ইসলামে পর্দার বিধান (প্রথম পর্ব)

ঢাকা, সোমবার, ২৫ জুন ২০১৮ | ১১ আষাঢ় ১৪২৫

ইসলামে পর্দার বিধান (প্রথম পর্ব)

মাওলানা মুফতি আব্দুর রউফ সাখখারবী ১২:৪৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৮

print
ইসলামে পর্দার বিধান (প্রথম পর্ব)

‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন নিজেদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের (মুখমণ্ডলের) ওপর ঝুলিয়ে দেয়। এটা তাদেরকে (আলাদাভাবে) চেনার এবং এর ফলে (দুশ্চরিত্র বখাটে লোকদের) নির্যাতন থেকে রক্ষা পাওয়ার পক্ষে সর্বাধিক কার্যকর। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আহযাব : ৫৯)

সম্মানিত পাঠক, ইনশাআল্লাহ, আজ আপনাদের সামনে এ আয়াতের আলোকে পর্দার বিষয়ে সামান্য আলোচনা করব। যাতে পর্দার জরুরি মাসআলাহগুলো নারী-পুরুষ সকলেরই জানা হয়ে যায়।

আল্লাহতা’আলা নারীদের পর্দার আদেশ দিয়েছেন কোরআনে কারীমের মাধ্যমে। আমি এখন যে আয়াতটি তিলাওয়াত করেছি, তার মাঝেও পর্দার আদেশ রয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকটি আয়াতে পর্দার আদেশ পরিষ্কারভাবে আছে। আর শরীয়তের মূলনীতি হলো, আল্লাহতা’আলা যখন কোনো কাজের আদেশ দেন, সেই কাজ ফরজ হয়ে যায়। নামাজের আদেশ আল্লাহতা’আলা কোরআনে কারীমে দিয়েছেন তাই মুসলিম নর-নারীর ওপর নামাজ ফরজ। রমজান শরীফের রোজার হুকুম আল্লাহতা’আলা কোরআনে কারীমে দিয়েছেন। তাই রমজানের রোজা নারী-পুরুষ সকলের ওপর ফরজ।

এমনিভাবে যাকাত ও হজের হুকুমও কোরআনে কারীমে এসেছে। এ কারণে এ চারটি বিধানই ফারায়েযে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত। তাই আল্লাহতা’আলা যেহেতু পর্দার আদেশ করেছেন, তাই পর্দা করাও ফরজ।

নামাজ না পড়া, রমজানের রোজা না রাখা, যাকাত ফরজ হওয়া সত্ত্বেও আদায় না করা, হজ ফরজ হওয়া সত্ত্বেও আদায় না করা যেমন অনেক বড় গুণাহ, তেমনি পর্দা লঙ্ঘন করাও অনেক বড় গুণাহের কাজ। এ কারণেই পর্দা না করার ওপর হাদীস শরীফে ভয়াবহ শাস্তির সতর্কবার্তা এসেছে।

সুতরাং নামাজ-রোজার মত শরয়ী পর্দাও একজন মুসলিম নারীর জন্য অপরিহার্য। যারা শরয়ী পর্দা করছেন তারা আল্লাহতা’আলার শুকরিয়া আদায় করবেন। কারণ, তারা আল্লাহর একটি হুকুম মানার তাওফিক লাভ করেছেন। আর যে সকল নারী শরয়ী পর্দা করেন না তাদের কর্তব্য, শরয়ী পর্দায় এসে যাওয়া এবং একে অবশ্য-কর্তব্য মনে করা।

এক্ষেত্রে যে ত্রুটি হচ্ছে, একে ত্রুটি মনে করা এবং এর জন্য নিজেকে গুণাহগার মনে করা। আর আল্লাহতা’আলার কাছে দোয়া করা, হে আল্লাহ! আমি আমার ভুল স্বীকার করছি এবং আপনার এ বিধান যথার্থ ও অবশ্য-পালনীয় বলে বিশ্বাস করছি। আপনি আমাকে সৎ সাহস দান করুন, যাতে আমি এই বিধান মেনে চলতে পারি।

দেখুন, সব গুণাহগার এক প্রকারের নয়। এক প্রকারের লোক গুণাহ করে কিন্তু গুণাহকে গুণাহ মনে করে, নিজের ভুল স্বীকার করে এবং আল্লাহতা’আলার দরবারে মাফ চেয়ে বলেন, আল্লাহ! আমাকে এই গুণাহ থেকে বাঁচার হিম্মত ও তাওফিক দান করুন। আরেক প্রকারের লোক যে গুণাহ করে কিন্তু গুণাহকে গুণাহ মনে করেন না; বরং বলেন যে, এটা শরীয়তের বিধান নয়। এটা তো হুজুরদের বিধান, হুজুররা বানিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই দুই শ্রেণির মানুষের মাঝে আকাশ-জমিনের ব্যবধান। দ্বিতীয় ব্যক্তি শরীয়তের বিধান মানতে ও তার ওপর আমল করতে অস্বীকার করছেন এবং এ বিধানকে মনগড়া বলছেন। এ লোকের তো ঈমানই যাওয়ার পথে। আর প্রথম ব্যক্তি যে গুণাহ স্বীকারকারী অপরাধী তার তো কমপক্ষে ঈমান ঠিক আছে। আর যেহেতু সে গুণাহের কথা স্বীকার করছে তো ইনশাআল্লাহ একদিন তার গুণাহ থেকে সাচ্চা তওবা করারও তাওফিক হয়ে যাবে।

পর্দার বিষয়টিও এ রকম। কিছু লোক তো এমন যারা কোরআনে কারীম ও হাদীস শরীফ মানেন না। অথবা বিধান তো মানেন কিন্তু স্পষ্টভাবে বলে দেন যে, আজকের যুগে এটার ওপর আমল করা অসম্ভব। এরপর বিভিন্ন ধরনের অজুহাত খাড়া করেন। এটা অত্যন্ত ভয়াবহ প্রবণতা। এ থেকে সকল মুসলিম নারী-পুরুষের বেঁচে থাকা দরকার।

হ্যাঁ, যদি সে নিজের দুর্বলতা কিংবা পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কারণে কোনো নারী শরয়ী পর্দা মেনে চলতে না পারেন এবং তার জন্য একেবারে পুরোপুরি শরয়ী পর্দার ওপর আমল করা কঠিন হয়ে যায়, তখন তার কর্তব্য, এ বিধানকে মনেপ্রাণে মেনে নেয়া এবং স্বীকার করা যে, হে আল্লাহ! নিঃসন্দেহে এটা আপনার আদেশ। আর আপনার আদেশ আমি শিরোধার্য করছি। কিন্তু, আমি অপরাধী, গুণাহগার। হে আল্লাহ, এ মুহূর্তে এ বিধানের ওপর আমল করা আমার জন্য কঠিন হচ্ছে। কিন্তু, আমি অঙ্গীকার করছি, আমি এ বিধান মেনে চলব এবং মেনে চলার জন্য পুরোপুরি চেষ্টা করব। হে আল্লাহ! আমাকে সাহায্য করুন! আমার মনে সাহস দিন, আমার ঈমানকে শক্তিশালী করে দিন, যাতে আমি এ হুকুম পুরোপুরি মানতে পারি। অতঃপর যতদিন এ গুণাহ পুরোপুরি ছাড়তে পারছেন না ততদিন বারবার তাওবা করতে থাকবে এবং ছাড়ার চেষ্টায় থাকবে। আর প্রতিজ্ঞা করতে থাকবে যে, ইনশাআল্লাহ, আমি আমার পরিবেশকে পরিবর্তন করব এবং এ বিধানের ওপর পুরোপুরি আমল করব।

কোরআন-হাদীসের আলোকে মুসলিম নারীদের জন্য মূল বিধান হলো নিজের ঘরেই অবস্থান করা। তার ঘরে থাকাটাই পর্দার একটি প্রকার। তাই যথাসম্ভব মুসলিম নারীরা ঘরে থাকবেন এবং প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হবেন না।

এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, ঘরে যেসব গাইরে মাহরাম (মাহরাম নয় এমন) পুরুষ থাকে তাদের সাথেও পর্দা করতে হবে। যেমন দেবর, ভাসুর ইত্যাদি। এমনিভাবে যে সকল গাইরে মাহরাম পুরুষ ঘরে আসা-যাওয়া করে যেমন স্বামীর চাচা, জ্যাঠা, মামা, তাদের সাথেও পর্দা করতে হবে। এই আত্মীয়দের সাথে পর্দা করার পদ্ধতি হলো, নিজ কামরা থেকে বের হওয়ার সময় যদি মনে হয় কামরার বাইরে গাইরে মাহরাম কেউ আছেন তখন কারও মাধ্যমে বা কোনো সংকেত ব্যবহার করে তাদের সরতে অনুরোধ করবে। তা যদি সম্ভব না হয় আর তাৎক্ষণিক বের হওয়া জরুরি হয় তাহলে বড় ওড়না বা চাদর দিয়ে মাথার চুল, ঘাড়, উভয় হাতের বাহু আবৃত করে নিবে। চেহারার ওপরও নেকাব ফেলে নিতে হবে। এভাবে জরুরতের সময় নিজ কামরা থেকে বের হওয়া যাবে।

কিছু গাইরে মাহরাম এমন আছেন, যারা ঘরের লোক না হলেও আত্মীয়তার কারণে ঘরে আসা-যাওয়া করেন। যেমন: স্বামী বা স্ত্রীর চাচাতো ভাই, জ্যাঠাতো ভাই, ফুফাতো ভাই, মামাতো ভাই, খালাতো ভাই ইত্যাদি। এদেরকে ‘আত্মীয়ের ভাই’ বলে। অনেক ক্ষেত্রে এদের সাথে বিশেষ পর্দা মেনে চলা হয় না। অথচ এদের সাথেও পর্দা করা ফরজ। এদের সাথে পর্দা রক্ষার উপায় এই যে, ঘরের কর্তাব্যক্তিরা সকলে একবার বসে স্থির করবে যে, এখন থেকে ইনশাআল্লাহ আমাদের ঘরে পর্দা পালিত হবে। সুতরাং গাইরে মাহরাম আত্মীয়-স্বজন যারা আছেন, যারা ঘরে আসা-যাওয়া করেন, সামনে থেকে তারা যখন আসবেন তাদেরকে বৈঠকখানায় বসানো হবে। যারা এখন সোজা ঘরের ভিতরে চলে যান তাদেরকে এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়া হবে যেন, সামনে থেকে তারাও পর্দা রক্ষায় সচেতন হয়।

চলবে...

 
.




আলোচিত সংবাদ