‘বাংলাদেশে এখন শিশুদের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়’ (ভিডিও)

ঢাকা, বুধবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৮ | ১২ বৈশাখ ১৪২৫

‘বাংলাদেশে এখন শিশুদের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়’ (ভিডিও)

আশিক মাহমুদ ৩:২৪ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৭

print
‘বাংলাদেশে এখন শিশুদের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়’ (ভিডিও)

মাতৃগর্ভেই শিশুরা বেশি কিডনিজনিত রোগে আক্রান্ত হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে জন্মের পরও আক্রান্ত হয়। শিশুদের কিডনির অনেক অসুখই যথাসময়ে নির্ণয় করা গেলে তা নিরাময় করা সম্ভব। এরই মধ্যে বাংলাদেশে শিশুদের সফল কিডনি প্রতিস্থাপন করাও সম্ভব হয়েছে।

পরিবর্তন ডটকমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এমনই সব সফলতার গল্প শুনিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু কিডনি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. গোলাম মাইনুদ্দিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আশিক মাহমুদ। ছবি তুলেছেন রাফিয়া আহমেদ।

শিশুদের কিডনি কেন নষ্ট হয়?

বাচ্চাদের মূলত জন্মগত, বংশগত কারণে কিডনিতে সমস্যা হয়ে থাকে। আবার আত্মীয়তার মধ্যে বিয়ে হলে সেই পরিবারের বাচ্চাদের কিডনি সমস্যা দেখা যায়। স্কিন ইনফেকশন বা গলায় টনসিলের কারণেও কিডনি সমস্যা হতে পারে। ড্রাগ থেকে হতে পারে। তবে সেটার পরিমাণ খুব কম।

কিডনি যেহেতু একটি ছাকনি। ছাকনির ছিদ্রগুলো, কোনো কারণ ছাড়াই এলার্জি জাতীয় রোগের কারণে বড় হয়ে যায়। তখন কিডনির কার্যকারিতা কিছুটা ব্যাহত হয়। এজন্য শরীর থেকে প্রোটিন স্বাভাবিকের থেকে বেশি বেরিয়ে যায়। প্রোটিন যেহেতু রক্তের ভেতর পানি বা ব্লাড প্রেশারকে ধরে রাখে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, তাই যখন প্রয়োজনের তুলনায় প্রোটিন বেশি বেরিয়ে যায় তখনই পানিটা রক্তের নিচে থাকে না রক্তের ভেতরে চলে আসে। সেজন্য গা ফুলে যায়। গা ফুলে গেলে আবার ইনফেকশন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শ্বাস কষ্ট হয়, প্রস্রাব কমে যায়। ক্ষেত্র বিশেষ প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায়। মূলত এসব কারণেই বাচ্চাদের কিডনি নষ্ট হয়।

শিশুদের কিডনি ভালো রাখার উপায় কী?

শিশুদের কিডনির সমস্যা আসলে তার জন্মের আগেই নির্ণয় করা যায়। আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করে সেটা নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে। প্রেগনেন্সি হওয়ার ৬ মাসের আগে এই পরীক্ষাগুলো করতে হয়। পরীক্ষা করে যদি বেশি খারাপ থাকে তাহলে অনেক সময় প্রেগনেন্সি টার্মিনেন্ট করা। আর টার্মিনেন্ট না করলে সঠিক ফলোআপে রাখা। যদি আরো বেশি খারাপ হয় তাহলে অনেক সময় প্রেগনেন্সি রাখাও যায় না। দেশের বাইরে কিন্তু জন্মের আগেই চিকিৎসা করা যায়। আবার  জন্মের পরে যদি প্রথমেই ধরা পড়ে, আর আমরা যদি প্রথম বা দ্বিতীয় ধাপে চিকিৎসা দিতে পারি, বুঝতে পারি তাহলে প্রথমে আমরা চাইবো যেন পরবর্তী ধাপে না যেতে পারে। যদি চতুর্থ বা পঞ্চম ধাপে চলে যায় তাহলে তাদের নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতে হয়। আমাদের একটা ভুল ধারণা আছে যে, কিডনি নষ্ট হলে ডায়ালাইসিস বা প্রতিস্থাপন লাগবেই এটা কিন্তু ঠিক না।

শিশুদের কিডনি রোগের লক্ষণগুলো কী কী?

