রাবি উপাচার্যের সন্দেহজনক উদারতা

ঢাকা, শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ | ৯ আষাঢ় ১৪২৫

রাবি উপাচার্যের সন্দেহজনক উদারতা

জাকির হোসেন তমাল ২:০১ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৮

print
রাবি উপাচার্যের সন্দেহজনক উদারতা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) এখন বাজেট ঘাটতি রয়েছে ২৬ কোটি টাকা। শিক্ষকদের বসার জায়গার সংকট, শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ, বইপত্র, আবাসন ও পরিবহন সংকট চরমে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা ভালোভাবে দেখছেন না শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

 

জানা যায়, গত সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স কমিটি ও ৪৭৬তম সিন্ডিকেট সভায় ৪১ লাখ টাকা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের থেকে পাওয়া অর্থ থেকেই ওই ৪১ লাখ টাকা দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একদিনের বেতন থেকে ৯ লাখ টাকা ওই খাতে দেওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর হাতে ওই টাকা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান।

প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অর্থ দেওয়ার উদ্যোগ সাধুবাদযোগ্য হলেও এর উদ্দেশ্য নিয়ে খোলা কাগজের এই প্রতিবেদকের কাছে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

হঠাৎ করে এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ত্রাণ তহবিলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা বলেন, ‘হঠাৎ করে না, এটা অনেক আগেকার সিদ্ধান্ত। কিন্তু দিতে দেরি হয়ে গেছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, ‘অনুদান দেওয়া খারাপ কিছু নয়। কিন্তু যখন ত্রাণের দরকার সেই সময় না দিয়ে অন্য সময় দিতে গেলে তো প্রশ্ন উঠতেই পারে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখন বর্ষার নাকি শীতের ত্রাণের টাকা দিতে চাইছে সেটা পরিষ্কার নয়।’

মো. সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি, বন্যার সময় শিক্ষকরা নিজেদের বেতন থেকে কিছু টাকা দিতে সম্মত হয়েছিলেন। পরে তারা কাগজে স্বাক্ষরও করেছিলেন। কিন্তু সময়মতো ত্রাণের টাকা না দিয়ে এখন দেওয়ার কী মানে আছে। এ সময়ে ত্রাণ দেওয়াটা আমার কাছে যৌক্তিক মনে হচ্ছে না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও রাষ্ট্রপতিকে না জানিয়ে অধ্যাপক আবদুস সোবহান উপাচার্য পদটি ফাঁকা করে বিভাগে যোগদান করেছিলেন। পরে উপাচার্য তার পেনশন ভাতার ৮০ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬৯ টাকা সোনালী ব্যাংকের রাবি শাখার একটি হিসাব নম্বর (এ/সি ৪৬১৩৬৩৬০০০০২২) থেকে উত্তোলন করে নিয়েছেন, যার চেক নম্বর হলো, সিবি ১০০৮২৩৭০৬৬। বিষয়টি পত্রিকায় প্রকাশের পর বেশ সমস্যায় পড়েছেন উপাচার্য। তাই নিজেকে ভালো বলে জাহির করতেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিলের টাকা ত্রাণ তহবিলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত চার বছরে ভর্তি পরীক্ষা থেকে আয় করা ১৫ কোটি টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করা হয়েছে। ওই টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সম্পদ। শিক্ষার্থীদের থেকে পাওয়া টাকা এর আগে এভাবে অনুদান হিসেবে দেওয়ার নজির নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যদের সঙ্গে বসবেন। সেই সুযোগে প্রধানমন্ত্রীর একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার চেষ্টা করছেন উপাচার্য এম আবদুস সোবহান। ওইদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ও উপাচার্য গিয়ে ওই টাকাটা (৫০ লাখ) দিয়ে আসবেন।’

শিক্ষকরা বলছেন, বর্তমান প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা চলার কারণে দুপুরে অনেক শিক্ষককে ক্যাম্পাসে খেতে হয়। কিন্তু শিক্ষকদের খাওয়ার জন্য তেমন কোনো ভালো জায়গা নেই। শিক্ষক লাউঞ্জে বসার মতো ভালো ব্যবস্থা নেই, এসি নেই, বিভাগে শিক্ষকদের আলাদাভাবে বসার কক্ষ নেই, নতুন বিভাগের পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ ও বইপত্র নেই। এমন পরিস্থিতিতে এভাবে হঠাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিলের টাকা ত্রাণ তহবিলে দান করা মোটেও ঠিক হচ্ছে না।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান আসিফ বলেন, ‘যেভাবেই ওই টাকা উপার্জন হোক না কেন সেটা শিক্ষার্থীদের। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের যেসব অধিকার আছে, তা প্রশাসন পূরণ করতে পারে না। যেমন গবেষণা খাতে তেমন কোনো ভর্তুকি নেই, আমাদের বইপত্রের স্বল্পতা, শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা প্রকট, এ ছাড়া যাতায়াতের জন্য পরিবহন সংকটও চরমে। এমন পরিস্থিতিতে এভাবে শিক্ষার্থীদের টাকা রাষ্ট্রের ত্রাণ তহবিলে দেওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। যদি দেশ দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় থাকত তাহলে ভেবে দেখা যেত। কিন্তু দেশে তো এখন তেমন কোনো দুর্যোগ নেই। তাহলে কেন সেই টাকা দেওয়া হচ্ছে?

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি ও প্রগতিশীল ছাত্রজোটের সমন্বয়ক তাসবির-উল-ইসলাম কিঞ্জল বলেন, ‘এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা স্বেচ্ছাচারীভাবে কাউকে দেওয়া ঠিক না। যেহেতু এটি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তাই এখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনুমতি ছাড়া এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রচণ্ড নিন্দনীয়। ছাত্র ফেডারেশনের পক্ষ থেকে সিন্ডিকেটের এমন সিদ্ধান্তকে ধিক্কার জানাই।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স কমিটির সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক একেএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষকদের বেতন থেকে ৯ লাখ টাকা ও ভর্তি পরীক্ষা থেকে আয় করা অর্থের মধ্যে ৪১ লাখ মিলে মোট ৫০ লাখ টাকা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে কোনো চিঠি পাওয়ার পর এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে কোষাধ্যক্ষ বলেন, ‘না, চিঠি বোধহয় অনেক আগে একটা পাঠিয়েছিল, আমি সেটা সঠিক জানি না। তবে খুব শিগগিরই দেব বলেই ফিন্যান্স কমিটিতে সেটি তোলা হয়েছিল।’

তাহলে কিসের ভিত্তিতে এ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, উত্তরে কোষাধ্যক্ষ বলেন, ‘এটা আমি সঠিক জানি না। সিদ্ধান্ত তো এমনিও নেওয়া হয়। ত্রাণ তহবিলে যেমন আমাদের বন্যার সময়, কিংবা রোহিঙ্গারা এসেছে বা অনেক সময়, ত্রাণ তহবিল তো একটা চলমান প্রক্রিয়া।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিজেকে বাঁচাতে এভাবে টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিনা, জবাবে কোষাধ্যক্ষ বলেন, ‘না, এ তথ্য সঠিক নয়।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিন্ডিকেট সদস্য বলেন, ‘ফিন্যান্স কমিটিতে পাস হওয়ার পরে তা সিন্ডিকেটে পাস হয়েছে। ফিন্যান্স কমিটিতে পাস হয়ে আসলে সিন্ডিকেটে সেটি আটকায় না। কারণ, ফিন্যান্স কমিটিতে অনেক সিনিয়র লোকজন থাকে।’

এসব বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এম আবদুস সোবহানকে ফোন করা হলে তিনি কথা বলতে পারবেন না বলে জানিয়ে দেন।

এএস

 
.




আলোচিত সংবাদ