ইসলামে পর্দার বিধান (শেষপর্ব)

ঢাকা, সোমবার, ২৫ জুন ২০১৮ | ১০ আষাঢ় ১৪২৫

ইসলামে পর্দার বিধান (শেষপর্ব)

মাওলানা মুফতি আব্দুর রউফ সাখখারবী ১১:২৯ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৮

print
ইসলামে পর্দার বিধান (শেষপর্ব)

কোনো গাইরে মাহরাম পুরুষ ঘরে এলে- অনাত্মীয় হোক বা আত্মীয়, তিনি পুরুষের সাথেই সাক্ষাৎ করবেন। ঘরের গাইরে মাহরাম মহিলাদের সাথে সাক্ষাৎ করবেন না। হ্যাঁ, যদি মাহরাম হয়ে থাকেন তাহলে তার মাহরাম মহিলাদের সাথেও সাক্ষাৎ করতে মানা নেই। তো এভাবে একবার সবাই বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তাহলে মহিলাদের জন্য গাইরে মাহরাম পুরুষদের সাথে পর্দা করা সহজ হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর গাইরে মাহরাম আত্মীয়-স্বজন, স্বামীর গাইরে মাহরাম আত্মীয় স্বজন, যেমন স্বামীর চাচা, জ্যাঠা, খালু, ফুফা, মামা অথবা স্ত্রীর খালু-ফুফা খালাতো ভাই, জ্যাঠাতো ভাই, চাচাতো ভাই, মামাতো ভাই প্রমুখ বেড়াতে এলে এদের সাথে শুধু ঘরের পুরুষরাই সাক্ষাৎ করবে এবং তাদের পুরুষদের কামরাতেই বসানো হবে। ঘরের মহিলাদের তাদের সাথে জরুরতবশত কথা বলতে হলে পর্দার আড়াল থেকে কথা বলবে। অথবা ফোনে বা ইন্টারকমে কথা বলবে।

এই পদ্ধতি কিছুদিন একটু আশ্চর্যের মনে হবে। কিন্তু, ভিতরে আপনার কাছেও স্বস্তিকর মনে হবে। মহিলারাও এতে শান্তি ও তৃপ্তি পাবে। সবচেয়ে বড় কথা হল, শরয়ী পর্দা পালিত হবে এবং বেপর্দার গুণাহ থেকে নারী-পুরুষ সকলেই রক্ষা পাবে। তাই এজন্য নারীদের মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে আর পুরুষদেরও তাদের সাহায্য করতে হবে। এভাবে পরস্পরের মাঝে সবকিছু সিদ্ধান্ত হয়ে জানাজানি হয়ে গেলে এরপর আর কোনো অসুবিধা থাকবে না। কিন্তু, যদি নারী-পুরুষরা এ কাজের জন্য তৈরি না হয় তাহলে সারা জীবন পর্দা লঙ্ঘনের গুণাহ হতে থাকবে।

কবি বলেন, ‘তুমিই যদি না চাও তাহলে বাহানা তো হাজার হাজার, হে খাজা, ব্যথাই তো নেই, নতুবা চিকিৎসক তো প্রস্তুত।’

এখন যেহেতু গুণাহের অনুভূতি নেই এবং ওই গুণাহ থেকে বাঁচার চেষ্টা ও ফিকির নেই এ কারণে বাঁচাটা কঠিন মনে হয়। নতুবা গুণাহ থেকে বাঁচার সহজ উপায় তো আছে।

কোনো প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া নারীদের জন্য জায়েজ। তবে শরয়ী পর্দার সাথে বের হতে হবে। শরয়ী পর্দা সম্পর্কে কিছু মৌলিক বিষয় এখানে বলা হচ্ছে;

১। প্রথম কথা হলো, ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মোটা বড় চাদর বা বোরকা দ্বারা ভালভাবে আবৃত হয়ে বের হবে। রাস্তা দেখার জন্য শুধু চোখ খোলা রাখার অনুমতি আছে। উত্তম হল, চেহারার ওপর এমন নেকাব দিয়ে দেবে যার দ্বারা পর্দাও হয়ে যায়, রাস্তাও দেখা যায়।

২। চাদর বা বোরকা এতটুকু লম্বা ও মোটা হবে, যাতে মাথা থেকে পা পর্যন্ত শরীর বা পোশাকের কোনো অংশ বের না হয়। বোরকা পাতলা হলে শরীর ও পোশাক দেখা যাবে। এর দ্বারা পর্দার উদ্দেশ্য অর্জন হবে না। আর চাদর বা বোরকা কালো রঙেরও হতে পারে, সাদা রঙেরও হতে পারে। কোনো বিশেষ রঙ জরুরি নয়।

৩। বোরকা বা চাদর চমকদার ও কারুকার্যখচিত না হওয়া উচিত। কেন না নারীদের আদেশ দেয়া হয়েছে, ঘর থেকে বের হওয়ার সময় নিজের সজ্জা ও সৌন্দর্য আবৃত করে বের হওয়ার। সাধারণত নারীর লেবাস-পোশাকও সুন্দর হয়, অলংকারাদিও সুন্দর হয়, বেশভুষাও সুন্দর হয়। এই সবকিছুকে ঢেকে বের হওয়ার আদেশ করা হয়েছে। তাই বোরকার কাপড় খুব সুন্দর ও ফুল দ্বারা ডিজাইন করা না হওয়া চাই। বরং বোরকা একেবারে সাদাসিদা হওয়া চাই। আর তা এতটুকু বড় হওয়া চাই যে, মাথা থেকে পা পর্যন্ত সমস্ত শরীর আবৃত হয়।

৪। বোরকা এতটুকু ঢিলেঢালা হতে হবে, দেহের বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠন বোঝা না যায়। বোরকা টাইট হলে পর্দার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়। শরীরের গঠন, অবয়ব ফুটে ওঠে। ফলে পর্দার উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। তাই বোরকা খুবই ঢিলেঢালা হওয়া চাই।

৫। বোরকার উপরে বা ভিতরের পোশাকে বা শরীরে সুগন্ধি ব্যবহার না করা। হ্যাঁ, যদি এমন কিছু ব্যবহার করা হয় যার সুবাস ছড়ায় না তাহলে সমস্যা নেই। যে সুগন্ধি বাইরে ছড়ায় তা ব্যবহার করে বাইরে গমনকারী নারীদের ব্যাপারে কঠিন হুঁশিয়ারি এসেছে। তাই এ রকম খুশবু লাগিয়ে বাইরে বের হওয়া জায়েজ নয়। এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে ব্যাভিচারিণী বলেছেন। (জামে তিরমিযী, হাদীস ২৭৮৬)

মোট কথা, উপরের পাঁচটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে নারীরা প্রয়োজনের সময় ঘর থেকে বের হতে পারবে; যখন বাহিরের জরুরি কাজ করে দেয়ার মত কোনো পুরুষ ঘরে না থাকে।


দেখুন, কোনো নারীর ওপর যদি হজ ফরয হয় কিন্তু, হজের সফরের জন্য তার কোনো মাহরাম না থাকে, যেমন স্বামী যাওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। অথবা তার মাহরাম যেমন বাপ, ভাই, আপন ভাতিজা, আপন ভাগিনা থাকে কিন্তু তাদের কেউই যাওয়ার জন্য প্রস্তুত নয় কিংবা তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার মত অর্থও কাছে নেই। এমতাবস্থায় শরীয়তের দৃষ্টিতে ওই নারীর হজে যাওয়ার অনুমতি নেই। কেন না এই অবস্থায় তার জিম্মায় হজ আদায় করাই জরুরি নয়। তার জন্য শরয়ী বিধান হলো, মাহরামের অপেক্ষা করবে। যদি মাহরাম মিলে যায় কিংবা স্বামী সাথে যাওয়ার জন্য তৈরি হয় তাহলে তার সাথে হজ করতে যাবে। যদি মাহরাম পাওয়া না যায় তাহলে তার পক্ষ থেকে বদলি হজ করার ওসিয়ত করে যাবে যে, আমার উপর হজ ফরয ছিল। কিন্তু, আমি হজ করার জন্য সাথে মাহরাম পাইনি। তাই আমি ওসিয়ত করছি, আমার মৃত্যুর পর আমার সম্পদ থেকে বদলি হজ করানো হবে।

এটা হলো, শরীয়তের বিধান। শরীয়ত এটা বলেনি যে, যখন তোমার ওপর হজ ফরজ এবং তুমি মাহরাম পাচ্ছ না, তাহলে মাহরাম ছাড়াই হজে চলে যাও। এই সকল সতর্কতা ও পরিপূর্ণ পর্দার বিধান এজন্যই দেয়া হয়েছে, যাতে নারীর ইজ্জত-আব্রুর পরিপূর্ণ হেফাজত হয়।

এ কারণে যে সকল নারী ঘরের ভেতরে গাইরে মাহরাম পুরুষদের সাথে পর্দা করে না কিংবা যে সকল নারী ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পর্দা করে না তাদের ব্যাপারে হাদিসে অনেক কঠিন শাস্তির সতর্কবাণী এসেছে। তারা যেন সেগুলো পড়ে নেয় এবং বেপর্দার গুণাহ থেকে বেঁচে থাকে এবং শরয়ী পর্দার পুরোপুরি এহতেমাম করে। আল্লাহ তা’আলা তাওফিক দান করুন, আমীন।
আরও পড়ুন...
ইসলামে পর্দার বিধান (প্রথম পর্ব)

 
.




আলোচিত সংবাদ