হঠাৎ মাইন বিস্ফোরণে একটি পা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৮ | ২ শ্রাবণ ১৪২৫

হঠাৎ মাইন বিস্ফোরণে একটি পা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়

পরিবর্তন প্রতিবেদক ২:৩৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৭

print
হঠাৎ মাইন বিস্ফোরণে একটি পা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়

মো. উসমান গণি তালুকদার। যুদ্ধাহত এই বীর মুক্তিযোদ্ধার বর্তমান বয়স ৬৮ বছর। তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধে অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন।

উসমান গনির নেতৃত্বে নেত্রকোনার দুর্গাপুরের বিজয়পুর থেকে প্রতিহত করা হয়েছিল পাক হানাদার বাহিনীকে। তিনি নেত্রকোনা পৌর শহরের নাগড়া উত্তর পাড়ার বাসিন্দা মরহুম আব্দুল মজিদ তালুকদারের ছেলে।

উসমান ১৯৭১ সালে বিএ শেষবর্ষের ছাত্র ছিলেন। নেত্রকোনা কলেজ হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করতেন। মে মাসের শেষের দিকে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বিজয়পুর থেকে পাক হানাদার বাহিনী পিছু হঠার সময় তাদের পুতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে একটি পা হাঁটুর নিচ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার।

যুদ্ধাহত বীর এই মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পরিবর্তন ডটকমের নেত্রকোনা প্রতিনিধি মহসিন মিয়া।

মুক্তিযুদ্ধে কিভাবে জড়ালেন?

পাকিস্তান সরকারের দুঃশাসন থেকে নিজেকে ও দেশকে বাচাঁতেই মূলত যুদ্ধে যাওয়া। পাক বাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতন এতটাই বেড়েছিল যে, তখন ঘরে বসে থাকার সুযোগ ছিল না। নিজের বিবেকই যুদ্ধে যেতে নাড়া দিয়েছিল।

প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন কোথায়?

প্রথমে ভারতের মেঘালয়ের মহাদেব ইয়ুথ ক্যাম্পে। সেখানে ২০ দিন প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। পরে ১২৫ জনের দলনেতা করে আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ভারতেরই তোরা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। যিনি আমাকে পাঠিয়েছিলেন অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান। বর্তমানে তিনি ময়মনসিংহ জজকোর্টের আইনজীবী। তোরায় প্রায় এক মাস প্রশিক্ষণের পর বাঘমারা এসে আমি কয়েক দিনের মধ্যেই যুদ্ধে অংশ নেই।

কোথায় কোথায় যুদ্ধ করেছেন?

১১ নং সেক্টরের অধীনে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া সীমান্ত, নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরসহ আট-দশটি স্থানে।

যুদ্ধে আপনার স্মরণীয় ঘটনা সম্পর্কে বলুন...

৩ ডিসেম্বর সহযোদ্ধাদের নিয়ে দুর্গাপুরের বিজয়পুরে পাক হানাদার বাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটিতে আক্রমণ করার দায়িত্ব দিলেন যৌথ কমান্ড বাহিনীর মেজর মুরারী। ৭০ জন সহযোদ্ধা আমার সঙ্গে ছিলেন। আমরা ৩ ডিসেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত আক্রমণ অব্যাহত রাখি হানাদার বাহিনীর ওপর। আমরা বিজয়পুর মুক্ত করতে সমর্থ হই। পাক বাহিনীর বিজয়পুর ক্যাম্প আমাদের দখলে চলে আসে। সম্ভবত এটিই ছিল এ অঞ্চলের প্রথম সাফল্য। এ ঘাঁটি দখল করায় আশেপাশে থাকা মুক্তিযাদ্ধারা ক্যাম্পে এসে বিভিন্ন ধরনের স্লোগানে আমাদের অভিনন্দন জানান। আমরা স্বাধীন দেশের পতাকা উড়াই।

৬ ডিসেম্বর বিজয়পুরে হানাদার মুক্ত হবার পর আমরা যখন আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে বিজয়পুরেরই এক বাংকার থেকে অন্য বাংকারের পথ ধরে হাঁটছি, এমন সময় হঠাৎ একটি মাইন বিস্ফোরণে আমার শরীর থেকে একটি পা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যে মাইনটির বিস্ফোরণ ঘটেছিল সেটি পাক সৈন্যরা চলে যাওয়ার আগে পুতে রেখে গিয়েছিল।

তারপর...

পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে আমার যুদ্ধ এখানেই শেষ হয়ে যায়। সহযোদ্ধারা আমাকে তৎক্ষণাৎ বাঘমারা চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যান। সেখানে নিয়োজিত সামরিক বাহিনীর একজন ডাক্তার আমার শরীর থেকে পা আলাদা করেন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য আমাকে তোরা হাসপাতালে পাঠানো হয়। এরপর গোহাটি, তারপর খিরকি, সবশেষে পুনের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর ১৯৭২ সনে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসি। আমার পা হারনোর সময় যারা আমার চিকিৎসায় সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

এমএম/এসআই/আইএম

 
.



আলোচিত সংবাদ