খুলনা-কলকাতার মধ্যে ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’ চলবে ১৬ নভেম্বর থেকে

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭ | ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

খুলনা-কলকাতার মধ্যে ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’ চলবে ১৬ নভেম্বর থেকে

বেনাপোল প্রতিনিধি ৮:০৭ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০১৭

print
খুলনা-কলকাতার মধ্যে ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’ চলবে ১৬ নভেম্বর থেকে

এখন শুধু অপেক্ষার পালা। ৫২ বছর পর খুলনা-বেনাপোল-কলকাতা মৈত্রী ট্রেন আগামী ১৬ নভেম্বর থেকে সরাসরি চালু হবে। ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’ নামে এ ট্রেনটি খুলনা থেকে কলকাতা পৌনে দুশ’ কিলোমিটার রেলপথ পাড়ি দিতে সময় নেবে পাঁচ ঘণ্টা। উভয় দেশের প্রান্তিক স্টেশন কলকাতার চিৎপুর আর খুলনায় কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। সকাল সাড়ে সাতটায় কলকাতার চিৎপুর থেকে যাত্রী নিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টায় ‘বন্ধন’ পৌঁছুবে খুলনায়। এরপর দুপুর দেড়টায় খুলনা থেকে যাত্রী নিয়ে সন্ধ্যা নাগাদ ফের কলকাতায় পৌঁছে যাবে।

.

 

খুলনা-বেনাপোল-কলকাতার মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলের জন্য ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বেনাপোল আন্তর্জাতিক রেলওয়ে স্টেশনে ইমিগ্রেশন, কাস্টমস ও জিআরপি ভবন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হলেও সেখানে কোন কাজ আপাতত হবে না। এছাড়াও হতাশার বাণী হচ্ছে যশোরে আন্তর্জাতিক এ ট্রেনটির কোন স্টপেজ আপাতত রাখা হয়নি। এমনকি টিকিট ক্রয়ের যে ব্যবস্থার কথা পূর্বে বলা হয়েছিল তাও স্থগিত করা হয়েছে।

গত ৮ এপ্রিল দিল্লী থেকে ভিডিও কনফারন্সেরের মাধ্যমে সফররত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যৌথভাবে পতাকা নেড়ে ট্রেনটির প্রাথমিকভাবে উদ্বোধন করেন। ওই দিন পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেনটি কলকাতা থেকে ছেড়ে খুলনা হয়ে কলকাতায় গিয়ে পৌঁছে। এর আগে ব্রিটিশ আমলে পশ্চিমবঙ্গের সমৃদ্ধ শহর কলকাতার সঙ্গে পূর্ব বাংলার খুলনা ও গোয়ালন্দের ট্রেন যোগাযোগ চালু হয়। কিন্তু ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে দু’টি রুটিই বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৪ সালের এপ্রিলে ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তঃদেশীয় সরকারি রেলওয়ে সভায় খুলনা-কলকাতা যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর প্রস্তাব করা হয়েছিল।

এর আগে তিন দফায় দিনক্ষণ নির্ধারণ করেও খুলনা-কলকাতা রুটে যাত্রীবাহী রেল চলাচল শুরু করা যায়নি। প্রথম দফায় গত পয়লা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) এ ট্রেন চালুর কথা ছিল। কিন্তু ওই তারিখে ট্রেন চালু করা সম্ভব হয়নি। এরপর দ্বিতীয় দফায় পয়লা জুলাই ও তৃতীয় দফায় ৩ আগস্ট ট্রেনটি চালুর উদ্যোগ নিলেও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।

ঢাকা-কলকাতার পর খুলনা-কলকাতা রুটে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিতীয় মৈত্রী ট্রেনটির নামকরণের প্রস্তাব করা হয়েছিল ‘সোনারতরী’। কিন্তু উভয় দেশের রেলে একই নাম ব্যবহৃত হওয়ায় তা বাদ দেওয়া হয়। এরপর প্রস্তাব দেওয়া হয় ‘সম্প্রীতি’ ও ‘বন্ধন’। পরে ‘বন্ধন’ নামটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

অবশ্য দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে ২০০৮ সালের পয়লা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) থেকে ঢাকা-কলকাতা রুটে ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ চালু করা হয়। দুই দেশের রেলওয়েই এই সার্ভিসে লাভবান হচ্ছে। যাত্রীরাও রেল পরিষেবা পাচ্ছেন। প্রাথমিক প্রস্তাবে চেয়ার কোচে আট ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৫০ টাকা) এবং কেবিনে ১২ ডলার (প্রায় ৯৫০ টাকা) সিট ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।

