খুলনার চুকনগর গণহত্যা দিবস আজ

ঢাকা, শনিবার, ২২ জুলাই ২০১৭ | ৭ শ্রাবণ ১৪২৪

খুলনার চুকনগর গণহত্যা দিবস আজ

খুলনা প্রতিনিধি ১:৫২ পূর্বাহ্ণ, মে ২০, ২০১৭

print
খুলনার চুকনগর গণহত্যা দিবস আজ

আজ ২০ মে, খুলনার চুকনগর গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে বর্বর পাকবাহিনী ও তার দোসররা যে নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল তা পৃথিবীর ইতিহাসে সর্ববৃহৎ নজির হয়ে আছে। দেশকে স্বাধীন করার জন্যে এত স্বল্প সময়ে, একই দিনে, একই স্থানে, একই সময়ে এত লোক হত্যাযজ্ঞের স্বীকার হওয়ার খবর শোনা যায়নি।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালোরাতে বর্বর পাকবাহিনী ও তার দোসররা বাঙ্গালি জাতির উপর নির্বিচারে ঝাঁপিয়ে পড়ে সারাদেশে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। তাদের এই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে মানুষ জীবন বাঁচানোর তাগিদে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রায় ২ মাস পাকবাহিনীর অত্যাচার সহ্য করে অবশেষে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে বৃহত্তর খুলনার বাগেরহাট, রামপাল, মোড়েলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মংলা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, চালনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ ভারতে যাবার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। বিভিন্ন মাধ্যমে রওনা হয়ে ১৯ মে রাতের মধ্যে সবাই চুকনগরে এসে পৌঁছায়।

খুলনা জেলা সদর থেকে ৩০ কি.মি. দূরে অবস্থিত চুকনগর শহর। এজন্য বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বিশ্রাম ও আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নেয় চুকনগর শহরকে। ওই দিন রাতে কয়েক হাজার মানুষ চুকনগরের পাতোখোলা বিল, শহরের ভেতর, মন্দিরসহ বিভিন্নস্থানে সমবেত হয়। কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। সবারই মনে চাপা ক্ষোভ। জন্মভূমি ছেড়ে জীবন বাঁচানোর তাগিদে সবাইকে চলে যেতে হচ্ছে ভারতে। এই অবস্থায় আশ্রয় গ্রহণকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে কখন না জানি পাক বাহিনী তাদের ওপর হামলা করে। 

এ আশঙ্কায় পরের দিনই চুকনগর শহর ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। কেউ কেউ সকালের দিকে যাত্রা করে। অন্যরা সকালের খাওয়া দাওয়া শেষে রওনা হবে। এজন্যে সকালে সবাই রান্না-বান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কারও রান্না শেষ হয়েছে। কেউবা শুরু করেছে। কেউবা ভাতের থালা নিয়ে বসে খেতে পড়েছে। ঠিক এমনই মুহূর্তেই পাক বাহিনীর ১টি ট্রাক ও ১টি জিপ চুকনগর সাতক্ষীরা মহাসড়ক ধরে মালতিয়া মোড়ের ঝাউতলা নামক স্থানে এসে হঠাৎ থেমে যায়। এ সময় রাস্তার পাশে পাটক্ষেতে কাজ করছিল চিকন আলী মোড়ল (৭০) নামে এক বৃদ্ধ। গাড়ির শব্দে সে উঠে দাঁড়ালে পাকবাহিনী  তাকেই প্রথমে গুলি করে হত্যা করে। এরপর শুরু হয় পাক বাহিনীর তাণ্ডবলীলা। 

দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। বেলা প্রায় ১১টা হবে। এরপর পাকবাহিনী চলে আসে চুকনগর শহরে। শুরু হয় গুলি আর গুলি। গুলির শব্দে আর এখানে জড়ো হওয়া নারী-পুরুষের আর্ত-চিৎকারে আকাশ, বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। চারিদিকে শুধু কান্নার শব্দ। হুড়োহুড়ি আর দৌঁড়াড়েড়ি। এরপর সবকিছুই এক সময় নীরব হয়ে যায়। চারিদিকে শুধু লাশ আর লাশ। পাকিস্তানী নরপশুরা সেদিন চুকনগর শহর, মন্দিরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় ঢুকে নিরীহ মানুষকে অকাতরে গুলি করে হত্যা করে। কোথাও লুকিয়ে ওদের হাত থেকে কেউ রক্ষা পায়নি। চুকনগর সেদিন মৃত নগরীতে পরিণত হয়েছিল। পাকিস্তানীদের এই তাণ্ডবলীলা প্রায় ২-৩ ঘণ্টা ধরে চলে। সেদিন মানুষের আর্ত-চিৎকার ও দৌঁড়াদৌঁড়িতে পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে কত অবুঝ শিশু মারা গিয়েছিল তার ইয়ত্তা নেই। 

পাকিস্তানীদের চুক নগরের সবুজ মাটি মুহূর্তের মধ্যে লাল হয়ে উঠেছিল। চুক নগরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ভদ্রা নদীতে ছিল লাশের বহর। ছিল তাজা রক্তের স্রোত। কোথাও পা দেওয়ার জায়গা ছিলনা। চুকনগর শহরের অলিতে গলিতে, গাছে, নদীতে, ঘরের চালে, খালে বিলে শুধু লাশ আর লাশ। পাকবাহিনীর বর্বর পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের পর চুকনগর শহর শকুন ও কুকুরের দখলে চলে যায় সেদিন। অনেক মৃত প্রায় ব্যক্তিকে নিয়ে টানাটানি করেছিল শকুন আর কুকুর। এই করুণ দৃশ্য কখনও ভুলবার নয়। সেদিন চুকনগরে কত মানুষ মারা গেছে তার কোনো সঠিক হিসাব ছিল না। 

তবে তখনকার লাশ বহনকারী ২২ জন শ্রমজীবীর অন্যতম সদস্য আব্দুল জব্বার ও শেরআলী সরদারসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, তারা সাড়ে ৪ হাজার পর্যন্ত গণনা করতে পেরেছেন। তবে ১০-১৫ হাজারের মত নিরীহ মানুষ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল পাক হানাদার বাহিনী বলে জানান তারা। 

পৃথিবীর জঘন্যতম এ ঘটনাটি ১৯৯০ সাল পর্যন্ত শুধু চুকনগরেই সীমাবদ্ধ ছিল। এটি ব্যাপকভাবে প্রচারের জন্য উদ্যোগ নেন গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ও চুকনগর কলেজের অধ্যক্ষ এবিএম শফিকুল ইসলাম। এরপর চুক নগরের এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডটি ইতিহাসের পাতায় তুলে ধরার জন্য তিনি তৎপরতা শুরু করেন। সেই থেকে প্রতি বছর দিনটিকে যথাযথ মর্যাদায় পালন করা হয়। তবে এ বছর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লেওকাত আলী লাকীর নেতৃত্বে চুকনগর বধ্যভূমিতে শহীদদের স্মরণে দেশ বরেণ্য আর্ট শিল্পীদের নিয়ে আর্টক্যাম্প, স্থানীয় ও জাতীয় শিল্পীদের নিয়ে কয়েকটি নাটকসহ ১০-১২টি অনুষ্ঠান করেছে। তাছাড়া তিনি ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন ২০১৭ সালের মধ্যে বধ্যভূমিতে প্রায় ২শ কোটি টাকা ব্যয়ে জমি ক্রয়, জাদুঘর, বিনোদন কেন্দ্র ও লাইব্রেরি তৈরি করা হবে। 

এ বছর দিবসটি পালন উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, ডুমুরিয়া উপজেলা প্রশাসন, খুলনা জেলা বিএনপি, গণহত্যা-৭১ স্মৃতিরক্ষা পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সকাল ৯টায় ডুমুরিয়া উপজেলা প্রশাসন এবং সকাল ১১টায় খুলনা জেলা বিএনপিরসহ সভাপতি ডা. গাজী আব্দুল হকের নেতৃত্বে চুকনগর গণহত্যা-৭১ স্মৃতি বধ্যভূমিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হবে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে ১০ হাজার মোমবাতি প্রজ্বলন করা হবে এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হবে। 

জেএইচ/জেআই

print
 

আলোচিত সংবাদ