সে আমাকে খুব আন্ডারএস্টিমেইট করত

ঢাকা, বুধবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ৫ আশ্বিন ১৪২৪

সে আমাকে খুব আন্ডারএস্টিমেইট করত

আতিক রহমান পূর্ণিয়া ২:২০ অপরাহ্ণ, জুলাই ২০, ২০১৬

print
সে আমাকে খুব আন্ডারএস্টিমেইট করত

বিচ্ছেদের পরও কিংবদন্তি লেখক হুমায়ূন আহমেদের নামের সাথে কোনো না কোনোভাবে এখনো আলোচনায় আসে গুলতেকিনের নাম। হুমায়ূন নিজেই তার বিভিন্ন লেখায় অমর করে রেখে গেছেন প্রথম স্ত্রী গুলতেকিনকে। হুমায়ূন আহমেদের কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্পে তিনি যেন এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।

গুলতেকিন খান থেকে গুলতেকিন আহমেদ। আবার গুলতেকিন খানে প্রত্যাবর্তন। জীবনের গল্প এর মধ্যে গড়িয়েছে অনেক দূর। শব্দ আর সেলুলয়েডে গল্প বলা মোহন-কথকের পাশে আধা-জীবন কাটানো এই মানুষটার গল্প কেমন? তা জানতেই তার সাক্ষাৎকারের জন্য এই প্রতিবেদকের প্রায় ৪ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা। শেষতক গুলতেকিন খান পরিবর্তন ডটকমের কাছে উজাড় করলেন তার অনেক অব্যক্ত কথা। একইসঙ্গে জানালেন গত এক যুগে এটাই তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি আতিক রহমান পূর্ণিয়া। আজ পড়ুন ১ম পর্ব।

আপনার ছোটবেলার কথা শুনতে চাই।
আমার জন্ম ধানমন্ডির দখিন হাওয়া নামের বাড়িতে। আমার বোন আর মা আমি বড় হবার পর বলতেন, আমার জন্মের দিন ছিল আষাঢ় মাসে। বিকালবেলা। সেদিন আকাশ খুব মেঘলা ছিল। ছোটবেলায় কখনও হাসতাম না। সবাই বলতো মেঘলা দিনে জন্ম বলেই আমার মুখ সবসময় মেঘলা হয়ে থাকতো। বড় হতে হতেও মুখে খুব হাসি ছিল না। মনে হতো এত হেসে কী হবে? আমার মুখটাই মেঘলা। জীবনে প্রথম খুব মন খুলে হেসেছি ইউএসএ গিয়ে। আগে মনে হতো এতো হাসার দরকার কী?

আপনার জীবনে কার প্রভাব বেশি?
আমার দাদা ইব্রাহীম খান (প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ)। দাদা-দাদু খুব আদর করতেন। তারা সবাই সাহিত্য চর্চা করতেন। লিখতেন। চমৎকার একটা পরিবেশে বড় হয়েছি। দখিন হাওয়া সুন্দর একটা বাড়ি ছিল। সারা বাড়িতে বিভিন্ন ফলের গাছ। মায়ের শখ ছিল ফুলের বাগান করার। আমি আমার মায়ের গুণগুলো পেয়েছি।

শহীদুল্লাহ হলে থাকার সময়, ইউএসএ-তেও ফুলের বাগান করেছি। প্রতিদিন গান শুনি। বাবার চেয়ে মায়ের সাথে ক্লোজ ছিলাম।

আমার বেড়ে ওঠার পেছনে আমার মা-বাবার  অবদান অনেক। প্রথমে মা’র কথা বলতে হলে বলা যায়, মা আমার জীবনে স্বাধীনভাবে চলার অনুপ্রেরণা। আমি তাকে কখনো দেখিনি ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে কারো সাথে আলাপ করতে, বা কারো অগোচরে তাকে নিয়ে কথা বলতে। 

আর আমার বাবা বাসায় সবসময় রিডার্স ডাইজেস্ট আর টাইমস পত্রিকা রাখতেন। আমি স্কুল শুরুর আগেই এই দুটো থেকে ছবি দেখতাম। পরে পড়তে শিখলাম। বাবাই আমাকে প্রথম পড়তে উৎসাহ দেন। তিনি খুবই বন্ধুসুলভ ছিলেন। 

আমার জীবনে দাদার ইনফ্লুয়েন্স বেশি। অনেক পরে বুঝেছি যে অজান্তেই মায়ের প্রভাব পেয়েছি। আমার বিয়ের সময় মা সব থেকে বেশি কান্নাকাটি করেছেন। কাঁদতেন আর বলতেন, আমার আর পড়াশুনা হবে না। ’৭৬ এর মার্চের ১৪ তারিখ এসএসসি পরীক্ষা দিলাম আর ২৮ তারিখ বিয়ে। শুধু মায়ের জন্য ৮/৯ বছর বিরতি দিয়েও পরে পড়াশুনায় ফিরে এসেছিলাম।

পড়াশোনা কোথায় করেছেন?
এসএসসি আজিমপুর গার্লস-এ। এইচএসসিতে হলিক্রসে পড়তাম। পরীক্ষার ৩ মাস আগে আমার বাচ্চাদের বাবা (হুমায়ূন আহমেদ) আমাকে জোর করে ইউএসএ নিয়ে গেল। পরীক্ষা দেওয়া হল না। আমি যেতে চাইনি। শেষে আমার দাদাকে চিঠি লিখে আমাকে যেতে বাধ্য করল। ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা ছিল। মেডিকেলে পড়তে পারলাম না। একসময় আমার সাবেক স্বামীর ছোট ভাই, মানে আহসান হাবীবের বিয়ের পর সংসার বড় হল। এক বাসায় হয় না। শাশুড়ি থেকে আলাদা হলাম। তখন আমি বললাম, এইচএসসি দেব। মোহনগঞ্জ (হুমায়ূন আহমেদের নানা বাড়ি) গিয়ে মাত্র সাতদিনের মধ্যে সব ফরমালিটি শেষ করে পরীক্ষা দিয়েছি। মাহবুব মামা ( হুমায়ূন আহমদের মামা) যে কলেজে ছিলেন সেখানে ব্যবস্থা করলেন।

এইচএসসি শেষে আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে চাইলাম। আমার সাবেক স্বামী বললেন তোমাকে ইডেনে ভর্তি করিয়ে দিচ্ছি। আমার খুব মন খারাপ হল। বললেন মেডিকেলতো পারছোই না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও না।

একদিন আমার বড় মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে তার (মেয়ের) এক বান্ধবীর মা’র কাছ থেকে জানলাম যে লং গ্যাপ থাকলেও তখন আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ আছে। তিনি হেল্প করতে চাইলেন। আমি আমার সাবেক স্বামীকে জানালাম। তিনি বললেন কোনো হেল্প করতে পারবেন না। আমি খুব ছুটাছুটি করে কষ্ট করে ভর্তি ফরম আনলাম।

তখন পরিবারের একজন খুব অসুস্থ। সবাই হাসপাতালে ছুটাছুটিতে ব্যস্ত। একদিন সকালে হাসপাতালে খাবারদাবার পাঠিয়ে পত্রিকা নিয়ে বসেছি। দেখি লিখা- আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। হুট করে ভাবলাম, যাই পরীক্ষাটা দিয়ে আসি। ততদিনে আমাদের গাড়ি কেনা হয়েছে।

কত সালে?
৮৯ সালে। গাড়ি করে যাচ্ছি। সাথে আমার সাবেক স্বামী হুমায়ূন আছেন।

আমি নামলাম এনেক্স ভবনে। মেয়ের বাবাও নামল। জানতে চাইলাম সে কোথায় যাবে। বলল তার ডিউটি এনেক্সের ১ নম্বর রুমে। আমারও পরীক্ষা ওই রুমে। আমি বললাম, তুমি থাকলে আমি পরীক্ষা দিব না। একটু তর্ক হল। জানেন, তার পড়াশুনায় আমি সব সময় হেল্প করেছি। কিন্তু সে আমার পড়াশুনায় কোনো দিন হেল্প করেনি। সেদিন কিছু একটা বলে সে চলে যায়। ওই রুমে ডিউটি দেয়নি।

পরেরদিন পত্রিকায় দেখলাম ২৯ হাজার পরীক্ষা দিয়েছে। নেবে মাত্র ২৯শ। যেদিন রেজাল্ট সেদিন আমার সাবেক স্বামী বলল, আমি রেজাল্ট দেখে আসি। রেজাল্ট দেখে এসে সে জানতে চাইল, তুমি কি ঠিক রোল নম্বর দিয়েছ? আমি বললাম, হ্যাঁ।

সে বলল, তুমি চান্স পেয়েছ। তাও অনেক উপরের দিকে।

ভাইভার দিন আমার সাবেক স্বামী বলল, তুমি সাবজেক্ট সোশ্যালজি নাও।

তাকে আমি বলেছিলাম, তোমার ফ্রেন্ড বা কাউকে, টিচারদের বলবে না যে আমি ভর্তি হচ্ছি। সে আমাকে খুব আন্ডারএস্টিমেইট করত। এটা আমার খুব খারাপ লাগত।

আমি খুব হ্যাংলা পাতলা ছিলাম। ভাইভার দিন স্যার আমাকে বললেন, তুমি ইংলিশে পড়। আমি বললাম- না। আমি সোশ্যালজি  লিখে দিয়ে আসলাম। বিকেলে আমার এক্স হাজবেন্ড আসলেন। বললাম, তোমার কথায় সাবজেক্ট সোশ্যালজি দিয়েছি।

সে বলল, খুব ভাল। তুমি ইংলিশ পারবে না। তোমার জন্য কঠিন হয়ে যাবে। আমি তাকে বললাম, তোমার পকেটে ইউনিভার্সিটির যে ডায়েরিটা আছে, দাও। আমি নিজেই তার পকেট থেকে ডায়েরিটা নিলাম।

আমার খুব ইগোতে লাগল। কেন বলল, আমি ইংলিশ পারবো না! আমি ডায়েরি থেকে ফোন নম্বর নিয়ে যে স্যার ভাইভা নিয়েছিলেন তাকে ফোন করলাম। বললাম, স্যার আমি কি সোশ্যালজির পরিবর্তে ইংলিশ নিতে পারি? তিনি বললেন- হ্যাঁ। আর একটা কথা খুব ইগোতে লেগেছিল। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর হুমায়ূন বলেছিল, আমাকে সে পোষ্য কোটায় ভর্তি করাতে চেয়েছিল। আমি কেন পোষ্য কোটায় ভর্তি হব!

* বৃহস্পতিবার পড়ুন গুলতেকিন খানের জীবনের আরো না জানা কথার দ্বিতীয় পর্ব।

এআরপি/এসজে/এইচএসএম

আরও পড়ুন
‘বাবা’ হুমায়ূন আহমেদের জন্য কেবল দুহাত তুলে দোয়া…
আমার বাচ্চাদের বাবা রেগে গেল

print
 
nilsagor ad

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad