‘প্রথম গান রেকর্ডিংয়ের দিন মা মারা যান’

ঢাকা, বুধবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৭ | ৩ কার্তিক ১৪২৪

‘প্রথম গান রেকর্ডিংয়ের দিন মা মারা যান’

মাসুম আওয়াল ৫:৪৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০১৭

print
‘প্রথম গান রেকর্ডিংয়ের দিন মা মারা যান’

সঙ্গীতাঙ্গনের প্রিয়মুখ গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফরায়জী। সোমবার (১৭ জুলাই) গুণী এই মানুষটির ৫৯তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৫৮ সালের এ দিনে ময়মনসিংহের বকশিমুল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জন্মদিন উপলক্ষে রোববার সন্ধ্যায় উত্তরার বাসায় পরিবর্তন ডটকমের মুখোমুখি হন শহীদুল্লাহ ফরায়জী।

সে আলাপচারিতায় ওঠে এসেছে তার জীবন ভাবনা ও পরিবারের কথা। শুনিয়েছেন রাজনীতি করতে এসে জনপ্রিয় গীতিকার হয়ে যাওয়ার গল্প।

জন্মদিনকে সামনে রেখে জীবন নিয়ে আপনার ভাবনার কথা জানতে চাই।

জন্মের মধ্য দিয়েই আমি একটি নশ্বর দেহ পেয়েছি। এই যে নশ্বর দেহ অবিনশ্বর আত্মা এটা নিয়েই জীবন। আমার আত্মা প্রতিনিয়ত চায় সৌন্দর্য আহরণ করতে, আত্মা চায় স্বর্গীয় উচ্চতা পেতে আর মাটির দেহ চায় অধপতিত হতে। এই দ্বন্দ্ব আমার ভেতরে, প্রতিটা মানুষের ভেতরে আছে। এ দ্বন্দ্ব নিয়ে প্রতিটা মানুষকে মানব হতে হয়।

জন্মদিন আসলে কী অনুভূতি কাজ করে?

আমার জন্মদিনের অনুভূতি হলো— মানব রূপে জন্মগ্রহণ করেছি এটা ধ্রুব সত্য। তবে মানুষ রূপে পৃথিবী থেকে বিলীন হতে পারব কি-না জানি না! মানুষ রূপেই বিলীন হতে চাই। মানুষ হওয়া জন্য যে যোগ্যতা, মানসিকতা বিবেক— এগুলো অর্জন করতে হয়। জীবনকে ন্যায়ের মধ্য দিয়ে, পবিত্রতার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করতে হয়— সেটা আমি অর্জন করেছি কি-না?

জীবনের এতো বছর পার করেছি— এটা লোভ-লালসা দেহ শাসিত জীবন না, বিবেক দিয়ে শাসিত জীবন সেগুলো পর্যালোচনা করতে হয়। জীবনের প্রতি দায় থাকতে হয়, দায়বিহীন জীবনের কোনো সার্থকতা নেই। এই সব বিষয় আমাকে পীড়া দেয়। জীবন সৃষ্টির যে রহস্য সেটা আমরা কি উৎঘাটন করতে পারি? এগুলো যদি অনুধাবনই না করতে পারি তাহলে সেই জীবন সার্থক নয় ব্যর্থ।

আমার প্রতি মুহূর্তেই নিজের সাথে নিজের অনুশোচনা চলে। জীবন চালাতে গিয়ে ভাবতে হয়। তবে বলতে পারি লোভ-লালসার চেয়ে আমি বিবেককেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছি। সবসময় বিবেকের তাড়নাতেই চলেছি। আমার ভেতরের মমত্ববোধকেই জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি।

আপনার বেড়ে ওঠার পরিবেশ ও পরিবার প্রসঙ্গে বলবেন?

আমার বাবার কোনো স্মৃতি নাই। বাবার কোনো ছবিও আমি দেখি নাই। খুব ছোটবেলায় বাবা মারা গেছেন। আমার মা আর বড় ভাই আমাকে বড় করেছেন। মা বলতেন এমন কাজ করবে না যা ভালো দেখায় না। বাবা সাইদুর রহমান ফরায়জী, ভায়ের নাম আমানুল্লাহ ফরায়জী, মায়ের নাম সকিনা খাতুন। ভাইয়ের কাছ থেকে শিখেছি মানুষের মধ্যে গভীর মমতা, মূল্যবোধ থাকতে হয়। ভেতরে সৌন্দর্যবোধ থাকতে হয়। ভাই বই সংগ্রহ করতেন আমি সেগুলো পড়তাম।

আপনার শৈশব কৈশোর কেমন ছিল?

যেহেতু বাবা নাই, শৈশব ছিল নিয়ন্ত্রিত। জীবনে হইচই ছিল অনেক কম। সেই নিয়ন্ত্রিত জীবনই এখনো যাপন করে চলেছি। মা চাই তো আমারে ছেলে সবচেয়ে নিষ্পাপ থাকুক, ভালো মানুষ থাকুক।

ঢাকা শহরে কীভাবে আসা হয়?

ঢাকা এসেছিলাম বিপ্লব করতে, সমাজ পরিবর্তনের তাগিদে। ১৯৮৮ সালে ঢাকায় আসি। একসময় মনে হলো আমার ভেতরে যে সমাজ পরিবর্তনের চেতনা সেটা আমি আমার লেখার মধ্য দিয়েও করতে পারি। গান লেখার ঝোঁক ছিল মাথায়। আমি ভাবলাম মানুষের মননে যদি নাড়া দেওয়া যায়, মনন যদি আলোকিত করা যায়, সমৃদ্ধ করা যায়— তাহলে সমাজ যেমন মানবিক হবে, রাষ্ট্র মানবিক হবে। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম গান লিখে মানুষের মন স্পর্শ করতে চাই। সেই তাগিদ থেকেই গান লেখা। এখন গান ছাড়া নিজেকে ভাবতেই পারি না।

গানের শুরু গল্পটা কেমন?

প্রথম গান ১৯৯০ সালের ৪ আগস্ট বিটিভিতে প্রচার হয়েছিল। একটা গান ছিল ‘তুমি বিশ্বাসের পাহাড়ে ঝর্ণা কেটে গেছো চলে’ অন্যটা ‘নিন্দা করো যত আমায় মন্দ বলো না’। প্রথম গানটি গেয়েছিল রফিকুল আলম আর দ্বিতীয় সামিনা চৌধুরী।

২৯ জুলাই বিটিভির সুরকার শাহনেওয়াজ বললেন, আমার গানের রেকর্ডিং হবে। আগের দিন ঘুমাইনি। সকালে চলে গেছি তার বাসায়। এদিকে গান রেকর্ডিংয়ের দিনেই আমার মা মারা যান। আমি বাড়ি চলে যায়। এদিনটি আমার জন্য অনেক কষ্টের ছিল।

পরে ১৯৯৫-৯৬ সালে মোখলেসুল ইসলাম মিলু ভাই আমার লেখা গান দিয়ে প্রথম অ্যালবাম করলেন। অ্যালবামের নাম ছিল ‘নিও না আমার খবর’। সে সময় স্টুডিও চিনলাম। পরে মিশ্র অ্যালবাম ‘প্রেমের শরীর’ ও ‘কষ্ট’ বের হলো— এখানে কুমার বিশ্বজিৎ, রবি চৌধুরী, ডলি সায়ন্তনী, বারী সিদ্দিকী, আলম আরা মিনু, সামিনা চৌধুরী ও আঁখি আলমগীর গেয়েছেন। এই দুই অ্যালবাম প্রকাশ করার পর বেশ সাড়া পেয়ে যায়। রাস্তায় বের হলে অনেকেই কথা বলতে চাইত।

এরপর গান আমার আরাধনা হয়ে গেল। এরপর বারি সিদ্দীকীর অ্যালবাম ‘চন্দ্র সূর্য যত বড় আমার দুঃখ তার সমান’, আসিফের ‘অপরূপা তুমি অপরূপা’। সেই সময়ের সবাই মোটামুটি আমার লেখা গান গেয়েছে। সবশ্রেণীর শ্রোতারা নিয়েছে গানগুলো।

বর্তমান সময়ের গান নিয়ে ভাবনা কী আপনার?

যতই গান প্রকাশের মাধ্যম পরিবর্তন হোক— গান হচ্ছে এটাই বড় বিষয়। পৃথিবী যতদিন আছে ততদিন গানও থাকবে। ভালো গান হলেই সে গান টিকে থাকবে।

সবশেষে কি বলবেন?

এতকিছুর ভিড়ে সবচেয়ে বড় কথাটি হলো– ‘মৃত্যুই হচ্ছে চিরকাল।’

এএ/ডব্লিউএস

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad