গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, লক্ষন, ঝুঁকি ও প্রতিরোধের উপায়

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭ | ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, লক্ষন, ঝুঁকি ও প্রতিরোধের উপায়

পরিবর্তন ডেস্ক ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৪, ২০১৭

print
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, লক্ষন, ঝুঁকি ও প্রতিরোধের উপায়

গর্ভাবস্থায় কিছু হরমোনের প্রভাবে ইনসুলিনের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ায় রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যদি গর্ভাবস্থায় প্রথমবারের মতো ডায়াবেটিস ধরা পড়ে, তাকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes Mellitus বা GDM) বলা হয়। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে মা ও শিশু দু’জনেরইে ঝুঁকি অনেক বৃদ্ধি পায়। তাই, গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন সঠিক সময়ে ডায়াবেটিস নির্ণয় ও এর নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।

.

প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল থেকে উৎপন্ন কর্টিসল, হিউম্যান প্লাসেন্টাল ল্যাকটোজেন, প্রজেস্টেরন, প্রোল্যাকটিন, এস্ট্রাডিওল ইত্যাদি হরমোন রক্তের ইনসুলিনকে তার কাজ করতে বাধা প্রদান করে এবং এর ফলে ইনসুলিন রক্তের গ্লুকোজকে শরীরের বিভিন্ন কোষে সঠিক পরিমানে স্থানান্তরিত করতে পারেনা অর্থাৎ, রক্তে গ্লুকোজের পরিমান বেড়ে যায়। সাধারণভাবে এটাই গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের মূল কারণ। এজন্যই গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে ইনসুলিন ইঞ্জেকশান দিতে হয়। 

সাধারণত গর্ভাবস্থায় তিন ধরনের ডায়াবেটিস হতে পারে। যেমন:

যাদের আগে থেকেই ডায়াবেটিস আছে এবং ইনসুলিন নির্ভর অর্থাৎ যাদের ইনসুলিন দিয়েই চিকিৎসা করতে হয়। এ ধরনের রোগীর শরীরের পেনক্রিয়েজ সাধারণত ইনসুলিন উৎপাদন করে না।

এ সকল রোগী সাধারণত মোটা প্রকৃতির হয়। এ ধরনের রোগীর শরীরে সাধারণত পেনক্রিয়েজের মাধ্যমে ইনসুলিন উৎপন্ন হয় কিন্তু রক্তে ইনসুলিনের চাহিদা সম্পূর্ণভাবে মেটাতে পারে না অর্থাৎ রোগীর রক্তে শর্করার আধিক্য থেকেই যায়। 

এ সকল রোগীর সাধারণত ডায়াবেটিস থাকে না হঠাৎ কিন্তু গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। এ অবস্থাকে গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস বা জেসটেশনাল ডায়াবেটিস বলা হয়। এটি সাধারনত সন্তান প্রসবের পর আর থাকে না। তবে পরবর্তীতে গর্ভধারণের সময় ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়। 

এছাড়াও গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীকে পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করতে হয়। কারণ, এ ধরনের রোগী যদি খাবার নিয়ন্ত্রণ না করে এবং জীবন-যাপনে কিছু পরিবর্তন না আনেন, তাহলে ভবিষ্যতে তার ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়। আবার এ ধরনের রোগীদের পরবর্তিতে টাইপ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল থেকে উৎপন্ন কিছু হরমোনের কারণে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস দেখা দেয়। 

ডায়াবেটিস শনাক্তকারী পরীক্ষা:

গর্ভকালীন সময়ে মায়ের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে তা গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes Mellitus/GDM) হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ, সকালে খালি পেটে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ৬.১ মিলিমোল/লিটার বা তার চেয়ে বেশি এবং ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খাওয়ার ২ ঘণ্টা পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ৭.৮ মিলিমোল/লিটার বা তার চেয়ে বেশি হলে তাকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হিসেবে সনাক্ত করতে হবে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় Oral Glucose Tolerance Test বা OGTT। 

আরো একটি পরীক্ষা পদ্ধতি হচ্ছে Glucose Challenge Test বা GCT। দিনের যেকোনো সময় ৫০ গ্রাম গ্লুকোজ খাওয়ার ১ ঘণ্টা পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ৭.৮ মিলিমোল/লিটার বা তার চেয়ে বেশি হলে তাকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হিসেবে ধরে নিতে হবে। GCT পজিটিভ হলে অবশ্যই OGTT পরীক্ষা করাতে হবে। গড়ে সাধারণত ৪% গর্ভবতী মায়েরা গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। 

গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে ডায়াবেটিস শনাক্তকারী পরীক্ষা ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট বা OGTT করে ডায়াবেটিস আছে কিনা তা শনাক্ত করতে হবে। এই পরীক্ষার ফলাফল স্বাভাবিক থাকলেও পরবর্তীতে গর্ভকালীন ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহের মধ্যে আবার একই পরীক্ষা করে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের উপস্থিতি আছে কিনা তা নিশ্চিত হতে হবে। 

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের লক্ষন:

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে তেমন নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ নেই তবে

কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঝাপসা দৃষ্টি,

ঘন ঘন মুত্রথলি, যোনিপথ ও চামড়ার সংক্রমণ,

অতিরিক্ত ক্লান্তি,

অতিরিক্ত পানির তৃষ্ণা,

ঘন ঘন মূত্রত্যাগ,

বমি বমি ভাব অথবা বমি ইত্যাদি।

আবার ক্ষুধা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও ওজন কমে গেলে এটিও গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার একটি লক্ষণ । 

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস এর ঝুঁকি যাদের বেশি:

পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের ডায়াবেটিস থাকলে।

শরিরের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে।

যাদের বয়স ২৫ বছর এর বেশি।

পূর্বে কখনো গর্ভপাত অথবা গর্ভস্থ শিশুর মৃত্যু হলে।

বারবার যোনিপথে ছত্রাকের সংক্রমণ হলে।

গর্ভ থলিতে পানির পরিমাণ বেশি থাকলে।

পূর্বে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থাকলে অথবা বেশি ওজনের শিশু প্রসব করলে।

স্থান ভেদে কিছু কিছু অঞ্চলের মানুষের বেশি হতে পারে যেমন- পূর্ব এশিয়া অথবা আফ্রিকা অঞ্চল।

উপরোক্ত যেকোনো এক বা একাধিক ঝুঁকি থাকলে অবশ্যই গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস আছে কিনা তা শনাক্তকরণের জন্য পরীক্ষা করতে হবে। 

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে মা ও সন্তানের যে ধরনের জটিলতা হতে পারে:

মায়ের ক্ষেত্রে, গর্ভাবস্থায় রক্ত চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে,

গর্ভ থলিতে পানির পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে,

নির্দিষ্ট সময়ের আগেই লেবারে চলে যেতে পারে,

প্রস্রাবের রাস্তায় ইনফেকশন হতে পারে আবার বাচ্চা নষ্টও হতে পারে।

প্রসবে দেরী হতে পারে,

প্রসবের সময় মাথা বের হলেও কাঁধ আটকে যেতে পারে ইত্যাদি।

প্রসব পরবর্তী সময়ে দুধ আসতে দেরী হতে পারে,

রক্তপাত হতে পারে আবার ইনফেকশনও হতে পারে।

বাচ্চার ক্ষেত্রে, মাথা বড় হতে পারে, কিছু কিছু জন্মগত ত্রুটি দেখা যেতে পারে। 

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের চিকিসা:

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের চিকিৎসার জন্য শুধুমাত্র ইনসুলিন ইঞ্জেকশান ব্যাবহার করতে হবে।

ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় মুখে খাওয়ার ঔষধ ব্যবহার না করাই ভালো।

যাদের গর্ভসঞ্চারের আগে থেকেই ডায়াবেটিস আছে এবং মুখে খাওয়ার ঔষধ ব্যবহার করেন। তাদের ক্ষেত্রে, গর্ভসঞ্চার হয়েছে বোঝার সাথে সাথেই মুখে খাওয়ার ঔষধ বন্ধ করে ইনসুলিন ব্যাবহার শুরু করতে হবে। 

অনেক মহিলার ক্ষেত্রে কোনো ঔষধের প্রয়োজন হয় না। শুধুমাত্র খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং মাঝারি ধরণের শারীরিক ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরকে সুস্থ্য রাখা সম্ভব। 

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মূল বিষয়গুলো হলো সঠিকভাবে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, পরিমিত হাল্কা ব্যায়াম, নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর ডায়াবেটিসের মাত্রা নিরূপণ, নিয়মিত গাইনি অথবা ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ। 

গর্ভাবস্থায় সকলেরই সঠিক পরিমাণে ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করা উচিত। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে রোগীকে অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট খাদ্য তালিকা মেনে চলতে হবে। সাধারণভাবে খাদ্যতালিকায় দৈনিক শতকরা ৪০ ভাগ আমিষ, ৪০ভাগ শর্করা ও ২০ ভাগ চর্বি জাতীয় খাদ্য বা ফ্যাট থাকতে পারে। 

ডেলিভারীর সময় সতর্কতা:

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রেও কিন্তু স্বাভাবিক ডেলিভারী হতে কোনো বাধা নেই। যদি মায়ের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-এক্লাম্পশিয়া, দীর্ঘস্থায়ী কোনো জটিলতা থাকে, বেশি ওজনের বাচ্চা অথবা গর্ভস্থ ভ্রূণের বৃদ্ধি কম হয়, এসকল ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিস্ট সময়ের পূর্বেই (১-২ সপ্তাহ) নরমাল অথবা সিজারের মাধ্যমে ডেলিভারি করে ফেলা উচিৎ। ডেলিভারির সময় অবশ্যই মায়ের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ৪.৫-৫ মিলিমোল/লিটার রাখতে হবে। 

বাচ্চা জন্মের কিছুক্ষণের মধ্যেই বাচ্চার পায়ের গোড়ালি থেকে রক্ত নিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে হবে বাচ্চার গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক আছে কিনা। যদি গ্লুকোজের মাত্রা ২.২ মিলিমোল/লিটার এর নিচে নেমে যায় তাহলে দ্রুত বাচ্চাকে আইসিইউতে ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করতে হবে। 

প্রসব পরবর্তী চিকিসা

বেশির ভাগ সময়েই প্রসবের পর ইনসুলিনের প্রয়োজনীয়তা কমে যায়। এজন্য প্রসবের পরই মায়ের রক্তের সুগার পরীক্ষা করে দেখতে হবে ইনসুলিন দিতে হবে কিনা। এসময় রক্তে সুগারের পরিমান স্বাভাবিক মাত্রায় থাকলে ইনসুলিন বন্ধ করে দিতে হবে। প্রসব পরবর্তী ৬ থেকে ১২ সপ্তাহে আবার ডায়াবেটিস শনাক্তকারী পরীক্ষা করে মা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কিনা তা নিশ্চিত হতে হবে। একবার গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হলে পরবর্তীতে ডায়াবেটিস হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে তাই সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়াম করার মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ভবিষ্যত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা কমে যায়। 

তথ্য সূত্র: এমসিডিসি 

ইসি/

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad