আগ্রহ থেকেই ব্যাংকিং খাতের আইকন মহসিন

ঢাকা, শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ | ১ পৌষ ১৪২৪

আগ্রহ থেকেই ব্যাংকিং খাতের আইকন মহসিন

পরিবর্তন প্রতিবেদক ৪:৪৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২০, ২০১৭

print
আগ্রহ থেকেই ব্যাংকিং খাতের আইকন মহসিন

মো. মহসিন মিয়া। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের পরিচিত মুখ। যেকোনো ব্যাংক সমস্যার সম্মুখীন হলে তাকেই সবার আগে ডাক পড়ে। মহসিনও হাসি মুখে তা সমাধান করে দেন।

.

নারায়ণগঞ্জের নিভৃত পল্লী থেকে উঠে আসা এই মানুষটি জীবনের প্রতিটি ধাপে রেখে চলেছেন মেধার স্বাক্ষর। ছাত্রজীবনে সব সময় ছিলেন সেরার কাতারে।

কর্মজীবনেও সেটিই ধরে রেখেছেন। শুধুমাত্র আগ্রহ থেকে একজন ব্যক্তি কীভাবে একটি সেক্টরের আইকন হতে পারেন, তা মহসিন মিয়াকে না দেখলে বিশ্বাস হবে না।

পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে সোনালী ব্যাংক দিয়ে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে কর্মজীবন শুরু মহসিন মিয়ার। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। নিজের যোগ্যতা, মেধা আর একাগ্রতা দিয়ে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি মহসিন মিয়া কাজ করেছেন ইন্দো-সুয়েজ ব্যাংকে।

বর্তমানে ফার্স্ট ফাইন্যান্সের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর ও সিইও’র দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। কাজপ্রিয় মানুষটি মুখোমুখি হয়েছিলেন পরিবর্তন ডটকম’র। সেখানে তিনি বলেছেন তার স্বপ্নের কথা, শিক্ষিত বেকার তরুণ নিয়ে। কথপোকথনে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সমস্যা, সম্ভাবনার নিখুঁত বর্ণনাও উঠে এসেছে।

শৈশব-কৈশোর থেকে ঢাকায় আসা, কর্মজীবনের নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে উঠে এসেছে ব্যক্তি জীবনের নানা বাঁক বদলের অভিজ্ঞতা। গুণী এই মানুষটির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পরিবর্তন ডটকম’র জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ফরিদ আহমেদ ও নিজস্ব প্রতিবেদক জাহিদ সুজন। ছবি তুলেছেন ফটোসাংবাদিক ওসমান গণি

কেমন আছেন? আপনার নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন-
আমি ভাল আছি। আপনাদের ধন্যবাদ। সোনারগাঁয়ের একটা নিভৃত পল্লীতে আমার জন্ম। সেখানেই প্রাইমারি ও হাইস্কুল শেষ করেছি। আমার পরীক্ষার রেজাল্ট সব সময়ই ভাল ছিল। নরায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে যে বছরে এইচএসসি পাস করলাম, ওই বছর আমারটাই ছিল কলেজের সেরা রেজাল্ট। তারপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়ালেখা করেছি, তখনও বিভাগে আমার রেজাল্টই শীর্ষস্থানীয় ছিল।

কর্মজীবনে কিভাবে প্রবেশ করলেন?
চাকরির জন্য আমার আগ্রহ ছিল ব্যাংকিং সেক্টরে। পড়াশুনা শেষে হয়েও গেল। সোনালী ব্যাংকের ট্যালেন্ট স্কিমে জয়েন করলাম। তরপর ইন্দো-সুয়েজ ব্যাংকে জব করলাম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনজব সেমিনার, ট্রেনিং ও ওয়ার্কশপে অংশ নিয়েছি। সে সুযোগে যুক্তরাষ্ট্রে কিছু পড়ালেখা করেছি। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশে ফিরে এসে প্রাইভেট কমার্শিয়াল ব্যাংকে চাকরি শুরু করি।

আপনাকে নিয়ে একটা কথা প্রায় শোনা যায়, যখনি কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমস্যায় পড়ে, আপনার দ্বারস্থ হয়-

দেখুন, আমি খুব বাস্তববাদী মানুষ। আপনারা ঠিকই বলেছেন। দেশের কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলোতে কাজ করতে গিয়ে আমি নিজেও দেখেছি, যখনই কোনো ব্যাংকে সমস্যা দেখা দিয়েছে, আমাকে ডাকা হয়েছে। আমাকে মূলত চাকরির জন্য কোথাও আবেদন-নিবেদন করতে হয়নি। যখনই কোনো ব্যাংকে সমস্যা হয়েছে, আমাকে অফার লেটার দিয়েছে, আমি তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি।

যেমন: শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের সমস্যা সমাধানের জন্য তৎকালীন নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ আলী আমাকে নিয়ে গেলেন। সেটা সমাধান করার পর এসআইবিএল সমস্যায় পড়ে, তখন আমি সেখানে যোগ দেই এবং ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এরপর মেঘনা ব্যাংক যখন শুরু করে তখন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আশিকুর রহমান সাহেব এবং ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আলীম খাঁন সেলিম আমাকে নিয়ে যান। এখন কর্মজীবনের পরিক্রমায় ফার্স্ট ফাইন্যান্সে যুক্ত হয়েছি।

উচ্চশিক্ষিতদের ১২ দশমিক ১ ভাগ বেকার। সব মিলিয়ে এই সংখ্যা প্রায় ৪৪ লাখ। এই বেকারত্ব ঘুচাতে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের ভূমিকা কী হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন-

চমৎকার প্রশ্ন করেছেন। কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তরের আগে আমাকে বুঝতে হবে, উচ্চশিক্ষিত বলতে কি বুঝায়? অনার্স-মাস্টার্স পাস করলো, এটাই কি উচ্চশিক্ষা? এটা পুরোপুরি ভুল ধারণা। শিক্ষা হতে হবে বাস্তবানুগ, জীবন ও কর্মমুখী।

তাহলে…
বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর কোনো দেশে এ ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা নেই। যেকোনো দেশে যান, সেখানে হচ্ছে রিয়েল ওয়ার্ড সিচুয়েশন এডুকেশন। যেটা চ্যানেল আই টেলিভিশনের শাইখ সিরাজ করেন। শহরের ছেলেমেয়েকে গ্রামে নিয়ে যাচ্ছে, উদ্বুদ্ধ করছে ফসল ফলাতে, বহুমুখী কৃষি কাজ ইত্যাদিতে।

কিন্তু তারা যখন ধান কাটতে যায়, দু’টা কাটার পর আর পারে না। তখন এই শিক্ষিত যুবকদের মাথায় আসে নতুন কি প্রযুক্তি আনলে তা দ্রুত হবে। এখন দেখেন বাংলাদেশে অটোমেটেড রাইস কাটার মেশিন চলে আসছে। যে কৃষক লেখাপড়া করেনি, সে কিন্তু এ যন্ত্রটি তৈরি করেনি। পড়ালেখা জানা ছেলেগুলোকে সেখানে নিয়ে যাওয়ায় নতুন একটি যন্ত্রের সংযোজন হয়েছে, উদ্ভাবন হয়েছে।

শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আপনার পরামর্শ কি?
সবার আগে আমাদের ভাবতে হবে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা রিয়েল ওয়ার্ল্ড সিচুয়েশন অনুগামী হচ্ছে কিনা? তাহলে বলব এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যারা বের হচ্ছে, তারা উচ্চশিক্ষিত। দেখুন আমি বহু গতানুগতিক উচ্চশিক্ষিত পাই। বহু ফার্স্ট ক্লাস হোল্ডার পাই, যারা কীভাবে ফার্স্ট ক্লাস পেল ও আমাদের কাছে কেন এসেছে তা গুছিয়ে লিখতেও পারে না। আর যারা চাকরির জন্য যোগ্যতা নিয়ে আসছে, তারা কিন্তু ঠিকই চাকরি পাচ্ছে।

আমার পরিবারে আমার আগে ব্যাংকিং সেক্টরে একজনও নাই যে, আমার জন্য সুপারিশ করবে। এ পর্যন্ত এসেছি তা আমার নিজের দক্ষতায়। বাংলাদেশে অনেক লোক পাবেন যারা নিজেদের যোগ্যতাতেই এসেছে।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বহু পিছিয়ে আছি। শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। নতুবা বেকার সমস্যা আরও বাড়বে।

গতানুগতিক শিক্ষিতদের জন্য কিছু বলুন?
আমার উচ্চশিক্ষিত বন্ধুদের জন্য মেসেজ হবে- আপনারা সত্যিকার উচ্চশিক্ষিত হোন, আপনাদের চাকরির অভাব হবে না। সৃজনশীল কাজের অভাব হবে না। দেশের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে হাজার হাজার শিক্ষিত ছেলে বের হচ্ছে। কিন্তু ব্যস্তবে তারা যা শিখে আসছে, তার কোনো প্রয়োগ থাকছে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাহিত্যের ওপর এখন পর্যন্ত হাজার হাজার ছেলে পড়ালেখা করে বের হয়েছে। কিন্তু আমরা ক’জন মাহবুব আজিজ, খালেদ হোসাইন পেয়েছি! সাহিত্যে অনেক উচ্চশিক্ষিত আছে, যে একটা কবিতা লিখতে পারে না, একটা প্রবন্ধ লিখতে পারে না। এমনকি একটা ছুটির দরখাস্তও লিখতে পারে না।

এফএ/জেডএস/আইএম

বাকি দুই কিস্তি পড়ুন সোম ও মঙ্গলবার...

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad