যবিপ্রবি’র ‘বিষফোঁড়া’ ছাত্রলীগ

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৭ | ৯ কার্তিক ১৪২৪

যবিপ্রবি’র ‘বিষফোঁড়া’ ছাত্রলীগ

যশোর প্রতিনিধি ১:০৬ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ০৯, ২০১৭

print
যবিপ্রবি’র ‘বিষফোঁড়া’ ছাত্রলীগ

২০১৪ সালের মে মাস। নিষিদ্ধ ক্যাম্পাসে ‘জোরপূর্বক’ রাজনীতি শুরু করে ছাত্রলীগ। যাত্রার দুই মাসের মাথায় ছাত্রলীগ কর্মী নাইমুল ইসলাম রিয়াদ হত্যা হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা হন প্রধান আসামি। জেলও খাটেন। ব্যাপক সমালোচিত হয় ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড। সেই ধারাবাহিকতায় গত সাড়ে তিন বছরে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) ক্যাম্পাসে নানা অঘটনের জন্ম দিয়েছে ছাত্রলীগ। সর্বশেষ গত ৫ অক্টোবর শহীদ মশিয়ুর রহমান হলে তাণ্ডবের ঘটনা ঘটেছে। প্রায় ৪১ লাখ টাকার মালামাল লুট ও ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ সাত নেতা সাময়িক বহিষ্কার হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইনে মামলাও করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সেকারণে সাধারণ মানুষের মাঝে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, তাহলে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছে ছাত্রলীগ?

জানাযায়, ২০১৪ সালের ১৬ মে সুব্রত বিশ্বাসকে সভাপতি ও শামীম হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর ৩০ মে ক্যাম্পাসে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে ছাত্রলীগ। যদিও তখন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ ছিল। তারপরও সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠনটি প্রকাশ্যে ক্যাম্পাসে কার্যক্রম শুরু করে। শুরুতে বির্তকের জন্ম দেয় সংগঠনটি। ২০১৪ সালের ১৪ জুলাই ছাত্রলীগ কর্মী নাইমুল ইসলাম রিয়াদ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এই মামলায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সুব্রত বিশ্বাস, সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসান, জেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বিপুল, বর্তমান জেলা ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি রওশন ইকবাল শাহী, বতর্মান সাধারণ সম্পাদক ছালছাবিল ইসলাম জিসানসহ অনেকে আসামি হন। এই মামলায় সুব্রত ও শামীম জেলও খেটেছেন। সর্বশেষ ওই মামলায় একাধিক ছাত্রলীগ নেতা অভিযুক্ত হয়েছেন। মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ ঘটনার পর ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের রাজত্ব শুরু হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে ক্যাম্পাসে নানা অপকর্ম চালাতে শুরু করে ছাত্রলীগ। শহীদ মশিয়ুর রহমান হল ও শেখ হাসিনা হল ঘিরে গড়ে ওঠে শিক্ষার্থী নির্যাতনের টর্চার সেল।

সর্বশেষ গত ১৬ মে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। ওইদিন রাতে সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসান গ্রুপের সদস্যদের হল থেকে বের করে দেয় সভাপতি সুব্রত বিশ্বাস গ্রুপের লোকজন। হঠাৎ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের দা-কুমড়ো সম্পর্কের নেপথ্যে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় লবিং বদলকে দায়ী করছেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও নেতাকর্মীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সুব্রত বিশ্বাস ও শামীম হাসান ছিলেন একই গ্রুপের অনুসারী। যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ ও বর্তমান সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন তারা। চলতি বছরের প্রথম দিকে শামীম হাসান কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় লবিং পরিবর্তন করেন। তিনি স্থানীয় এমপি কাজী নাবিল আহমেদ ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইনের অনুসারী হন। গ্রুপ পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এরপর সভাপতি সুব্রত বিশ্বাস ও তার অনুসারীরা পুরো ক্যাম্পাস দখরের চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে চলতি বছরের মে মাসে তারা হল থেকে শামীম হাসানসহ তার অনুসারীদের বিতাড়িত করেন। পুরো হল দখলে নেন সভাপতি অনুসারীরা। পুরো ক্যাম্পাসে সুব্রত বিশ্বাসের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৫ অক্টোবর) রাতে শামীম হাসানের নেতৃত্বে শহীদ মশিয়ুর রহমান হলে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের হামলায় সভাপতি সুব্রত বিশ্বাস গ্রুপের অন্তত ৩০জন শিক্ষার্থী আহত হন।

এঘটনায় ৭ অক্টোবর রাতে যশোর কোতয়ালি মডেল থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। যার নম্বর ৩৯। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী আহসান হাবীব। মামলার এজারে, উল্লেখ করা হয়েছে গত ৫ অক্টোবর শহীদ মশিয়ুর রহমান হলে হামলায় ত্রিশ লাখ টাকার ল্যাপটপ, মোবাইল, আইফোন, হাতঘড়ি, এক লাখ বিশ হাজার টাকা নগদ লুট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দশ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। সবমিলিয়ে ওই দিনের হামলায় একচল্লিশ লাখ বিশ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

মামলার আসামিরা হলেন- বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার মাসকাটা গ্রামের এমএম মোহর আলীর ছেলে এসএম শামীম হাসান, মশিয়ুর রহমান হল ছাত্রলীগের সভাপতি ও বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার পিলজংগ গ্রামের কার্ত্তিক চন্দ্র দে’র ছেলে বিপ্লব কুমার দে, যবিপ্রবি পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ও বাগেরহাট সদর উপজেলার হাকিমপুর গ্রামের শেখ আলতাফ হোসেনের ছেলে তানভীর ফয়সাল, যবিপ্রবি ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক ও ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার বধুপুর গ্রামের মুন্সী গোলাম মোস্তফার ছেলে আল মামুন সিমন, যবিপ্রবি ছাত্রলীগের ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকার আশুলিয়া এলাকার ধলপুর গ্রামের আবদুল মান্নানের ছেলে মাসুদুর রহমান রনি, শহীদ মশিয়ুর রহমান হল ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার রামনগর গ্রামের হারুন অর রশিদের ছেলে তানভীর আহমেদ তানিন এবং যবিপ্রবি পেট্রোলিয়াম এন্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার সাচিবুনিয়া গ্রামের শহিদ খন্দকারের ছেলে আশিক খন্দকার। এছাড়াও ৩০-৪০জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসান বলেন, ছাত্রলীগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ছাত্রলীগ সব সময় ক্যাম্পাসে সুষ্ঠ পরিবেশ বজায় রেখেছে। শুধুমাত্র স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সুব্রত বিশ্বাস বলেন, ছাত্রলীগের কারণে কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নষ্ট হয়নি। কতিপয় সুবিধাবাদীর ডাকাতির কারণে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়েছিল। বর্তমানে সেই পরিবেশ নেই। ভবিষতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নষ্ট হতে দেবো না।

আইআর/এএস

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad