সৃজনশীল মানুষ তো রাতারাতি তৈরি হয় না : বৃন্দাবন দাস

ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ১০ আষাঢ় ১৪২৫

সৃজনশীল মানুষ তো রাতারাতি তৈরি হয় না : বৃন্দাবন দাস

সীমান্ত বাঁধন চৌধুরী ১:২৪ অপরাহ্ণ, মার্চ ০৭, ২০১৮

print
সৃজনশীল মানুষ তো রাতারাতি তৈরি হয় না : বৃন্দাবন দাস

বৃন্দাবন দাস ছোটপর্দার জনপ্রিয় নাট্যকার। শুধু নাটক রচনার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, পাশাপাশি অভিনয়ও করেন। দেখা গেছে চলচ্চিত্রেও।

সহপাঠী বন্ধুর সাথে প্রতিযোগিতা করে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালে বৃন্দাবন দাস প্রথম উপন্যাস লেখেন। তবে নিয়মিত লেখালেখির সাথে জড়িত হন বাংলাদেশ মুক্ত নাট্যদলে থাকাকালে। ওই সংগঠনের উদ্যোগে প্রকাশিত স্মরণিকাতেও নিয়মিত লিখতেন।

১৯৯৪ সালের ১৯ জানুয়ারি বৃন্দাবন দাস ভালোবেসে বিয়ে করেন দর্শকনন্দিত টিভি অভিনেত্রী শাহনাজ খুশীকে। তাদের দুই সন্তান— দিব্য জ্যোতি ও সৌম্য জ্যোতি। তারাও অভিনয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সম্প্রতি পরিবর্তন ডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় অংশ নেন বৃন্দাবন দাস ও শাহনাজ খুশী—

দাদা কেমন আছেন?
বৃন্দাবন দাস : এই তো ভালো আছি।

ইদানিং কী পড়ছেন, কী লিখছেন?
বৃন্দাবন দাস : নতুন কিছু তো লিখতেই হচ্ছে। এখন আমার সিরিয়াল চলছে। অনএয়ার হচ্ছে একটা, প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে আরো দুটো। এই সিরিয়ালগুলো লিখছি। আমার যেহেতু পেশাটাই নাটক লেখা, সেহেতু নিয়মিত সিরিয়াল লিখতে হয়। আর কাজের চাপে পড়া কম হচ্ছে, তবে নতুন করে আবার পড়ছি নির্মলেন্দু গুণের ‘আমার ছেলেবেলা’।

আপনি তো মঞ্চের মানুষ ছিলেন?
বৃন্দাবন দাস : হ্যাঁ, আমি মঞ্চেরই মানুষ। আরণ্যকে কাজ করতাম। প্রাচ্যনাটের ফাউন্ডার মেম্বার ছিলাম।

মঞ্চ, টিভি ও চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন, কোন জায়গাটা স্বাচ্ছন্দ্যের?
বৃন্দাবন দাস : চলচ্চিত্র ওভাবে বলা যায় না, জাস্ট ‘আয়নাবাজি’তে কাজ করেছি। স্বাচ্ছন্দ্য যদি বলতেই হয় সেটা আসলে মঞ্চ। মঞ্চ ছাড়াও আমার একটা ভালো লাগার জায়গা ছিল, সেটা মুক্ত নাটক মঞ্চ আন্দোলন। রুট লেভেলের কৃষক-শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করতাম, ওটাই অন্যরকম প্রাণ পেতাম, আনন্দ পেতাম। আমার একসময় মনে হতো এই কাজটা করেই যদি সারাজীবন পার করা যেতো তবে ভালো হতো।

এরপর মঞ্চে আসা আর টিভি নাটক লেখা আমার নেশা ও পেশা। আসলে যে কাজটা ভালোবাসতাম তারই একটা ভিন্ন ফরমেট হলেও একটা সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং পেশা হিসাবে নিতে পেরেছি— এটাই আমার ভালো লাগার বিষয়।

এটা নেশা ও পেশা, যারা প্রতিষ্ঠিত তারা এটাকে পেশা হিসেবে নিতে পারেন, কিন্তু বেশিরভাগ শিল্পীর মূল্যায়ন ঠিকমতো হচ্ছে না, শিল্পীরা সম্মানী পাচ্ছে না যোগ্যতা অনুযায়ী।
বৃন্দাবন দাস : হ্যাঁ, এখন তো অনেক পেশাদার শিল্পী। তবে লেখাকে পেশা হিসাবে নেবার মানুষ কম। তবে কিছু নাট্যকার ও পরিচালক আছেন। বলতে হয়, সব বিষয়ের মতো এদিকটাও সম্প্রতি কিছুটা ঝুঁকির মধ্যে আছে। যেমন আমি একটা ভালো চাকরি করতাম, ওটা ছেড়ে দিয়ে লেখাকে পেশা হিসাবে নিয়েছি।

নতুন কেউ যদি এ পেশায় আসতে চায় আমি তাকে পাঁচবার ভাবতে বলবো। কারণ আমাদের কোনো কিছুই স্ট্যাবল না, অর্জনকে ধরে রাখতে আমরা ভীষণ অপক্ব, এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা।

প্রতিবন্ধকতা কোথায় কোথায়? নতুনদের সতর্ক করছেন কেন?
বৃন্দাবন দাস : কারণটা হচ্ছে, এখানে কোনো নীতিমালা নাই। নীতিমালা ছাড়া আমরা যে যার মতো করে চলছি। এভাবে তো হয় না, একটা ইন্ডাস্ট্রিতে শৃঙ্খলা ও নীতিমালা থাকা খুবই জরুরি।

শিল্পীরা প্রাপ্য সম্মানী পাচ্ছে না, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না, এটা কতটুকু সত্যি?
বৃন্দাবন দাস : কিছুটা ঠিক, আবার ঠিক না। ওই যে হতাশার কথা বললাম, ওর বাইরেও একটা দিক আছে। ভাবতে হবে এটাকে আসলে কারা পেশা হিসাবে নিতে চায়। এটা অন্য আর পাঁচটা পেশার মতো না। এটা সৃজনশীল পেশা, দেখতে হবে সেই মেধা তার মধ্যে আছে কি-না।

তাছাড়া যে এটার প্রতি নিবেদিত সে এটাকে পেশা হিসাবে নিক আর না নিক— লেগে থাকবেই। আর ঐ যে পেশা বা অর্থ ইনকামের বিষয়টা, সেখানে খুব কম মানুষই আসবে। ধরুন ক্রিকেট তো সবাই খেলে, কিন্তু সাকিব আল হাসান তো আর সবাই হয় না। এটা মাথায় রেখে তাকে এ উন্মাদনায় যোগ দিতে হবে। কিছু তো থাকতে হবে তার মধ্যে, ন্যাচারাল বলি আর গড গিফটেড বলি। তারপর এটাকে চর্চা করলে সে নাটককে পেশা হিসাবে নিতে পারবে, সাফল্যের মুখ দেখবে একসময়।

মঞ্চে শিল্পীরা আগের মতো সময় দিচ্ছে না, যে কারণে ভালো শিল্পী বেরিয়ে আসছে না, আপনি কি এ কথার সঙ্গে একমত?
বৃন্দাবন দাস : এখন মঞ্চের বিষয়ে মন্তব্য করার আর অধিকার রাখি না। কারণ আমি দীর্ঘদিন মঞ্চ থেকে দূরে, তবে একজন দর্শক হিসেবে, সাংস্কৃতিক কর্মী হিসাবে বলতে পারি, এখন মানুষের জীবন অনেক জটিল হয়ে গেছে। আমরা যে নিখাদ ভালোবাসা ও কমিটমেন্ট থেকে সবকিছু ফেলে মঞ্চের সাথে লেগেছিলাম, সে রকম লেগে থাকা মানুষ পাওয়া আর ঐভাবে নাট্যচর্চা করার আসলে সুযোগও নাই। মানুষের চাহিদা উত্তরোত্তর বাড়ছে। আমরা যখন থিয়েটার করতাম, পকেটে তিন টাকা পাঁচ টাকা নাও থাকতো, দিনের পর দিন রিহার্সালে হেঁটে যাওয়া-আসা করতাম।

কিন্তু এখনকার বাস্তবতা আলাদা। এখন তো কথা বলতে হলে মিনিমাম মোবাইলে টাকা ঢোকাতে হবে, সেই টাকাটা তো তাকে ইনকামের চিন্তা করতে হবে। সেই কারণে এখন মঞ্চের জন্য লেগে থাকা বা জীবন দিয়ে দেওয়ার মতো বাস্তব পরিস্থিতি আর নাই।