প্রথম লক্ষণ হল বার বার প্রস্রাব করা। বয়সের তুলনায় বাচ্চার বেড়ে না ওঠা। বার বার জ্বর হওয়া। পেটে ব্যথা হওয়া। ব্লাড প্রেসার বাড়ার কারণে অনেক সময় বাচ্চাদের চোখে দেখতে সমস্যা হয়। কোনো কারণ ছাড়া বমি হয়। কিডনির সমস্যা হলে বাচ্চার ব্রেন ভালো মত কাজ করে না। চোখের সমস্যা হয়। মাথা ব্যথা করে। একজন মানুষের প্রতিদিন কতটুকু প্রস্রাব হবে? আমরা বলি, একটি বাচ্চা যদি ১০ কেজি হয়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাহলে অন্তত তার ৩০০ থেকে ৪০০ এমএল প্রস্রাব বের হতে হবে। যদি প্রতিদিন একজন মানুষের ৫০ এমএল’র নিচে ইউরিন আসে, তাহলে তার প্রস্রাব তৈরি হচ্ছে না। এটা শিশুদের জন্য খুব ঝুঁকির কারণ হয়ে যাবে।

যদি কিডনি সমস্যা দেখা দেয় তাহলে প্রথমে করণীয় কী?

প্রথমে দেখতে হবে কি কারণে কিডনি নষ্ট হল। সেটার ওপর নির্ভর করবে। আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে তারপর ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। শরীরের যে কোনো সমস্যা হলে ডাক্তারের পরামর্শ না নিয়ে কোনো ধরনের ওষুধ খাওয়া ঠিক না। যদি কারো দশ বারো ঘণ্টা প্রস্রাব না হয় তাহলে তাকে দূত কোনো ভালো ডাক্তার বা হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

কিডনিতে পাথর কেন হয়?

জন্মগত অনেকগুলো কারণে মানুষের কিডনিতে পাথর হয়। আরেকটি পরিবেশগত কারণ। পরিবেশগত বিষয়টি আগে বলি, যেমন, যারা মধ্যপ্রাচ্যে যায় দেখবেন যে প্রায়ই তারা পাথরের সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসেন। সেখানে গরম আবহাওয়া, খাওয়া-দাওয়া এসবের কারণে এই ধরনের সমস্যা হয়।

আবার জেনেটিক বা বংশগত বিষয়ও আছে, বাবার ছিল ছেলের হচ্ছে। মানুষের কিডনিতে ক্যালসিয়াম, ফসফেট, অক্সালেট, ইউরিক এসিড এগুলো দিয়ে পাথর তৈরি হয়। এই পাথর কিডনি, মূত্রনালি, মূত্রথলি এবং প্রস্রাবের রাস্তায় হতে পারে। এই জিনিসগুলো জমাট বেঁধে পাথর তৈরি হয়।

কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসের পাশাপাশি আরো কোনো বাড়তি পরামর্শ আছে কি না?

গাইড লাইন তো আমাদের আন্তর্জাতিকভাবে আছে। তার পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব একটা অভিজ্ঞতা আছে। তারপরেও আমারা আন্তর্জাতিক গাইড লাইন অনুযায়ী চিকিৎসা দেই। কোন পর্যায়ে গিয়ে আমরা কি চিকিৎসা দেব একটা গাইড লাইন আমরা অনুসরণ করি। মানুষের কিডনি পাঁচটা স্টেজে ধিরে ধিরে নষ্ট হয়। যখন চারটি স্টেজে চলে যায় তখন আমরা ডায়ালাইসিস করাতে বলি। কিন্তু আমাদের দেশের সবার ধারণা কিডনি নষ্ট হলেই বুঝি ডায়ালাইসিস করাতে হয়। কোনো ভাবেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া উচিৎ না।

বড়দের কিডনি ভালো রাখার উপায় কী?

কিডনি ভালো রাখার প্রধান উপায় হল পানি বেশি করে খেতে হবে। প্রস্রাবের চাপ আসলে সময় মত প্রস্রাব করা। যদি কিডনি খারাপ হওয়ার লক্ষণ দেখা দেয় তাহলে সাথে সাথে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। পরিবারের যদি কারো কিডনি সমস্যা থাকে সেটা অবশ্যই ডাক্তারকে জানাতে হবে। ডায়াবেটিকস আছে কি না দেখতে হবে। ডায়াবেটিকস থাকলে কিডনিতে সমস্যা হতে পারে। ডায়াবেটিকসটা আগে আগে নির্ণয় করা গেলে কিডনিটা নষ্ট হয় না। আর একটা জিনিস সবচেয়ে বেশি মনে রাখতে হবে, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ভাবেই ব্যথার ওষুধ খাওয়া যাবে না। ব্যথার ওষুধ খেলে ব্যথা কমে যায়, কিন্তু এ যে কিডনি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বা বোনমেরু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সেটার দিকে আমাদের কারো নজর থাকে না।

দায়িত্ব পালনের সময় কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন কি না?

দায়িত্ব পালনকালে আমি তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়নি। ডাক্তারি পেশায় আমি কাজ করি প্রায় ৩০ বছর। আমরা কাছে মনে হচ্ছে এখনকার পরিবেশ অত্যন্ত চমৎকার। কারণ আমরা এখন যে কোন রোগ হলেই সেটা নির্ণয় করতে পারছি। পর্যাপ্ত ওষুধ দিতে পারছি। যে-ই যতো সমালোচনা করুক আমি মনে করি, আমাদের দেশের স্বাস্থ্য পরিকল্পনা অনেক ভালো। কারণ আমাদের যে কোনো ধরনের রোগী যে কোনো ডাক্তারের কাছে যেতে পারে। এটা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে সম্ভব না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এতো কম খরচে কিডনি প্রতিস্থাপন করানো হচ্ছে এটা কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না। আমাদের সার্জন ডাক্তারা কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য আলাদা কোনো টাকাও নেয় না। কিন্তু এটা কেউ জানেও না।

ডাক্তারি পেশায় আসার পেছনে অনুপ্রেরণা কি ছিল?

আমরা এখন যারা ডাক্তার আছি। তাদের সবারই পরিবারের একটা সাপোর্ট কাজ করে। আর এটা একটি মহৎ পেশা। পেশায় আসার পরে আরো জানলাম আমরা যদি একটা লোককে বাঁচাতে পারি তাহলে আমাদের একটা ভালো লাগা কাজ করে। তাহলে আল্লাহ খুশি হন। আল্লাহ বলেছেন, একজন লোককে বাঁচালেন মানে আপনি পুরো মানবসভ্যতাকে বাঁচালেন। এর চেয়ে আর আনন্দের কি আছে। এটাতো টাকা দিয়ে কেনা যাবে না। আমি এখন যে সম্মানটা পাচ্ছি আপনি সেটা কি টাকা দিয়ে কিনতে পারবেন? কাজেই এর থেকে আমার আনন্দ আর কিছু নেই।

নতুন যারা ডাক্তারি পেশায় আসছেন তাদের জন্য কোনো পরামর্শ?

নতুনদের প্রতি আমার প্রথম পরামর্শ হল তাদেরকে লক্ষ ঠিক করতে হবে। আমি কি টাকার দিকে ছুটবো নাকি মানব সেবার দিকে ছুটবো। এটা আগে সবার নির্ধারণ করতে হবে। আমি নিজেই দেখেছি আমার বন্ধু-বান্ধব যারা কিনা আমার চেয়ে অনেক ভালো মেধার ছিল। কিন্তু টাকার পেছনে যখন ছুটেছে তাদের কেউই এখন ভালো নেই। আমরা যারা কষ্ট করে আস্তে আস্তে এই পর্যায়ে এসেছি আমাদের টাকা এসেছে পরে কিন্তু অনেক ভালো আছি। আমাদের এখন সম্মানও আছে টাকাও আছে।

কিডনি চিকিৎসায় বাংলাদেশ কতটা সফল হতে পেরেছে?

সবচেয়ে আসার কথা হচ্ছে আমাদের দেশে কিন্তু কিডনির সকল চিকিৎসা সফলভাবে হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা সব ধরনের কিডনি চিকিৎসা করছি। নিয়মিত রোগীদের ডায়ালাইসিস করছি। এছাড়াও সফলভাবে এখানে আমরা শিশুদের কিডনি প্রতিস্থাপনও করছি। এখন পর্যন্ত আমরা ১২টা কিডনি সফলভাবে প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছি।

 

এএম/এসবি

 
.




আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad