সোনালী আঁশ এখন কুষ্টিয়ার কৃষকদের বোঝা

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৮ | ১ শ্রাবণ ১৪২৫

সোনালী আঁশ এখন কুষ্টিয়ার কৃষকদের বোঝা

মেজবা উদ্দিন পলাশ, কুষ্টিয়া ১২:৫৭ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৭, ২০১৮

print
সোনালী আঁশ এখন কুষ্টিয়ার কৃষকদের বোঝা

কুষ্টিয়ায় সোনালী আঁশ এখন কৃষক ও ব্যবসায়ীদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাটচাষি ও ব্যবসায়ীদের প্রায় তিন লাখ মণ পাট বিক্রি করতে পারেননি তারা। এতে করে পাট চাষে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন চাষিরা। একই সাথে ব্যবসায়ীরাও পথে বসতে চলছেন। পাট পণ্যের ব্যবহার না বাড়ায় পাটের বাজারে ধস নেমেছে বলে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা মনে করছেন। ফলে পাটের নায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, কুষ্টিয়া জেলার কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ঘাড়ে পাট এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদিত তিন লাখ মণ পাট ব্যবসায়ীদের গুদাম ও চাষিদের ঘরে পড়ে রয়েছে। যার বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা। বাজারে ক্রেতা না থাকায় পাট বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।

২০১৬ সালে অনেক ব্যবসায়ী বাজারদর না থাকায় কেনা পাট বিক্রি করতে পারেননি। তাদের ইচ্ছা ছিল ২০১৭ সালে আবারও পাট কিনে ক্ষতি পুষিয়ে নেবেন তারা। কিন্তু সে গুড়ে বালি, পাট ব্যবসায়ীরা পাট ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা দরে কিনলেও বর্তমান বাজারে ক্রেতা না থাকায় পাট বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ধুবইল ইউনিয়নের পাট ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন, পাট ব্যবসায় দুই বছর ধরে বুক মাটিতে ঠেকে গেছে। বছর বছর লক্ষ লক্ষ টাকা লস (ক্ষতি) গুণতে গুণতে শেষ হয়ে যাচ্ছি। পাটব্যবসায় একেবারেই আগ্রহ নষ্ট হয়ে গেছে। পাট পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে ব্যবস্থা নিতে সরকারি সিদ্ধান্ত ছিল। এটি বাস্তবায়নে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া পাটের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা তো লেগেই আছে।

এ জেলায় চাষি ও ব্যবসায়ীদের গুদামে গত দুই বছরের পাট মজুদ রয়েছে। তার পরিমাণ প্রায় তিন লাখ মণ। ফলে পাটের ব্যবসায় বছর বছর আমাদের লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে জেলার পাট ব্যবসায়ীরা পথে বসবেন বলেও জানান তিনি।

এদিকে পাট মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ নির্দেশ অনুযায়ী ১৭টি কৃষিপণ্য ২০ কেজি বা তার বেশি ওজনের ব্যাগে বহন করতে হলে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। কিন্তু এসব পণ্যের মধ্যে বাজারে চাল ও আলু ছাড়া অন্য পণ্যের ক্ষেত্রে প্লাস্টিক বস্তার ব্যবহার কমেনি। এ বিষয়ে জেলায় কিছু মনিটরিং থাকলেও তা নাম মাত্র লোক দেখানো। ফলে আটা, ময়দা, চিনি, ডালসহ অনেক পণ্যের মোড়ক হিসেবে প্লাস্টিকের বস্তাই ব্যবহার করা হচ্ছে। আমদানি করা চাল, ডাল, রসুন ও আদার মতো পণ্য মোড়কজাত হচ্ছে প্লাস্টিকের বস্তায়। ফলে পাটপণ্যের চাহিদা বাড়ছে না। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে পাটের বাজারে।

জেলা পাট অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য মতে, গত মৌসুমে কুষ্টিয়া জেলায় পাট উৎপাদন হয়েছে জেলার ৬টি উপজেলায় মোট এক লাখ তিন হাজার ৭৬৪ একর জমিতে এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ ১৮ হাজার ৮২০ বেল পাট। যার বড় অংশটাই এখন পর্যন্ত বিক্রি করা সম্ভব হয়নি।

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার পাটচাষি আব্দুল আলীম জানান, গত বছর প্রতি মণ পাট বিক্রি হয়েছে ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা দরে। পাট আবাদে চাষিদের বিঘা প্রতি খরচ হয় দশহাজার টাকা। পাট হয় প্রতি বিঘায় ৭ থেকে ৮ মণ যা আসল টাকায় ওঠেনি কৃষকের। পাট চাষ করে চাষিদের লোকসান হয়েছে। ফলে জেলার চাষিরাও পাট চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। চলতি মৌসুমে অনেক চাষি পাটের আবাদ করবেন না বলে জানান তিনি।

কুষ্টিয়া জেলা পাট কর্মকর্তা সোহরাব উদ্দিন বিশ্বাস জানান, পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায় করতে পারলেই কৃষক লাভবান হবে। পাট পণ্যের ব্যবহার না বাড়ায় পাটের বাজারে ধস নেমেছে। বাজার মনিটরিং এর মাধ্যমে প্লাস্টিকের বস্তার চাহিদা কমাতে পারলেই কৃষক পাট দুইহাজার থেকে তিন হাজার টাকা দরে বিক্রি করতে পারবেন।

এ জেলায় আপনারা বাজার মনিটরিং লক্ষ্য করছেন? এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, প্রায় প্রতিদিনি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে দোকান মালিকদের অর্থদণ্ড করা হচ্ছে। এমন অভিযান সারাদেশে অব্যাহত থাকলে পাটচাষীরা লাভবান হবে।

/এমপি/এমএ/বিএইচ/

 
.



আলোচিত সংবাদ