অনেকেই বলে থাকেন, বাংলাদেশের টিভি নাটকগুলো নিম্নমানের। সেই কারণে দর্শকের বড় অংশ ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের দিকে ঝুঁকছে। বিষয়টা কীভাবে দেখছেন?
বৃন্দাবন দাস : কথা হচ্ছে, গাছ কাটলে নিজের গায়ে পড়ে, ব্যাপারটা হয়ে গেছে ওই রকম। আমরা যে ভালো নেই সার্বিক অবস্থাটার রিফ্লেকশনই পর্দায় আসছে। একটা ভালো প্রোডাকশনের জন্য আনুষঙ্গিক যা যা দরকার সেই সুযোগ ততটা নাই আমাদের। চ্যানেলে ভালো প্রোডাকশন যত দরকার সে অনুয়ায়ী কোয়ালিটি ম্যানপাওয়ার তৈরি হয়নি বা সম্ভবও না।

সৃজনশীল মানুষ তো রাতারাতি তৈরি হয় না। একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসতে হয়। আর লেস কোয়ালিটির ফলে নানা হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হয়।

আপনার বিবেচনায় আপনার লেখা সেরা নাটক কোনটি?
বৃন্দাবন দাস : আমার লেখা সব নাটকই আমার কাছে সেরা, সন্তানের মতো। তবে প্রথম যে দুটি নাটক ‘বন্ধুবরেষু’ ও ‘সার্ভিস হোল্ডার’। ‘বন্ধুবরেষু’তে রাইটার হিসাবে পরিচিতি আসে। এটা আমার জন্য একটা বিশাল পাওয়া। তারপর ‘সার্ভিস হোল্ডার’ ও ‘হারকিপ্টা’।

তারপরও আমি বলছি না নাট্যজগতে আমি আহামরি কিছু করে ফেলেছি। আমার মনে হয় আমি এখনো ভালো কিছু করে উঠতে পারিনি।

নাটক নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?
বৃন্দাবন দাস : আগামীতে আরো ভালো কিছু করতে চাচ্ছি, যাতে দর্শকদের মনে দাগ কাটে। অনেকে বলে এখন ভালো পাণ্ডুলিপির ক্রাইসিস। আমাদের ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন নাট্যকার’ নামের একটা সংঘ রয়েছে, ওটার সহ-সভাপতি আমি। আমাদের ন্যূনতম যে অভিজ্ঞতা আছে তা দিয়ে তিন মাসের ওয়ার্কশপের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি।

কিছু নাটক আছে যা একেবারে সস্তা ও সুড়সুড়ি দিয়ে হাসানোর চেষ্টা করানো হয়।
বৃন্দাবন দাস : এগুলো কোনো নাটকই নয়, ভাঁড়ামো করা।

একজন নাট্যকার হিসেবে এসবের একটা বিহিত করা কি উচিত নয়?
বৃন্দাবন দাস : না, একজন নাট্যকার হিসেবে আমি তো আরেকজন নাট্যকারকে বলতে পারি না— আপনার লেখা ভালো না বা আপনার  নাটক লেখা হয় না। ওই আগাছা দূর করার দায়িত্ব চ্যানেলের। চ্যানেলগুলো যদি এসব প্রচার না করতো তাহলে সার ও পানির অভাবে আগাছা এমনিতেই মরে যেতো। সার ও পানি দেওয়ারও লোক আছে, আর এটাই হচ্ছে বাণিজ্য।

আর এই যে স্থুল ভাঁড়ামো করা, এসব নাট্যকারের পাশে যখন নাট্যসংঘে বসি, খুব অস্বস্তি বোধ করি এই ভেবে যে তারও একটা ভোট আমারও একটা ভোট।

নতুন অভিনয়শিল্পীদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
বৃন্দাবন দাস : পরামর্শ একটাই— হঠাৎ করে এসে জনপ্রিয় হওয়া যায় ঠিকই, এই জনপ্রিয়তাকে ধরে রাখতে দরকার অনুশীলন, অনুশীলন, অনুশীলন ও সুস্থ চর্চা। তবেই এটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, এর বিকল্প নেই।

সংসারে ‘সঙ’ সেজে থাকতে হয়, ‘সঙ ই সার’ বলা হয়ে থাকে, আপনাদরে সংসার কেমন চলছে?
বৃন্দাবন দাস : আমাদের সংসার ভালো চলছে, আমি মোটেও সঙ সেজে নেই, আমি নাট্যকার সেজে আছি।

(আড্ডার এ পর্যায়ে যোগ দিলেন শাহনাজ খুশী)

বৃন্দাবন দাস পকেটে ১৮ টাকা নিয়ে বিয়ে করার দুঃসাহস দেখিয়েছেন, শাহনাজ খুশী আপনিও চলে এলেন, কী করে ভরসা করলেন তাকে?
বৃন্দাবন দাস : ও তো জানতো না আমার পকেটে ১৮ টাকা ছিল।

শাহনাজ খুশী : একথা সত্যি, তবে আমার ওই ভরসার জায়গাটা আসলে ১৮ কোটি টাকার মতো ছিল। আমার মনে হয়েছে— ও যেখানে আছে সেখানে সব সমস্যার সমাধান।

বৃন্দাবন দাস : ওটা আসলে আবেগের কথা ছিল।

কী করে এমন দুঃসাহস দেখালেন ১৮ টাকা পকেটে নিয়ে।
বৃন্দাবন দাস : বিয়ে তো দুঃসাহসিক কাজ বটে, আর আমার বিয়েটা আরো দুঃসাহসিক। আসলে সত্যি কথা বলি, ওই বয়সটা আমাকে অতটা সাহসী করে তুলেছে। ভালোবাসা মানেই আবেগ, তখন একটা স্ট্রং আবেগ ছিল। আমাদের অনেক সাফার করতে হয়েছে, ভেবে-চিন্তে যখন একবার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছি তখন আর পিছপা হইনি।

শুনেছি বৃন্দাবন দাস আপনার বড় ভাইয়ের বন্ধু, আপনাদের সম্পর্ক জানাজানির পর ফ্যামিলি থেকে বিয়ের তাড়া ছিল। কোনো দিকে সাড়া না দিয়ে আপনি বৃন্দাবন দাসকে বেছে নিলেন, তার মধ্যে কী এমন দেখেছিলেন?
শাহনাজ খুশী : প্রথম প্রেমের ক্ষেত্রে যেটা হয়, একটা অশৌচ ভাব থাকে। এটা অনেকটা গঙ্গা জলের মতো, অন্য হাতে গেলে অপবিত্র হয়ে যাবে মনে হতো। এরকম একটা বিষয় ছিল যে, যে কেউ ছুঁয়ে দিলেই নষ্ট হয়ে যাবে। যে ভাবনাটা তাকে বিয়ে করা, আজ হলে হতো কি-না জানি না।

এখন হলে হয়তো বাস্তব অনেকটা চিন্তা করতাম। কিন্তু তখন এ পাত্রটা যেন কোনোভাবেই অশুচি না হয়ে যায় এটাই ছিল একমাত্র ভাবনা। এটা একটা পণ ছিল, আরেকটা ছিল ওর ম্যাচিওরিটি। আর বয়সের সঙ্গে আমার যে তফাৎ ছিল, মনে হতো ওর কাছে গেলে ও সব সামলে নেবে।

বৃন্দাবন দাস : আমি তো এখনো ওর বড় ভাইয়ের মতো। কিন্তু ঘটনা হয়েছে উল্টো।

শাহনাজ খুশী : দাদা ছোট বোনের ওপরই সব ছেড়ে দিয়েছে। (হাসি)

আপনাদের জীবনের গল্প শুনতে চাই, যা কাউকে বলেননি এমন অজানা কিছু।
শাহনাজ খুশী : আমাদের গল্প আসলে আমাদের দুজনেরই বলা হয়নি। খুব আবেগের একটা জায়গা শেয়ার করি পরিবর্তন ডটকমের মাধ্যমে পাঠকদের সঙ্গে। তখন সে ঢাকায় থাকতো, আর আমি এলাকায়। মনের আবেগ ঢেলে বিশাল বিশাল চিঠি লিখতাম। চিঠিতে কথা হতো, সপ্তাহে চার-পাঁচটা করে চিঠির পাহাড় হতো। ম্যারাডোনা খাতার পাতা ছিঁড়ে সেখানে সম্বোধন, আর নিচের পেজ ছিঁড়ে সমাপ্তি। তখন মনে হতো দুজন একসাথে হলে মনের সব কথা বলা হবে, তা আর হলো কই?

সংসার শুরু করার পর আরণ্যকের রিহার্সাল শেষ করে বাসায় ফিরে একরাশ ক্লান্তি নিয়ে দুজনেই ঘুমিয়ে যেতাম, জীবনের গল্প আর বলা হলো কই!

এসবিসি/ডব্লিউএস

 
.




আলোচিত সংবাদ