রেলওয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, চলতি অক্টোবরের শেষের দিকে দিল্লিতে উভয় দেশের উচ্চ পর্যায়ের রেল কর্মকর্তাদের বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। ওই বৈঠকে অংশ নিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল নয়া দিল্লি যাবে। ভারতের তিন সদস্যের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বসে ভাড়া চূড়ান্ত করবেন তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এর আগে ভাড়া নির্ধারণে উভয় দেশের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে যৌথ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে ৩০ দিনের মধ্যে তাদের রিপোর্ট পেশ করতে বলা হয়। নয়াদিল্লি রেলভবনে গত ১৩ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর তিন দিনব্যাপী ভারত-বাংলাদেশের রেল কর্মকর্তাদের বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়।

১৯৬৫ সালের পাক ভারত যুদ্ধের পর থেকে এই পথে যাত্রীবাহী ট্রেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। তারপর এই রুট দিয়েই পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল ছিল। ১৯৭৪ সালে লোকসানের কবলে পড়ে তা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। এর পর বিএনপি সরকার রেলপথটি বন্ধ করে দেওয়ার চেস্টা করে। রেল পাটি তোলার মুখে যশোরসহ স্থানীয় মানুষের আন্দোলনের ফলে রেলপথটি বন্ধ করতে পারেনি তৎকালিন সরকার। ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও ভারতের তৎকালীন রেলমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দরে যৌথভাবে পণ্য পরিবহন রেলপথ উদ্বোধন করেন। সে থেকে এখনো চলছে ভারত বাংলাদেশের মধ্যে পণ্যবাহী ট্রেন। দীর্ঘ ৫২ বছর পর আবারও খুলনা-কলকাতার মধ্যে সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু হতে যাচ্ছে। ১৮৮৪ সালে প্রথম খুলনা-কলকাতা রেললাইন স্থাপিত হয়।

খুলনা প্রেসিডেন্সি বিভাগের অধীনে থাকায় কলকাতার সাথে তার যোগাযোগ ছিল বেশি। সে কারণেই খুলনা-কলকাতা রেলপথ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন ৪ ঘণ্টা সময় লাগত কলকাতা পৌঁছাতে। ইংরেজ শাসিত বাংলায় পাট, চামড়া, তামাক ও ধান রফতানি হতো। আর কলকাতা থেকে চিনি, সরিষার তেল এবং তাঁতের কাপড় আসতো। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সরাসরি এ রেল যোগাযোগ চালু ছিল। যুদ্ধকালীন ওই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর কিছুদিনের জন্য এই পথে রেল চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে আবারও চালু হয়। কিন্তু ১৯৭৪ সালে লোকসানের কবলে পড়ে রেল চলাচল একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।

বেনাপোল-যশোরসহ গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ পুনরায় রেলপথটি চালু করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে রেলপথ সংস্কার করে বেনাপোল-খুলনা ভায়া যশোরের মধ্যে একটি যাত্রীবাহী কমিউটার ট্রেন চালু করে।

খুলনা এবং যশোর হয়ে বেনাপোলের সঙ্গে বর্তমানে একটি যাত্রীবাহী কমিউটার ট্রেন দুই বার চলাচল করছে। ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর কলকাতা-খুলনার মধ্যে যাত্রীবাহী রেল চলাচল পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় খুলনা-কলকাতা ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’ ট্রেন চালুর পদক্ষেপ নিয়েছে উভয় দেশের রেল মন্ত্রণালয়। দু’দেশের মানুষ যাতে আরও অল্প খরচে, স্বল্প সময়ে ও নিরাপদে স্বাচ্ছন্দে ভ্রমণ করতে পারেন সে লক্ষে উভয় দেশের কর্মকর্তারা এ উদ্যোগ নেন।

বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের পাকশী বিভাগীয় ব্যবস্থাপক অসীম কুমার তালুকদার জানান, ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে নির্দেশনা পেয়ে খুলনা-কলকাতা আন্তর্জাতিক রুটে ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা করতে সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রথম অবস্থায় যাত্রীরা খুলনা থেকেই টিকিট ক্রয় করে ট্রেনে উঠবেন। যশোরে স্টপেজ রাখার বিষয়ে আপাতত কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। খুলনা থেকে ট্রেনটি ছেড়ে বেনাপোল স্টেশন হয়ে ট্রেনটি ভারতের চিতপুর কোলকাতা স্টেশনে গিয়ে থামবে। খুলনা থেকে ট্রেনের যাত্রীদের ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের কাজ সম্পন্ন করা হবে। এরপর ট্রেনটি সিল করে দেওয়া হবে। পথে কোথাও ট্রেনটি তল্লাশির প্রয়োজন পড়বে না।

এমজেএইচ/এএস

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad