নারীবাদের ধারণাটা মানবতার: অপর্ণা সেন

ঢাকা, রবিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | ৬ ফাল্গুন ১৪২৪

নারীবাদের ধারণাটা মানবতার: অপর্ণা সেন

মাসউদ আহমাদ ১০:১৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৫, ২০১৮

print
নারীবাদের ধারণাটা মানবতার: অপর্ণা সেন

ষোড়শ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিতে ঢাকায় এসেছেন ভারতের খ্যাতিমান অভিনেত্রী-পরিচালক-সম্পাদক অপর্ণা সেন। অভিনয়-পরিচালনা ও সাম্প্রতিক কাজ নিয়ে কথা বললেন পরিবর্তন ডটকমের সঙ্গে...

আপনি অভিনয়-পরিচালনা ও সম্পাদনার কাজে একজীবন পার করে দিলেন; জানতে চাইছি, প্রথম ছবি ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’র মাধ্যমে নতুন পরিচয়টা সামনে এলো কীভাবে?

আমি তো অভিনয় নিয়েই ছিলাম। অনেকগুলো ছবি করার পর একসময় মনে হলো- যে ধরনের ছবিতে আমি কাজ করতে পছন্দ করি, আমার ভালোলাগে, সেরকম কাজ পাচ্ছিলাম না। তখন আমি লিখতে শুরু করলাম। পরে একটা গল্প লিখলাম এবং লেখা শেষে দেখি যে, সেটা চিত্রনাট্য হয়ে গেছে। ইংরেজিতে লিখেছিলাম। সবাই দেখে বলল, লিখেছিস ভালো কথা। ওটা তুলে রাখ। কেউ করবে না। ওটা দিয়ে কিছু হবে না। কিন্তু আমি যেটা করলাম- ভাবলাম যে, আমার গুরু সত্যজিৎ রায়কে একবার দেখাই। তিনি সেটা পড়ে আমার কাঁধে চাপড়ে দিয়ে বললেন- লট অব হার্ট। সত্যজিৎ বললেন, বানিয়ে ফ্যাল। আমি তো কিছুই জানি না। কীভাবে করব। তিনি বললেন, তুই এক কাজ কর। শশী কাপূরকে চিঠি ল্যাখ। আমি লিখলাম। কাজটি খুব সহজ হয়ে গেল। এখন মনে হয়, প্রথম ছবি সহজেই হয়ে যাওয়ায় এখন কঠিন হয়ে গেছে নতুন সিনেমার কাজ করতে। এখন দর্শক পাল্টেছে, টাকা লগ্নি করার মানুষও বদলেছে। ছবি বানানোর ক্ষেত্রে অনেক বাধা ও কন্ডিশন এসে যুক্ত হয়ে পড়ছে। বাংলা ছবি বানানোটাও কঠিন। বলে দেয়, কে অভিনয় করবে। ইংরেজি বা হিন্দিতে তৈরি করতে হবে।

আপনার সর্বশেষ কাজ ‘সোনাটা’ নিয়ে বলুন?

মধ্যবয়স পেরুনো তিনজন নারীকে নিয়ে ছবিটি তৈরি হয়েছে। তারা নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকে। কারো উপর ডিপেন্ডেন্ট নয়। এর চিত্রনাট্য লিখেছেন মহারাষ্ট্রের একজন লেখক। তিনি লিখেছেন ইংরেজিতে। আমি এখন একটু চিন্তিত, আপনাদের এখানে কীভাবে এটা দেখানো হবে। ওপাশের ঘরে যেভাবে দেখলাম, পর্দায় ডিস্টার্ভ মনে হয়েছে। নানারকম শব্দ আসছে। যেভাবে বানিয়েছি, তা এক্সাক্ট দেখতে পারব কিনা।

আপনি এখন কী করছেন?

এখন কোনো কাজ করছি না। ছবি বানাচ্ছি। সম্পাদনা করতাম একসময়, সেটা তো ছেড়ে দিয়েছি। আমার ছবি নিয়ে আছি। সর্বশেষ কাজ ‘সোনাটা’ এখন দেখানো হবে। প্রতিটি ছবি তৈরির পর সন্তান হয়ে ওঠে। কিন্তু দর্শক কমে গেছে তা নয়, খরচটা বেড়ে গেছে। আমেরিকায় অনেক দর্শক আছে বাংলা ছবির, কিন্তু সেখানে পৌঁছানোটা খরচের ব্যাপার। তাই কাজটা কঠিন হয়ে পড়ছে।

আপনার দাদু ব্রহ্মানন্দ দাশ, তারই এক দাদার ছেলে জীবনানন্দ দাশ; আপনার আত্মীয়- তাকে নিয়ে বলুন?

জীবনানন্দ আমার আত্মীয়, সেটা দাদুর দিক থেকে। আমার পরিষ্কার মনে আছে, ছোটবেলায় আমি তাকে মিলু কাকা বলে ডাকতাম। তিনি বংশের সবচেয়ে বড় ছেলে। অনেক বড় কবি।

জীবনানন্দ বেঁচে থাকতে সাফল্য পাননি, অথচ এখন তার সাফল্য বিস্ময়কর...

জীবিতাবস্থায় সবাই সাফল্য পায় না। আপনি ভ্যানগগের কথাই চিন্তা করুন। অনেকে মৃত্যুর পরে পান। তবে আমি জীবনানন্দ দাশকে কখনো আত্মীয় হিসেবে ভাবিনি, কবি হিসেবে ভেবেছি। কারণ তিনি আত্মীয়তার অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি তো আধুনিক বাংলা ভাষাকে নতুনভাবে লিখলেন- রচনা লিখলেন। যেটা বাংলায় কখনো লেখা হতো না। রবীন্দ্রনাথ তার সময়ে লিখেছেন, জীবনানন্দ লিখলেন তার মতো করে। আমরা চিরকাল বলি যে, মেঘলা দুপুর; জীবনানন্দ লিখলেন ভিজে মেঘের দুপুর। ভাষায় যে নতুন জিনিষের ব্যবহার এবং সেই ভাষাতেই কবিতা লিখলেন। এটা এমন এক নতুন নির্মাণ- মানুষের বুঝতেও অনেকটা সময় লাগবে।

আপনার অনেক লেখা ও কাজে নারীবাদের প্রকাশ দেখে উঠি- নারীবাদ নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

আমি ব্যক্তিভাবে নারী হওয়ার কারণে কখনো সমস্যায় পড়িনি। ভারতবর্ষে এখন ইংরেজিটা বড় ভাষা। অনেকেই এই ভাষায় কথা বলছেন। অনেকে আমাকে ইংরেজিতে ছবি করার জন্য বলেন। টাকাও পাওয়া যাবে। কিন্তু সেটা করলে খরচ বেড়ে যাবে। আর্টিস্টদের চারগুণ দিতে হবে। কিন্তু আমি নারীদের নানাভাবে দেখেছি। কাজের জায়গায় ও সমাজে। নারী তো মানব সম্প্রদায়েরই অংশ। অর্ধেক। মানবতার একটা অংশ হচ্ছে নারীবাদ। আগে নারীবাদ ছিল জঙ্গির মতো। এখন অনেকটা অগ্রসর হয়েছে। ধারণাটা অনেকটা বদলেছে। আমার কাছে এটা সবসময়ই মানবতারই অংশ। তাদের ছোট করা মানে সমাজকেই বেঁধে ছোট করা।

এই যে একজন অপর্ণা সেনকে মানুষ বিশেষভাবে চেনে ও পছন্দ করে- কী অনুভূতি হয়?

আমি এখানে এলাম ১৮ বছর পর। এখানে আসার পর মানুষ আমাকে চিনছেন, আমার কাজের সঙ্গে পরিচয় আছে অনেকের জানাচ্ছেন। এটা তো অনেক বড় ব্যাপার। আমি আনন্দিত। আমার ভাগ্যও অনেকটা আমাকে এগিয়ে দিয়েছে সারাজীবন।

এমএ/এমএসআই

 
.

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad