উদ্যোক্তা হতে আগ্রহীদের ফ্রি পড়ার সুযোগ দিচ্ছি

ঢাকা, শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ | ১ পৌষ ১৪২৪

একান্ত সাক্ষাৎকারে মো. সবুর খান

উদ্যোক্তা হতে আগ্রহীদের ফ্রি পড়ার সুযোগ দিচ্ছি

মো. শিহাবুল ইসলাম ৬:৪৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৬, ২০১৭

print
উদ্যোক্তা হতে আগ্রহীদের ফ্রি পড়ার সুযোগ দিচ্ছি

মো. সবুর খান ড্যাফোডিল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের সফল ব্যবসায়ীদের একজন। বাংলাদেশের নব্য উদ্যোক্তাদের অনেকের কাছেই তিনি হতে পারেন আদর্শ ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। স্বল্প টাকার মূলধন নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। প্রতিভা, মেধা, ব্যাবসায়িক দক্ষতা, পরিশ্রম আর দূরদর্শিতা দিয়ে সেই ১৯৯০ সাল থেকে একের পর এক গড়ে তুলেছেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, স্কুল, কলেজ, একাডেমি, আইটি প্রতিষ্ঠানসহ তিনি এখন ১৬টি প্রতিষ্ঠানের মালিক। ‘উইটসা’ মেরিট এওয়ার্ড, ওয়ার্ল্ড কোয়ালিটি কংগ্রেস এওয়ার্ড, ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস পদক, ফিন্যান্সিয়াল মিরর বিজনেস পুরস্কারসহ তার রয়েছে অনেক সম্মাননা।

.

ব্যবসায় সফল হতে কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়, ঝুঁকি নিতে হয়, কিভাবে উদ্যোক্তা হতে হয় এ সব বিষয়ে জানতে সবুর খানের মুখোমুখি হয়েছিলেন পরিবর্তন ডটকমের প্রতিবেদক মো. শিহাবুল ইসলাম

শুরুতেই জানতে চাই আপনার প্রতিটি দিন কীভাবে শুরু ও শেষ হয়?

আমি সকাল বেলা নামাজ পড়ি। রাতে যদি একটু দেরিতে ঘুমাতে যাই তাহলে নামাজ পড়ে আবার একটু ঘুমাই। এটা আসলে নির্ভর করে আমার কাজের উপর। কখনো ৭টায় বা আবার কখনো সাড়ে ৭ টায় ঘুম থেকে উঠি। আমার বাসায় একটা অফিস আছে। সাধারণত যদি সকাল ৯ টায় কোনো এপয়েন্টমেন্ট না থাকে তাহলে সেখানে প্রাথমিক কাজগুলো করে থাকি। কেউ কোথাও আমার নির্দেশনার জন্যে অপেক্ষা করছেন কিনা সে বিষয়গুলো খেয়াল রাখি। কারণ অনেকে আছে যারা রাতে কোনো ই-মেইল করেছেন, হয়তো রাতে আমি কোনো সিদ্ধান্ত দিব, কিন্তু উত্তর না দেওয়ায় তারা কাজ করতে পারছেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এরকমভাবে দিনের শুরু হয়। হয়তো মাসে দু-একটা দিন ব্যতিক্রম হয়। কারণ আমি আমার কাজটাকে অসম্পূর্ণ রাখতে চাই না। সকালের নাস্তা করার পর পত্রিকা পড়ি। এছাড়া সকালে আমি চেষ্টা করি দেরি করে এপয়েন্টমেন্টটা শুরু করতে। এর বাইরে ভিভিআইপির প্রোগ্রাম, যেগুলোর টাইম আসলে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, সেগুলো ব্যতীত খুব চেষ্টা করি সকাল সাড়ে ১০টা বা ১১ টার দিকে এপয়েন্টমেন্ট দেওয়ার। কারণ আমি সকালে যদি কাজ না করতে পারি তাহলে না করা কাজগুলো সারাদিনে জমে যাবে। ঘুম থেকে ওঠার পর এক দেড় ঘণ্টায় চেষ্টা করি পেন্ডিং কাজগুলো শেষ করার জন্য। অনেক সময় আমি ফোন রিসিভ করতে পারি না। তো রাস্তায় যখন ট্র্যাফিক জ্যামে পরে যাই তখন তাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলি। রাতে আসা ই-মেইলগুলো সকালে চেক করার পর যাকে যে নির্দেশনা দেওয়া দরকার সেগুলো দিয়ে দেই। এছাড়া রাস্তায় যখন চলি তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে নজর রাখি। এটা কিন্তু করি আমার প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি বাড়াতে। সেখানে যদি দেখা যায় যে আমাদের ভেতরের কিছু বিষয় নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা কথা বলছে, যে এই জিনিসটা ঠিক না, আমাদের এরকম হলে ভালো হয়। তখন আমি এর দায়িত্বে থাকা লোকটার সঙ্গে কথা বলি, যে তারা কেন এমন কথা বলছে? এদের সমস্যা সমাধান করুন।’

তার মানে আপনি প্রত্যেকটি কাজ নিজে ধরে ধরে সম্পন্ন করেন?

হ্যাঁ, প্রতিটা ক্ষেত্রে আমার লোক সেট করা আছে। আমাকে যে কাজটা করতে হয়, সেটা হল ক্যাপ্টেন্সের ভূমিকা পালন করতে হয়। যে এই কাজটা তুমি করো, এই কাজটা অমুক করবে। প্রত্যেকটা লোককে বলা আছে, যেকোনো কাজ করার আগে যেন আমার কাছ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়।

৯০ দশকে আপনি প্রযুক্তি ব্যবসার দিকে অগ্রসর হন, এই চিন্তাটা তখন মাথায় আসলো কীভাবে? বলা যায় বাংলাদেশে তখন প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগেই নাই।

আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন অনার্সে ১০০ মার্কস কম্পিউটার সাইন্স বিষয়টি পেয়েছিলাম। সেখানে আমি সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট করি। ব্যবসা করার পরিকল্পনা আগে থেকেই ছিল। আর স্বাভাবিকভাবে মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর যখন ব্যবসা করব বলে পরিকল্পনা করলাম, তখন দেখলাম আমার এক্সপেরিয়ান্সই আছে কম্পিউটার লাইনে। অন্য লাইনে এক্সপেরিয়ান্সই নাই।

কিন্তু আপনি তো পরিসংখ্যান বিষয় নিয়ে লেখাপড়া করেছেন?

আমাদের সময় ১৯৮৩ সালে কিন্তু কম্পিউটার সাইন্স বাংলাদেশের কোনো ইউনিভার্সিটিতে ছিল না। শুধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল। ওই সাবজেক্টে ভালো মার্কস পাওয়ার কারণে আমার কাছে মনে হল, আমি যেহেতু ব্যবসাই করব, আর কম্পিউটার সাইন্সে যেহেতু আমার কনফিডেন্স বেশি আছে সেহেতু আমি একটা ট্রেনিং সেন্টার খুলি। সেখান থেকে আমিও নিজেও কিছু শিখতে পারলাম আর আমি যা জানি সেটা অন্যদেরও শিখাতে পারব। এর মাধ্যমেই আসলে আমার যাত্রা শুরু হয়। সেই ট্রেনিং থেকেই হয়তো পরে কম্পোজ করা, কম্পিউটার সামগ্রী বিক্রি শুরু করা। আসলে ওইটাই আমাকে ধীরে ধীরে এতদূর পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। আমার প্রথম কোম্পানিই হচ্ছে ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স।

এই ব্যবসা শুরু করতে মূলধন কোথায় থেকে সংগ্রহ করলেন, সেটার পরিমাণ কতো ছিল?

আমি ৩০০ টাকার একটা স্কলারশিপ পেয়েছিলাম। আর আমার পরিবার থেকে আর্থিকভাবে যে সহযোগিতা পেয়েছি, তাতে ওই টাকাটা খরচ করার প্রয়োজন হয়নি। তো ওই টাকাটা আমি জমিয়ে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম যে এক সময় কাজে লাগতে পারে। অনার্সে আসার পর ভাবলাম এই টাকাটাই আমার ব্যবসার পুঁজি হতে পারে। আর আমি আমার রেজাল্ট ভালো রেখেছি, কারণ রেজাল্ট ভালো করার কারণেই কিন্তু অনার্সে ও মাস্টার্সে  স্কলারশিপটা পেয়েছিলাম। পুঁজির পরিমাণটা ঠিক মনে নাই, তবে যতদূর মনে পরে সেটা ২৫, ২৬ বা ৩০ হাজার টাকা মত ছিল। এটাই আমার ব্যবসার প্রথম মূলধন। তখনকার সময় মূল সুবিধা ছিল জিনিসপত্রের দাম অনেক কম ছিল।

কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারের পর ড্যাফোডিল পিসি বা কম্পিউটার দিয়ে মূলত আপনার ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়, কিন্তু সেটার দিকে আপনার মনোযোগ দেখা যাচ্ছে না!

না, আসলে ড্যাফোডিল পিসির দিকে এখনো আমার মনোযোগ বেশি। এটা হয়তো আমি মনে করি অনেকেই বুঝতে ভুল করে। কারণ ড্যাফোডিল পিসির দিকে নজর আছে বলেই ইউনিভার্সিটি (ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি) ভালো করছে। আমি যে ইউনিভার্সিটির প্রত্যেকটা ছাত্র-ছাত্রীকে একটি করে ল্যাপটপ ফ্রি দিচ্ছি, এই সাহসটা কোথা থেকে পেলাম? এই সাহসটা কি ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের সাহস নয়? একই সাথে ডিআইটিসহ আমার অন্যান্য যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, তারাও ছাত্র-ছাত্রীদের ল্যাপটপ ফ্রি দিচ্ছেন। কি কারণে দিতে পারছে? আমি যদি ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের দিকে নজর না দিতাম, তাহলে কি এটা দেওয়া সম্ভব ছিল? তার মানে আমার যেটা মেরুদণ্ড ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স সেটার দিকে নজর অবশ্যই আছে এবং সেটার শক্তি নিয়েই অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নত করতে পারছি। কারণ আমি যদি বলি ইউনিভার্সিটিতে যে সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটা কে তৈরি করছে? সেটা কিন্তু ইউনিভার্সিটি বা থার্ড পার্টি করে দিচ্ছে না। এই ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স তৈরি করে দিচ্ছে। এছাড়া অত্যন্ত সাহসী ও বড় একটি কাজ যে পুরো ইউনিভার্সিটি কম্পিউটারাইজড করা, এটা তো আমার ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সই করে দিচ্ছে। আজকে আমি শেয়ার হোল্ডারদের ১৫ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিচ্ছি। কোথায় থেকে দিচ্ছি? বাংলাদেশের কোনো আইটি কোম্পানি তো আমার মত এভাবে দিতে পারে নাই। তাহলে নজর না দিলে আমি কিভাবে তাদের ডিভিডেন্ড দিলাম? হা হয়তো ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের এক্টিভিটিসগুলো চোখে পড়ে না, কারণ এখন আমি শিক্ষার দিকটাতে বেশি ফোকাস করছি, তাই সেটাই সবাই বেশি দেখে।’

বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটির (বিসিএস) সভাপতি ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) পরিচালক ছিলেন, এখান থেকে এমন কিছু শিখেছেন যা আপনার ব্যবসার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে?

অবশ্যই এরকম বড় দুইটা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা শিক্ষণীয় ব্যাপার ছিল। বিসিএস বা ডিসিসিআই এর মত দুই দুইটা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে আমার সীমাবদ্ধতা ধরতে পেরেছি। আমার ত্রুটিগুলোকে শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করেছি, আর আমি যেটা বিশ্বাস করি সেটা ওখানে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছি।

আপনার সাফল্যর ক্ষেত্রে কি এই অভিজ্ঞতা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে?

অবশ্যই। আমি মনে করি বিসিএস-এ সাফল্য থাকার কারণেই এখানকার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই ডিসিসিআইয়ে ভোটের মাধ্যমে পরিচালক নির্বাচিত হই। এক্ষেত্রে বিসিএস'র কাজের অভিজ্ঞতা অনেক সাহায্য করেছে। আবার একই সময় ডিসিসিআইয়ে পরিচালনায় সফল হওয়ার কারণেই ২০১২ সালে যখন এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করি, তখন কিন্তু বলা যায় ভালো সাপোর্ট নিয়ে জিতে যাই। এজন্য এই দুই দুইটা প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। একই সময় এই দুইটা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে আমার যে সুবিধা হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কে যে ধারণা সেটা সম্পর্কে জেনেছি। অনেক জায়গায় গেলেই আমি বলি ঢাকা চেম্বার থাকা অবস্থায় ৫৭টি সেক্টরে কাজ করতে হয়েছে। যেমন, পাট, চামড়া, মানব সম্পদ, রিয়েল স্টেট, সড়ক ও পরিবহণসহ ব্যবসার প্রত্যেকটা ক্ষেত্র সম্পর্কে জানতে হয়েছে, কথা বলতে হয়েছে। এখানে আমাকে কেউ এসে বলে নাই যে আপনি কম্পিউটারের লোক শুধু এটা সম্পর্কেই বলেন।

যে জায়গায় আছেন বা অবস্থান করছেন সেখান থেকে সামনে আপনার লক্ষ্য কি?

এখন আমার লক্ষ্য হল, আমার বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আছে সেগুলোকে প্রযুক্তির সাথে যুক্ত করে এমনভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের তৈরি করা যাতে আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা পাশ করে বের হওয়ার পর কেউ যেন বেকার না থাকে। আমার টার্গেট হচ্ছে এখান থেকে হাজার হাজার উদ্যোক্তা তৈরি করা, যারা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করবে। এছাড়া আমরা খুঁজে বের করছি কাদের আসলে উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছে আছে। সে অর্থের জন্য পড়তে পারছে না, কিন্তু তার উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবল ইচ্ছে আছে। তাদেরকে বিনা পয়সায় পড়ার সুযোগ করে দিচ্ছি। এতে হবে কি ওই ছেলে বা মেয়েটা এই সুযোগ পেয়ে সমাজে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে পারবে। আমি সবুর খান একা যদি এতোগুলো প্রতিষ্ঠান করতে পারি, এতোগুলো মানুষের কর্মসংস্থান করে দিতে পারি, তাহলে আমার বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যদি হাজার হাজার সবুর খান তৈরি হয়, তাহলে তো আমি মনে করি বাংলাদেশে কেউ বেকার থাকবে না। এটাই এখন আমার মূল পরিকল্পনা।

আগামীকাল পড়ুন: টাকা হারানোটাই ছিল জীবনের টার্নিং পয়েন্ট

এসআই/জেআই

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad