‘শিক্ষার সংকট দূর করতে জাতীয় কমিটি প্রয়োজন’

ঢাকা, সোমবার, ১৬ জুলাই ২০১৮ | ১ শ্রাবণ ১৪২৫

‘শিক্ষার সংকট দূর করতে জাতীয় কমিটি প্রয়োজন’

প্রীতম সাহা সুদীপ ৭:২০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৭

print
‘শিক্ষার সংকট দূর করতে জাতীয় কমিটি প্রয়োজন’

প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস, প্রক্সি দিয়ে ভর্তি, কোচিং ও নকল বাণিজ্য, গবেষণা ফাঁস, আর্থিক দুর্নীতিসহ নানা অনিয়মে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। চলমান এ সংকট থেকে বের হয়ে আসতে অনতিবিলম্বে দেশের শীর্ষ ১০ জন শিক্ষাবিদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় কমিটি গঠনে মত দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দিন আহমেদ।

একুশে পদকপ্রাপ্ত এই শিক্ষাবিদ ১৯৩২ সালের ১৫ ডিসেম্বর তৎকালীন মালদাহ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শিবগঞ্জের আদিনা সরকারি ফজলুল হক কলেজ ও রাজশাহী কলেজের প্রাক্তণ ছাত্র। মহান ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে, ১৯৫২ পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রনেতা হিসেবে কারাবরণও করেন অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান, উপ-উপাচার্য এবং উপাচার্য হিসেবে দীর্ঘদিন সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করেন এই শিক্ষক। তুলনামূলক রাজনীতি, প্রশাসন-ব্যবস্থা, বাংলাদেশের রাজনীতি, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক বাহিনী সম্পর্কে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে গবেষণা করে চলেছেন এমাজউদ্দিন।

চলমান শিক্ষা ব্যবস্থার নানা ত্রুটি ও এর থেকে পরিত্রাণের উপায় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন এই শিক্ষাবিদ। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পরিবর্তন ডটকম’র প্রতিবেদক প্রীতম সাহা সুদীপ।

বর্তমানে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কি কি অসঙ্গতি রয়েছে?

এমাজউদ্দিন আহমেদ : জাতি গঠন, জাতিকে শিক্ষিত করা ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ তৈরি করার জন্য সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উপাদান হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থা। একটি দেশের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে অপরিহার্য উপাদানগুলো হল— মানসম্মত-যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষক, শিক্ষার পরিবেশ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা অন্য কোনো অনধিকার চর্চার অনুপস্থিতি। আমাদের দেশে এর কোনটাই নেই বলে আমি মনে করি, যে কারণে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংসের পথে।

শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ে কি ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে?

এমাজউদ্দিন আহমেদ : কয়েক বছর থেকে লক্ষ্য করছি প্রাইমারি পর্যায়ে ক্লাস ফাইভে একটা পরীক্ষা আবার ক্লাস এইটে একটা পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। বিনা প্রয়োজনে সেন্ট্রালাইজড (কেন্দ্রীয়ভাবে) করে পুরো দেশব্যাপী এই পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। বিভাগীয় পর্যায়ে অথবা জেলা পর্যায়ে যেসব শিক্ষা কর্মকর্তা রয়েছেন, যদি এই পরীক্ষাগুলোকে ওই পর্যায়ে ডিসেন্ট্রালাইজড করে নেয়া হতো তাহলে এটা হয়তো ভালভাবে ম্যানেজ করা যেত।

এত পরীক্ষা কেন হবে? প্রাইমারি ও জুনিয়র লেভেলে জাতীয় পর্যায়ে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেই নামে বেনামে কোচিং সেন্টার গজিয়ে উঠছে। অভিভাবকরাও বাচ্চারা যাতে ভাল গ্রেড পায় সেদিকেই নজর দিচ্ছে। তাদের সন্তান ভাল লেখাপড়া শিখল কি শিখল না, যোগ্যতা অর্জন করলো কি করলো না সেদিকে তাদের কোনো খেয়াল নেই। ফলে কোচিং সেন্টার ছাড়া তাদের কাছে আর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই।

পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কি ধরনের মানহীনতা রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

এমাজউদ্দিন আহমেদ : বর্তমানে দেশে প্রায় ৩৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৯৫টার মতো। এগুলোর প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না। থানায় থানায় বা জেলায় জেলায় একটা করে বিশ্ববিদ্যালয়, এটা কোনো উন্নত দেশেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এই যে ৯৫টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রতিটিতে যদি ফার্মেসি বিভাগ খুলতে হয় তাহলে একজন করে প্রফেসর লাগবে। আমরা কি এই পরিমাণ প্রফেসর খুঁজে পাবো? এরকম অন্য যে কোনো ডিপার্টমেন্টে কি ৯৫ জন প্রফেসর খুঁজে পাওয়া যাবে? এটা কোনো ভাবেই সম্ভব না। তারপরও কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলছে, কিভাবে চলছে আমরা নিজেরাও জানি না। এতে শিক্ষার মান ধ্বংস হচ্ছে। শিক্ষার নামে সার্টিফিকেট বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

অন্যদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যে কলেজগুলো রয়েছে, সেগুলোর ডিপার্টমেন্টগুলোতে কতজন শিক্ষক রয়েছে? একেকটা ডিপার্টমেন্টে দুই/তিনজনের বেশি শিক্ষক পাওয়া যাবে না। অথচ উদাহারণস্বরূপ যদি আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে দেখি তাহলে সেখানকার শুধুমাত্র পলিটিক্যাল সায়েন্স ডিপার্টমেন্টেই ২৫ থেকে ২৬ জন শিক্ষক রয়েছে। এইসব সরকারি কলেজগুলোতে গেলে দেখা যাবে যে শিক্ষক নেই অথচ ডিপার্টমেন্ট চলছে এবং তাদের উপস্থিতির কোনো বালাই নেই।

এক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোন মানহীনতা রয়েছে বলে মনে করেন কি?

এমাজউদ্দিন আহমেদ : শিক্ষক নিয়োগে অবশ্যই মানহীনতা রয়েছে। আজকাল শিক্ষক নামের অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে, কারণ তারা ভোটার। প্রশ্ন ফাঁসসহ নানা দুর্নীতি অনিয়মের ঘটনায়ও এখন শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা দেখা যাচ্ছে। এখন যাদের হাতে প্রশ্ন তৈরির দায়িত্ব চলে গেছে তাদেরকে আমি শিক্ষক বলব না। তারা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত বটে কিন্তু যোগ্যতা, দক্ষতা বা অভিজ্ঞতার মাণদণ্ডে এদের শিক্ষক বলা ঠিক হবে না। প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি জায়গায় একই অবস্থা। যাদের হাতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আসলে শিক্ষক হওয়ার কোনো যোগ্যতাই তাদের মধ্যে নেই।

প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। প্রশ্ন ফাঁস থেকে পরিত্রাণের উপায় কি?

এমাজউদ্দিন আহমেদ : প্রশ্নপত্র ফাঁসের যে ঘটনাগুলো ঘটে চলেছে, এটা অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ কিছু শিক্ষক নামধারী ব্যক্তির কারণেই এগুলো ঘটছে। একই সাথে শিক্ষার্থী-অভিভাবকরাও ভাল রেজাল্টের কথা ভেবে এই ধরনের অনৈতিক কাজকে সমর্থন করছেন। বাচ্চাদের ভাল রেজাল্টের জন্য কোচিং করানো হচ্ছে, সেখানে পরীক্ষায় ভাল রেজাল্টের শতভাগ নিশ্চয়তার পাশাপাশি সাজেশন দেয়ার নামে প্রশ্ন ফাঁসও করা হচ্ছে।

আমরা তো লেখাপড়া শিখেছি আবার শিখিয়েছি, সে সময় প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া অকল্পনীয় ব্যাপার ছিল। কেউ কল্পনাই করতে পারতো না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিশেষ একটা বিভাগে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে অথবা এমন কিছু। যদি কখনো এমন কোন সম্ভাবনার কথাও জানা গেছে তখন পরীক্ষা বন্ধ করা হয়েছে। তারপর ঠিকঠাক করে দেখেশুনে নতুন প্রশ্নপত্র তৈরি করে পরীক্ষা নেয়া হয়েছে।

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী যোগ্য মানুষ, তিনিও ভয়ঙ্কর অস্বস্তিতে আছেন প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে। প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ হচ্ছে- পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা জাতীয়ভাবে নেয়া বন্ধ করে শুধু এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রীয়ভাবে নেয়া হোক। পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাদ দিয়ে দিলে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ হবে, বাবা মা নিজেরাই সন্তানদের পড়াশোনার দিকে খেয়াল রাখবে।

শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থার আর কি কি কারণ রয়েছে?

এমাজউদ্দিন আহমেদ : শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থার জন্য সামাজিক অবক্ষয়ও অনেকাংশেএ দায়ী। আমরা এখন এমন কঠিন সময়ে আছি নকল ধরলে ছাত্ররা শিক্ষকদের মারধর করছে, এমন করুন দৃশ্যও কিন্তু আমাদের দেখতে হচ্ছে। বাচ্চাদের শাসন করলে শিক্ষকরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এগুলো ঘটছে সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে।

সরকার নীরব কেন? পরিত্রাণের উপায় কি?

এমাজউদ্দিন আহমেদ : আমরা দেখতে পারছি শিক্ষা ব্যবস্থার এই করুণ দশার পরও সরকার নীরব রয়েছে। তাদের এই দিকেএ নজর নেই। যখন এসব ঘটনা ঘটছে আমাদের সমাজপতিরা, যারা নীতি নির্ধারণ করেন তাদের এগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করা দরকার। পূর্ণাঙ্গ একটা অনুসন্ধান করা উচিত যে কি কারণে এসব ঘটনা ঘটছে?

আমরা যদি শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করতে ব্যর্থ হই তাহলে জাতি হিসেবে আমাদের অবনতি অবধারিত। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা না করে আমরা একুশ শতকে অগ্রসর হতে পারবো না। তাই এখান থেকে উঠে আসতে জাতীয় পর্যায়ের শীর্ষ ১০ শিক্ষাবিদকে নিয়ে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা উচিত। শিক্ষা ব্যবস্থা কেন দিন দিন ধ্বংসের পথে যাচ্ছে, কি কি সমস্যার কারণে এগুলো হচ্ছে, পরিত্রাণের পথ কি এগুলো অনুসন্ধান করাই হবে ওই কমিটির কাজ।

এতক্ষণ সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ

এমাজউদ্দিন আহমেদ : আপনাকেও ধন্যবাদ

পিএসএস/এসবি

 
.



আলোচিত সংবাদ