মানুষের বেদনার কথা লিখি : আনিসুল হক

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৭ | ৮ কার্তিক ১৪২৪

মানুষের বেদনার কথা লিখি : আনিসুল হক

জিনাত জান কবীর ১২:০০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৯, ২০১৭

print
মানুষের বেদনার কথা লিখি : আনিসুল হক

আনিসুল হক ব্যক্তিজীবনে একজন প্রকৌশলী। কিন্তু তারচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন দেশবরেণ্য লেখক। তিনি সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেও লেখালেখির টানে ফিরে এসেছেন সাহিত্য জগতে। লেখালেখির প্রতি কতটা নিবেদিত হলে সোনার চাকরি ছেড়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন অনিশ্চয়তার পথে। কিন্তু তার মেধা, মনন, সৃষ্টিশীলতায় জীবনের সঙ্কুল পথ অতিক্রম করে উজ্জ্বল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। তিনি একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক। তার লেখায় ফুটে উঠে সমাজের চালচিত্র। তিনি লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের গল্প-কবিতা-উপন্যাস। তার লেখা মা উপন্যাস বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে আন্তর্জাতিকতা লাভ করেছে। ‘যারা ভোর এনেছিল উষার দুয়ারে’, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে লেখা বাস্তব ঘটনালেখ্য। আর ‘গদ্য কার্টুন’ সমসাময়িক ঘটনাকে ব্যঙ্গাত্বক ভাষায় সহজ সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন জনসম্মুখে।

আনিসুল হক রংপুরের ছেলে। জন্মের পর মায়ের মুখের কথা লালন করেছেন নিজের মাঝে। তার শৈশব কেটেছে নিজ এলাকায়। গাঁয়ের মেঠো পথ চলতে শুনেছেন আঞ্চলিক ভাষায় ভাওয়াইয়া গান। সে গানের সুর-কথা আনিসুল হকের মনে রেখাপাত করেছিল মনে প্রাণে। সেই আঞ্চলিক ভাষায় লিখেছেন এক অসাধারণ উপন্যাস ‘নিধুয়া পাথার’। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী আনিসুল হকের বিচিত্র সৃষ্টিশীলতা কথা জানতে একগুচ্ছ প্রশ্ন নিয়ে কথা বলেছেন পরিবর্তন ডটকমের জিনাত জান কবীর

জিনাত : আপনি একজন প্রকৌশলী হয়ে কীভাবে লেখালেখি জগতে এসেছেন?

আনিসুল হক : আমি লেখালেখির জগতেই আগে এসেছি। প্রকৌশলী হয়েছি পরে। অন্য সব শিশুর মতো আমিও ছোটবেলা থেকেই লিখি। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে থেকেই কবিতা আমাকে গ্রাস করে ফেলে। ঢাকায় এসে আমার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে উঠল কবি হয়ে ওঠা। আমি প্রথম বর্ষেই ঘোষণা করি, আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষ করব বটে, কিন্তু আমি ইঞ্জিনিয়ারিং করব না। আমি কবি হব, এ জন্য আমাকে সংবাদপত্রে যোগ দিতে হবে। কাজেই এটা আমার সচেতন সিদ্ধান্ত। আমি যখন ফোর্থ ইয়ারে পড়ি, তখন আমার প্রথম কবিতার বই বের হয়, ‘খোলা চিঠি সুন্দরের কাছে’ ‘তুই কি আমার দুঃখ হবি’, বা ‘মানুষ জাগবে ফের’-- যে কবিতাগুলোর কথা আপনারা বলেন সেসব ছাত্রাবস্থায় লেখা।

জিনাত : আপনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেছিলেন। কিন্তু বেশিদিন চাকরি না করে সাংবাদিকতায় ফিরে এসেছেন। এ ব্যাপারে আপনার পরিবারের দিক থেকে কোনো আপত্তি ছিল কি না?

আনিসুল হক : আম্মা একটু মন খারাপ করেছিলেন। বলেছিলেন, সরকারি চাকরি কেউ ছাড়ে! অনেক সুবিধা। বন্ধুরা বলল, রেলের ইঞ্জিনিয়ার, বিরাট এলাকা জুড়ে তোমার রাজত্ব হবে, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের বউ হবেন ওই এলাকার নারী সমিতির সভানেত্রী। তোমার বাড়ির লিচু বাগানের বাদুর তাড়ানোর জন্যই কত লোক থাকবে। আমি তবু চলে এলাম। একদিন পালালাম, আর ফিরে যাইনি।

জিনাত : আপনি প্রথম আলোতে নিয়মিতভাবে লিখে থাকেন, আপনার লেখা গদ্য কার্টুন খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ জনপ্রিয়তার কারণ কি?

আনিসুল হক : আমি গদ্যকার্টুন কলাম লিখি ১৯৮৯ সাল থেকে। আমার চেষ্টা থাকে পরিহাস করার। মজা করার। বিদ্রূপ করার। সবাই যখন খুব গুরুগম্ভীর, আমি তখন হালকা চালে লিখি। মানুষের মনের বেদনার কথা লিখি। মানুষ দেখে আরে! এতো আমার মনের কথা। তাই হয়তো কেউ কেউ এটা পছন্দ করে থাকবেন।

জিনাত : আপনার ব্যাঙ্গাত্বক লেখাগুলো সমাজ চিত্রের এক প্রতিফলন। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?

আনিসুল হক : হ্যাঁ। আমি সমাজের অসঙ্গতি নিয়ে ব্যঙ্গ করতে পছন্দ করি।

জিনাত : মা উপন্যাসটি জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এ উপন্যাসের পটভূমি কী? শুধু তাই নয়, একাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ জনপ্রিয়তার পেছনে কারণ কী?

আনিসুল হক : মা উপন্যাসের পটভূমি মুক্তিযুদ্ধ। এটা সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত। আজাদ ছিল বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। আজাদের বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করলে আজাদের মা একমাত্র ছেলে আজাদকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। বহু কষ্ট করে আজাদকে লেখাপড়া করান। আজাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে মাস্টার্স পাস করে। দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। আজাদদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নেয়। আজাদও দুটো অপারেশনে অংশ নেয়। আজাদকে পাকিস্তানি সৈন্যরা ধরে নিয়ে যায়। রমনা থানায় রাখে। মা তার সঙ্গে দেখা করে বলেন, শক্ত হয়ে থেকো বাবা কোনো কিছু স্বীকার করবে না। ছেলে বলে, মা কতদিন ভাত খাই না। আমার জন্য ভাত নিয়ে এসো। পরদিন যত্ন করে ভাত রেঁধে ছেলের জন্য নিয়ে যান মা। গিয়ে দেখেন, ছেলে নেই। এই ছেলে আর কোনোদিনও ফিরে আসেনি। আর এই মা এরপর আরো ১৪ বছর বেঁচেছিলেন, আর কোনোদিনও ভাত খাননি। এটা জনপ্রিয় হয়েছে, কারণ এটা মুক্তিযুদ্ধের গল্প, দেশপ্রেমের গল্প, মা আর সন্তানের চিরকালের গল্প, একজন নারীর আত্মসম্মান বোধের গল্প।

উড়িষ্যার লেখক সরোজিনী সাহু ইন্টারনেটে মা পড়েন। তিনি মন্তব্য লেখেন, মা এই উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর অন্যতম। এর কারণ মানবিক দিক। এটা পড়ে আমি কেঁদেছি।

তিনি অনুবাদের ব্যবস্থা করেন, এটা উড়িষ্যা থেকে অনূদিত হয়ে বের হয়। দিল্লির লেখক ভাস্কর রায় এই বই পড়েন। তিনি এটাকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া কর্তব্য বলে মনে করেন। তিনি এটা ইংরেজিতে অনুবাদ করার সিদ্ধান্ত নেন। এটা দিল্লি থেকে প্রকাশিত হয়। পেরুর বাংলাদেশি এটা পেরুভিয়ান স্প্যানিশে এবং সুইডেনের এক বাংলাদেশি এটা সুইডিশ ভাষায় অনুবাদ করেছেন। এভাবে আমার লেখা ‘মা’ বইটি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। বিভিন্ন ভাষার মানুষ বইটি পড়ার সুযোগ পায়। আর অনেকে মনে করেন, এ বইটি সারা পৃথিবীর মানুষের জানা উচিত। যেমন মিসেস আনিসুজ্জামান মনে করেন, এটা উর্দুতে অনূদিত হওয়া উচিত। সেটা আনিসুজ্জামান স্যার বলার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগ বইটা উর্দুতে অনুবাদ করতে শুরু করেছে। এভাবে এটা ছড়িয়ে পড়ছে।

জিনাত : ‘যারা ভোর এনেছিল উষার দুয়ারে’ এ উপন্যাসটি মূল প্রতিপাদ্য কী?

আনিসুল হক : প্রধানত, গত শতকের চল্লিশের রাজনীতি। সেখান থেকে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। প্রধান চরিত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আরো আছেন শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, তাজউদ্দীন আহমদ, মওলানা ভাসানী, বেগম মুজিব। এমনকি রফিক, জব্বার, সালাম, বরকতও এ বইয়ের চরিত্র। এর পরের পর্ব উষার দুয়ারে। আগামী বছর তৃতীয় পর্ব বেরুবে আশা করি।

জিনাত : এ ছাড়াও রয়েছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নানা বিষয়ক লেখা, ‘বীর প্রতীকের খোঁজে’ উপন্যাসটি কাকে নিয়ে লিখেছেন?

আনিসুল হক : মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একাধিক বই লিখেছি। যেমন, ‘চিয়ারি বা বুদু ওরাওঁ’ ‘কেন দেশ ত্যাগ করেছিল’,‘স্বপ্ন’ প্রভৃতি। ‘বীর প্রতীকের খোঁজে’ কিছুটা তারামন বিবি বীরপ্রতীককে নিয়ে লেখা, তবে এটা তার জীবনী নয়, পুরোটাই কাল্পনিক।

জিনাত : আপনার লেখায় আঞ্চলিকতার রস খুঁজে পাওয়া যায়। ‘নিথুয়া পাথার’ উপন্যাসে আপনার অঞ্চলেরই সোঁদা মাটির ছাপ লেগে রয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?

আনিসুল হক : সৈয়দ শামসুল হক ইউনাইটেড হাসপাতালের শেষ শয্যায় আমাকে বলেছিলেন, তুমি নাকি এবার প্রথম আলোর ঈদসংখ্যায় কুড়িগ্রামের পটভূমিতে উপন্যাস লিখেছ। রংপুরের ভাষা ব্যবহার করেছ। আমাকে একজন বললেন, ‘সৈয়দ হক ভাই, আপনি শুরু করেছেন, আনিস সেটাকে সম্পূর্ণ করছে।’ আমি বললাম, হক ভাই, আপনার কাজের সঙ্গে আমার তুলনা করবেন না। হক ভাই বললেন, বিনয় কোরো না, বিনয় তোমার আত্মবিশ্বাস নষ্ট করবে।

হ্যাঁ। রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা সংলাপে ব্যবহার করেছি। কারণ ওই একটা আঞ্চলিক ভাষাই আমি জানি। ওই একটা জনপদের জীবনই আমি কাছে থেকে দেখেছি, ওই জীবন আমি যাপন করে এসেছি।

জিনাত : আপনি একজন কবিও বটে, আপনার জনপ্রিয় কবিতা ‘তুই কি আমার দুঃখ হবি’....এই কবিতা কাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন? বলতে গেলে এই কবিতা তো প্রেমিক-প্রেমিকার রসের খোরাক হয়ে পড়েছে। কেননা, একজন প্রেমিক তার প্রেমিকাকে রসাত্মকভাবে এ কবিতা শুনিয়ে থাকে এ ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

আনিসুল হক : হ্যাঁ। এ বই উপহার দিয়ে প্রেমিক প্রেমিকার চিত্ত জয় করেছে, তাদের বিয়ে ঠিক হয়েছে, তারা আমাকে বিয়ের আমন্ত্রণপত্র দিতে এসেছে, এ রকম অন্তত দুটো কেস আছে। আরো অনেক কাপলের সঙ্গেই দেখা হয়, তারা বলেন, আপনার এ কবিতা দিয়ে আমাদের প্রেম হয়েছে। শুনে আমার ভালো লাগে।

‌তবে এটা আমি কাউকে উদ্দেশ্য করে লিখিনি, বাতাসে ছড়িয়ে দিয়েছি, যার গায়ে গিয়ে পড়ে আর কী, কাগজের উড়োজাহাজের মতো...

জিনাত : আপনি একজন সাংবাদিক, লেখক, গল্পকার, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক। বলতে গেলে বহুমাত্রিক লেখক হিসেবে আপনার সুখ্যাতি রয়েছে। আপনি কোন বিষয় লিখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন?

আনিসুল হক : আমি লিখতে পছন্দ করি। লিখতে আমার ভালো লাগে। লেখাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে, সুস্থ রাখে এবং আনন্দ দেয়। যেকোনো একটা কিছু লিখতে বললেই হলো, আমি আনন্দের সঙ্গে লিখতে শুরু করে দিই। তবে কবিতা লিখতে পছন্দ করি সবচেয়ে বেশি।

জিনাত : আপনি অনেক পুরস্কারের পাশাপাশি বাংলা একাডেমি পুরস্কারও পেয়েছেন। এ ব্যাপারে আপনার কাছ থেকে জানতে চাই?

আনিসুল হক : হ্যাঁ, পেয়েছি। বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছি। পেয়ে অনুপ্রাণিত হয়েছি। তবে অনেকেই পেয়েছেন। তাদের মধ্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ লেখক আছেন। তাদের পাশে আমার নাম আছে, আমার অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করা উচিত। বাংলা একাডেমি পুরস্কার না পেলে মনে হয়, আরে এটা পেলাম না, পেলে মনে হয়, এমন কী!

জিনাত : আপনাকে ধন্যবাদ

আনিসুল হক : ধন্যবাদ সবাইকে।

জিজাক/এনডিএস

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad