ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ কি আসন্ন?

ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ মে ২০১৮ | ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫

ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ কি আসন্ন?

রওশন প্রধান ৪:৩৮ অপরাহ্ণ, মে ০২, ২০১৮

print
ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ কি আসন্ন?

সিরিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর হামার একটি ঘাঁটিতে রোববার বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে অন্তত দুই ডজন ইরানি সেনা নিহত হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে অনেক যুদ্ধাস্ত্র। এ ঘটনার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ফলে সর্বশেষ অবস্থা দেখে মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইসরাইল ও ইরান এখন যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।

এক মার্কিন কর্মকর্তা এনবিসি নিউজকে বলেছেন, ‘বর্তমান বিশ্বে যেসব বিরাজমান শত্রুতা রয়েছে, এই মুহূর্তে সিরিয়ায় ইসরাইল ও ইরানের মধ্যকার শত্রুতা তার শীর্ষে রয়েছে।’

তিন মার্কিন কর্মকর্তা বলছেন, হামার ওই ঘাঁটিতে ইরান যুদ্ধাস্ত্র মজুদের পরই রোববার ইসরাইলি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ওই হামলা চালায়। ওই ঘাঁটিতে রয়েছে ইরানের ৪৭তম ব্রিগেড, সেইসঙ্গে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রসহ অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র। হামলায় দুই ডজন ইরানি সেনা নিহত ছাড়াও তিন ডজন আহত হয়।

ওই মার্কিন কর্মকর্তারা (নাম উল্লেখ করা হয়নি) বলছেন, সিরিয়ায় ইরানি প্রভাব বৃদ্ধি ইসরাইলকে সতর্ক হতে বাধ্য করেছে। সিরিয়ায় দেশটির সরকারের পক্ষে রাশিয়া যখন বিমান হামলা চালাচ্ছে, তখন ইরানি সেনারা স্থলযুদ্ধ করছে। সিরিয়ার নিজস্ব ও রাশিয়ার সব ঘাঁটিতেই ইরানি সেনার উপস্থিতি রয়েছে।

গত দুই সপ্তাহে সিরিয়ায় ইরানি সামরিক ফ্লাইটের সংখ্যা বেড়েছে। তার মানে, তেহরান দেশটিতে অতিরিক্ত যুদ্ধাস্ত্র যেমন- ছোট অস্ত্র, গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করছে। দুই মার্কিন কর্মকর্তা মনে করছেন, ইসরাইলে হামলার অংশ হিসেবেই সিরিয়ায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে ইরান। কয়েক বছর ধরেই ওয়াশিংটন লক্ষ করছে, সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পক্ষে যুদ্ধরত হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে তেহরান। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইরান হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের আরও যুদ্ধাস্ত্র ও লজিস্টিক্যাল সাপোর্ট দিচ্ছে।

ওই তিন মার্কিন কর্মকর্তা মনে করছেন, ইসরাইল এখন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ও সহযোগিতা (হেল্প অ্যান্ড সাপোর্ট) চাচ্ছে।

মঙ্গলবার ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সিএনএনকে বলেছেন, ‘কেউই’ যুদ্ধ চায় না, কিন্তু ইরান যেহেতু আগ্রাসী সেহেতু ইসরাইলের একটি পদক্ষেপ থাকতে হবে।

তিনি বলেন, ‘সেটি হলো যুদ্ধ প্রতিরোধের উপায়।’

এদিন ইরানের সঙ্গে বিশ্বের ছয় জাতি ও সংস্থার করা পরমাণু চুক্তি নিয়েও কথা বলেন নেতানিয়াহু। তিনি অভিযোগ করেন, ইরান বিশ্বকে ধোকা দিয়ে পরমাণু অস্ত্র সমৃদ্ধ করছে। তেহরান সে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তেলআবিব বিশ্বকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।

এর আগে সোমবার মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস বলেছেন, গত সপ্তাহে পেন্টাগনে ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাভিগডর লিবারম্যানের সাথে সিরিয়ায় ইরানের অবস্থান ও কার্যক্রম নিয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, ইসরাইলিরা মনে করছে, ইরান ও তার প্রক্সি বাহিনী (হিজবুল্লাহ) তাদের ওপর হামলা করতে পারে।

ম্যাটিস বলেন, ‘ইরান ও তার প্রক্সি বাহিনী ইসরাইলি সীমান্তের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করছে, আমি বোঝাতে চাচ্ছি, একেবারে কাছাকাছি চলে গেছে এবং আপনারা দেখবেন তেলআবিব এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।’

ইসরাইলি বাহিনী স্বীকার করেছে যে, ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত শতাধিক বার তারা সিরিয়ায় হামলা চালিয়েছে।

দুই মার্কিন কর্মকর্তা বলছেন, তিন সপ্তাহ আগে ইসরাইল সিরিয়ার হোমস প্রদেশে বাশার সরকারের একটি ঘাঁটিতে কয়েক দফা হামলা চালিয়েছে। তিয়াস নামের ওই সামরিক ঘাঁটিতে, টি-৪ বিমানঘাঁটি নামেও পরিচিত, ইরানের ড্রোন ও যুদ্ধাস্ত্র ছিল।

এই প্রথম সিরিয়ায় ইরানের বিরুদ্ধে এতটা আগ্রাসী হয়নি ইসরাইল। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলেও এ ধরনের হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। ওবামা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলছেন, যদিও হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি, তবুও কিছু সতর্কতামূলক নোট পাঠানো হতো। আর ইসরাইল এখন ঘোষণা দিয়ে হামলা করছে বলে উল্লেখ করেন সাবেক ওই কর্মকর্তা।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত সপ্তাহজুড়ে ইসরাইলের কর্মকর্তারা মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ওই অঞ্চলে (মধ্যপ্রাচ্যে) এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে সিরিয়ায় ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে মার্কিন গোয়েন্দা ও অন্যান্য সাহায্য চাওয়া হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, জেনারেল জোসেপ ভোটেল ২০১৬ সালে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো গত মঙ্গলবার ইসরাইল সফর করেছেন। ইসরাইলে ভোটেলের কোনো দায়-দায়িত্ব নেই, বরং এটি মার্কিন ইউরোপিয়ান কমান্ডের অধীন। যাই হোক, সফরে ভোটেল ইসরাইলের সেনাপ্রধান ল্যাফটেন্যান্ট জেনারেল গাদি এইজেনকটের সঙ্গে দেখা করেন এবং সিরিয়ায় ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করেন। সফরে ভোটেল সিরিয়ার মধ্যাঞ্চল তথা ইউফ্রেটিস নদীর উপত্যকা পরিদর্শন করেন এবং মার্কিন সেনা ও অংশীদারদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন।

গত সপ্তাহে পেন্টাগনে ম্যাটিস ও লিবারম্যানের মধ্যে যখন বৈঠক হয় তার আগে সাংবাদিকরা মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ইরান সিরিয়ায় যে অস্ত্র মজুদ করছে তা কি ইসরাইলের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য?

এর জবাবে ম্যাটিস বলেন, ‘আমার মনে হয় না, এই মুহূর্তে তাদের অন্যকোনো উদ্দেশ্য আছে।’

তিনি বলেন, সিরিয়ায় মার্কিন মিশন অব্যাহত রাখার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আইএসকে পরাজিত করা। সিরিয়া সরকার কিংবা তাদের প্রক্সি বাহিনীকে টার্গেট করা মার্কিন মিশনের উদ্দেশ্য নয়।
এদিকে, ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর সাবেক প্রধান আমোস ইয়াদলিন গার্ডিয়ানকে বলেছেন, ‘সিরিয়ায় পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার অবস্থা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি।’

‘ইরান যে বিষয়টি বুঝতে পারছে এবং তাদের পক্ষ থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে,’ বলেন তিনি।

অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ বলেছেন, ‘টি-৪ বিমানবন্দরে হামলা ‘ঐতিহাসিক ভুল’ এবং এর মাধ্যমে ইসরাইল ইরানের সঙ্গে ‘সরাসরি আক্রমণের’ অবস্থা তৈরি করেছে।’

ইরানের অন্যতম এ মিত্র বলেন, ‘বিগত সাত বছরের (সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ) মধ্যে এটি নজিরবিহীন ঘটনা যে, ইসরাইল সরাসরি ইরানের রিভ্যলুশনারি গার্ডকে (ইরানি সেনাবাহিনীর বিশেষ শাখা) টার্গেট করেছে।’

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রতিনিধি আলি শিরাজি ইসরাইলের ওই হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। দেশটির আধা-সরকারি গণমাধ্যম ফার্স নিউজকে তিনি বলেন, ‘ইসরাইলকে ধ্বংস করে দিতে পারে ইরান।’

তবে আটলান্টিক কাউন্সিলের গবেষক আলি আলফোনেহ, যিনি সিরিয়ায় ইরানের উপস্থিতি নিয়ে কাজ করেন, বলছেন, ‘শুরু থেকেই সিরিয়ায় ইরানের লক্ষ্য ছিল সীমিত। আর তা হলো- আসাদকে ক্ষমতায় রাখা এবং তেহরান থেকে লেবানন পর্যন্ত যে স্থল করিডোর তা নিরাপদ রাখা।’

‘এই উদ্দেশ্য যখন অর্জিত হয়েছে তখন ইরানের লক্ষ্য হলো ইসরাইলের সঙ্গে সীমিত পরিসরে দ্বন্দ্ব লাগিয়ে রাখা। আর এর উদ্দেশ্য হলো- ইসরাইলকে ব্যস্ত রাখা এবং ব্যয় বাড়ানো যাতে ভবিষ্যতে তেহরানের বিরুদ্ধে লাগতে তেলআবিবের ভাবতে হয়,’ বলেন এই গবেষক।

আরপি

 
.

Best Electronics Products



আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad