‘অপয়া’ বাঘ বিধবাদের যাপিত জীবন

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট ২০১৭ | ৬ ভাদ্র ১৪২৪

‘অপয়া’ বাঘ বিধবাদের যাপিত জীবন

ইব্রাহিম খলিল, সাতক্ষীরা ১:৫০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১২, ২০১৭

print
‘অপয়া’ বাঘ বিধবাদের যাপিত জীবন

‘তারা অপয়া, অলুক্ষণে, অলক্ষী। তাদের মুখ দেখে কেউ কাজে গেলে সেদিন তার অমঙ্গল অবধারিত।’ কথাগুলো যে নারীদের নিয়ে, তারা জীবনের এক নির্মম বাস্তবতার শিকার। প্রিয়জনকে হারিয়ে কোথায় মানুষের সহায়, স্নেহের হাত নিজের দিকে পাবে, সেখানে উপাধি পেয়েছেন ‘বাঘ বিধবা’ আর উপরোল্লেখিত গালিগুলো।

সমাজে থেকেও সমাজচ্যুত সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বিধবারা। জীবিকার তাগিদে স্বামী সুন্দরবনে মাছ, মধু ও গোলপাতা কাটতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে নিহত হলে স্ত্রীরা উপাধি পান বাঘ বিধবা। এরপর তাদের জীবনে নেমে আসে করুণ পরিণতি। বেঁচে থাকাই যেন হয়ে দাঁড়ায় অভিশাপ।

শ্বশুর বাড়ির লোকজন বিভিন্ন গালি দিয়ে বাড়ি থেকে তাদের তাড়িয়ে দেয়। সমাজে তারা হয়ে ওঠেন ঘৃণার পাত্র, বেঁচে থেকেও মৃত।

সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জের জেলে পাড়া, গাবুরা, বুড়িগোলিনি ও পদ্মপুকুর এলাকায় প্রায় সাড়ে ১১শ’ বিধবার ঠাঁই হয়েছে।

জানা গেছে, ২০০১ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাঘের আক্রমণে মারা গেছে এক হাজারেরও বেশি বনজীবী। এরপর ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই মৃত্যুর মিছিল বন্ধ ছিল। তবে চলতি বছর এখন পর্যন্ত তিনজন নিহত ও একজন আহত হয়েছেন।

বাঘ বিধবা সোনামনি বলেন, ‘পার্শ্ববর্তী গ্রামের আব্দুল আজিজের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ১৯৯৯ সালে স্বামী বাঘের আক্রমণে নিহত হন। এরপর কোলের এক মাস বয়সী বাচ্চাসহ শাশুড়ি আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন। এরপর দেবরের সঙ্গে আবার বিয়ে হয়। সেও ২০০৩ সালে বাঘের আক্রমণে নিহত হন।’

তিনি বলেন, ‘দুই স্বামী বাঘের আক্রমণে নিহত হওয়ার পর অপয়া, অলক্ষ্মী, স্বামীখেকো অপবাদ দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, কোনো অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিলেও তাকে খেতে দেয় সবার পরে।’

সকালে যাতে কেউ তার মুখ না দেখতে পারে, সেজন্য শিকলে বেঁধে রাখা হতো বলেও জানান সোনামনি।

আরেক বাঘ বিধবা দিপালী দাশী বলেন, ‘আমার স্বামী অরুণ মণ্ডল ২০০২ সালে সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে নিহত হন। এজন্য আমাকেই দায়ী করে নির্যাতন করতে থাকেন শাশুড়ি। এক পর্যায়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন।’

 

তিনি বলেন, ‘স্বামীর বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে ভাইয়ের বাড়ি গিয়ে উঠি। ভাইও তো গরিব, নদীতে রেণুপোনা ও কাঁকড়া ধরে সংসার চালাতে শুরু করি। এভাবেই ছেলে-মেয়েদের বড় করেছি।’

শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবুল কাশেম মোড়ল পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘এই এলাকায় শিক্ষার হার অনেক কম ছিল। এজন্য স্বামীকে বাঘে ধরলে তার দোষ স্ত্রীকে দিতেন শ্বশুর বাড়ির লোকজন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে।’

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন পরিবর্তন ডটকমকে জানান, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে তাড়িয়ে দেওয়ার কুসংস্কার এখন অনেক কমেছে।’

তিনি জানান, সরকারের পাশাপাশি বাঘ বিধবাদের নিয়ে অনেক বেসরকারি সংগঠন কাজ করছে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এখন পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে।

জানা গেছে, সুন্দরবনের আশপাশের এলাকায় বসবাসরত বিধবাদের সামাজিক মর্যাদা ও পুনর্বাসন নিয়ে নারী সংগঠন লিডার্স, অনির্বাণ, দুর্জয় ও জাগ্রত বাঘ বিধবা দীর্ঘদিন কাজ করছে।

আইকে/বিএইচ/আইএম

print
 
nilsagor ad

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad