়। তবে কেউ গাছ কেটে উন্নয়নের পক্ষে মতামতও দিচ্ছেন।

জানা যায়, ১৮৪০ সালে জমিদার কালী পোদ্দারের মা ছায়ায় ছায়ায় গঙ্গা স্নানে যাবেন; এজন্য রাস্তার দুই ধারে তিনি বিদেশ থেকে অতি বর্ধনশীল রেইন্ট্রি বৃক্ষের চারা এনে রোপণ করেন। সেই বৃক্ষগুলোই যশোর বেনাপোল সড়কে এখনো ছায়া দিচ্ছে। দেশ ভাগের পর ৮০ কিলোমিটার যশোর রোডের ৩৮ কিলোমিটার পড়ে বাংলাদেশ অংশে। বাকী ৪২ কিলোমিটার পড়ে ভারতের অংশে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বহু শরণার্থী এই মহাসড়ক পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় সীমান্ত পরিদর্শনে আসেন বিখ্যাত কবি অ্যালেন গ্রিন্সবার্গ। তিনি ফিরে গিয়ে লেখেন ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতা। তার কবিতা উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থীদের দুঃখ দুর্দশার চিত্র। বিশ্বব্যাপী পরিচিত পায় যশোর রোড। ঐতিহ্যের দিক থেকে মহাসড়কের গাছগুলো ইতিহাসের সাক্ষী।

অপরদিকে পরিবেশের সুরক্ষা কবজ হিসেবে কাজ করছে মহাসড়কের গাছগুলো। সর্বশেষ গত ৬ জানুয়ারি জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক সভায় যশোর-বেনাপোল সড়ক যথাযথমানে নির্মাণ ও প্রশস্তকরণের সুবিধার্থে রাস্তার দুই পাশের ২ হাজর ৩৩২টি গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

যশোর সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২১ মার্চ একনেকের সভায় ৩২৮ কোটি ৯০ লাখ ৫৫ হাজার টাকা ব্যয়ে যশোর-বেনাপোল জাতীয় সড়কের (দড়াটানা-বেনাপোল পর্যন্ত) ৩৮ দশমিক ২ কিলোমিটার সড়ক যথাযথমানে প্রশস্তকরণ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী ‘মহাসড়কের প্রস্থ ৭ দশমিক ৩ মিটার থেকে বৃদ্ধি করে ১০ দশমিক ৩ মিটার করা হবে। একই সঙ্গে সড়কের উভয় পাশে ১ মিটার করে মাটির জায়গা রাখা হবে। এতে সড়কের প্রস্থ দাঁড়াবে ১২ দশমিক ৩ মিটার। সব মিলিয়ে রাস্তার দুই পাশে পাঁচ মিটার সম্প্রসারণ করা হবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে মহাসড়কের উভয় পাশের মোট ২ হাজার ৩১২টি গাছ কাটতে হবে।

এ প্রসঙ্গে যশোর মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছোলজার রহমান বলেন, ৩৮ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশের গাছ প্রায় ৩৬ হাজার হেক্টর বনভূমির ভূমিকা পালন করছে। গাছগুলো ঘিরে জীববৈচিত্র গড়ে উঠেছে। এ অঞ্চলের পরিবেশের সুরক্ষার কবজ হিসেবে কাজ করছে গাছগুলো। মাত্র ৫ মিটার রাস্তা সম্প্রসারণে এতগুলো গাছ একসঙ্গে কাটার সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হবে। পরিবেশ বিপর্যয় থেকে গাছগুলো আমাদের রক্ষা করছে। গাছগুলো না কেটে ট্রেন লাইন সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। অথবা রাস্তার দুইপাশের গাছ না কেটে, যে পাশে কম সংখ্যক গাছ আছে সেই এক পাশে ৫ মিটার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সেটি করলে এক পাশের অল্প গাছ কেটে সম্প্রসারণ করে, নতুন করে গাছ লাগানো যেতে পারে। এতে পরিবেশ বড় ধাক্কা থেকে রক্ষা পাবে।

তিনি বলেন, ফারাক্কা বাঁধের ধাক্কা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহের যশোর অঞ্চলের মরুকরণ হতে রক্ষা করেছে যশোর বেনাপোল, যশোর-ঝিনাইদহসহ অন্যান্য সড়ক, মহাসড়কের বনায়ন। একইসঙ্গে সামাজিক বনায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অর্থনৈতিক অবস্থা গতিশীল করতে গিয়ে পরিবেশের বিপর্যয় ডেকে আনা উচিত হবে না। বিকল্প হিসেবে রেললাইনের পাশেও গাছ লাগানো যেতে পারে।

যশোরের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হারুন অর রশিদ বলেন, গত বছর গাছ কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আমরা আন্দোলন করে বন্ধ করেছিলাম। আবার গাছ কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লুটপাটের স্বার্থে আমলাদের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিরাও গাছ কাটার সিদ্ধান্তে একমত হয়েছে। এটা দেশ বিরোধী সিদ্ধান্ত বলে আমি মনে করি।

জনউদ্যোগের আহবায়ক আরএম খায়রুল উমাম বলেন, এতগুলো গাছ কেটে ফেলা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। যশোরবাসী ঐতিহ্য রক্ষায় সোচ্চার নয়। এজন্য একে একে সব ঐতিহ্য ধ্বংস হচ্ছে। এর জন্য যশোরে সামাজিক নেতৃত্বেরও দুর্বলতা রয়েছে। আমরা যশোরবাসী কি চাই, কতটুকু চাই, সেটি পরিস্কার নয়। আমাদের বহুমত, এক করা সম্ভব হয় না। এজন্য আমরা প্রাচীন রেজিস্ট্রি অফিস রক্ষা করতে পারিনি। রেলের উন্নয়ন হয়নি। বহতা ভৈরব পাইনি। যশোর- বেনাপোল মহাসড়কের গাছগুলো কেটে ফেলার অপেক্ষায়। কি করলে আমরা রক্ষা করতে পারবো, সেটি আমাদের কাছে পরিস্কার নয়।

যশোরের নাগরিক আন্দোলনের আহবায়ক মাস্টার নূর জালাল বলেন, মহাসড়ক সম্প্রসারণে গাছ কাটার সিদ্ধান্তে আমি একমত। মাহসড়েকর পাশে বড় গাছ থাকলে দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনা এড়াতে মহাসড়কের পাশেই এক মিটার ড্রেন, তারপর চারমিটার কাঁচা রাস্তা আকারে রাখা যেতে পারে। এরপর গাছ লাগানো যেতে পারে। তবে মহাসড়কের পাশেই গাছ রাখা ঠিক হবে না বলে মনে করি।

আইআর/এসবি

print
 
.

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad