কয়েক লাখ মুসলমানকে বিতাড়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে আসাম

ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ১০ আষাঢ় ১৪২৫

কয়েক লাখ মুসলমানকে বিতাড়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে আসাম

পরিবর্তন ডেস্ক ৪:৪৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৮

print
কয়েক লাখ মুসলমানকে বিতাড়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে আসাম

দুই বছর আগে নাগরিকত্ব শনাক্তকরণের একটি কার্যক্রম হাতে নিয়েছে আসাম সরকার। এর উদ্দেশ্য হলো, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের পর থেকে যারা সেখানে অবস্থান করছে তাদের উচ্ছেদ করা। ইতোমধ্যে খসড়া তালিকা প্রকাশও করেছে আসাম সরকার। তাতে দেখা যাচ্ছে, কয়েক লাখ মুসলিম সেখান থেকে বিতাড়নের শিকার হবেন। এ নিয়ে সেখানকার মুসলিমদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও আতঙ্ক কাজ করছে। যারা নাগরিকত্ব পাবে না, তাদের বাংলাদেশ গ্রহণ না করলে বন্দিশালায় রাখা হবে। এ উদ্দেশ্যে বন্দিশালাও নির্মাণ করছে আসাম সরকার। আর বন্দিশালায় যারা থাকবে তাদের কোনো মর্যাদা থাকবে না, জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী তারা শুধু অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের সুযোগ পাবে তারা।

বিট্রিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ নিয়ে সোমবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। পরিবর্তন ডটকমের পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটি ভাষান্তর করেছেন রওশন প্রধান।

নতুন বছরের (২০১৮) ঠিক আগের দিন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আসাম রাজ্যের সরকার ১৯ লাখ মানুষের একটি তালিকা (নাগরিকত্বের তালিকা) প্রকাশ করে। কিন্তু সেখানে হানিফ খানের নাম ছিল না।

পরের দিন খুব সকালে পুলিশ কাছাড় জেলার বাসিন্দা ট্যাক্সিচালক হানিফ খানের লাশ উদ্ধার করে, মনে করা হয়, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তার স্ত্রী রুশকা বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, তালিকায় নাম না থাকার কারণে সে আত্মহত্যা করেছে।’

এর দুই বছর আগে বাংলাদেশ ও ভুটানের সীমান্তবর্তী আসাম সরকার একটি শনাক্তকরণ কর্মসূচি চালু করে। এর উদ্দেশ্যে হলো, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের আগে কারা আসামের বাসিন্দা ছিল তা শনাক্ত করা এবং যারা এর মধ্যে পড়বে না তাদের উচ্ছেদ করা।

গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর অসম্পন্ন যে খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়, তাতে ১৪ লাখ লোকের নাম বাদ পড়ে, যারা আসামেই বসবাস করে আসছে। সে সময় কর্মকর্তারা বলেন, চূড়ান্ত তালিকায় আরো কয়েক লাখ লোকের নাম অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু ওই কর্মসূচি আসামে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সেইসঙ্গে এ পূর্বাভাসও দিচ্ছে যে, ভারত হাজার হাজার লোককে রাষ্ট্রহীন করতে যাচ্ছে।

খসড়া তালিকাটি প্রকাশের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই আতঙ্কে ছিলেন ৪০ বছর বয়সী খান, যদিও তার জন্ম আসামেই। এমনকি তার মা-ও ভারতীয়। শুধু তার বাবা আফগান নাগরিক, যিনি অনেক বছর আগেই দেশে ফিরে গেছেন।

খানের স্ত্রী বলেন, ‘সে (স্বামী) অনেক বার আমাকে বলেছে, ভারতীয় নাগরিক প্রমাণের জন্য যেসব কাগজপত্র জমা দিয়েছে তা যথেষ্ট নয়।’

আগামী বছরগুলোতে যেহেতু ‘বিদেশি’দের উচ্ছেদের পরিকল্পনা করা হয়েছে সেহেতু আসাম সরকার নতুন করে একটি বন্দিশালা নির্মাণ করছে। ইতোমধ্যেই রাজ্যের অন্তত ছয়টি স্থানে কমপক্ষে দুই হাজার লোককে বন্দি করা হয়েছে।

রুকশা বলেন, তার স্বামী প্রায়ই ওই বন্দিশালার কথা বলতো এবং তার বাড়ির পাশে পুলিশের গাড়ি দেখলে আঁতকে উঠতো।

তিনি আরো বলেন, ‘তার স্বামী খুবই আতঙ্কিত ছিল। প্রতিদিনই সে বলতো, পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যাবে এবং বাংলাদেশে পুশ করবে।’

ডিসেম্বর মাসে সে বাড়িতে খাবার খাওয়া ছেড়ে দেয় এবং একটি অপরিচিত জায়গায় গাড়ি চালানোর কাজ নেয়। ওই তালিকা প্রকাশের পাঁচ ঘণ্টা আগে থেকে তাকে আর পাওয়া যায়নি, বলেন রুকশা।

ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের পাঁচটি রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত রয়েছে, যার দৈর্ঘ্য চার হাজার কিলোমিটারের বেশি। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ভাগ হওয়ার আগে এসব অঞ্চলের মধ্যে যাতায়াতে কোনো বাঁধা ছিল না। এরপর গত কয়েক দশক ধরে খুব কম লোকই অব্যাহতভাবে সীমান্ত অতিক্রম করেছে। যদিও ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী বলছে, প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশি অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান করছে।

ছিটমহলের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে সীমান্ত ফোঁকর থাকার কারণে বাংলাদেশি অভিবাসীদের ভারত যাওয়ার একটা প্রবণতা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০১০ সাল পর্যন্ত ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী চোরাকারবারী সন্দেহে প্রায় এক হাজার লোককে গুলি করে মেরেছে। ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি থেকে ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে। ইতোমধ্যে এ বেড়া তিন হাজার তিন শ কিলোমিটার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা সম্ভব হয়েছে। কোথাও কোথাও আবার ফ্ল্যাডলাইট ও ক্যামেরা বসানো হয়েছে।

১৯৮০ সালে আসামে অভিবাসনবিরোধী যে ক্ষোভ সঞ্চার করা হয় তা এখন চরম পর্যায়ে রয়েছে। ওই সময় রাজ্যজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে সাত ঘণ্টার এক সংগঠিত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। আসামের মুসলিম গ্রামগুলোতে চালানো ওই ম্যাসাকারে একদিনে কমপক্ষে ১৮ শ মানুষ হত্যা করা হয়। যা ভারতে একদিনে চালানো সবচেয়ে জঘন্য গণহত্যা।

অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা আইনজীবী আমান ওয়াদুদ বলেন, ‘এখানকার ‘বিদেশি’রা অন্য গ্রহের মানুষের মতো।’

আসামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, স্থানীয়দের সহযোগিতায় হাজার হাজার অভিবাসী ভোটার হয়েছেন এবং চাকরি পেয়েছেন ও জমি কিনেছেন। ধুবরি জেলার খুচরা বিক্রেতা পঙ্কজ সাহা বলছেন, ‘গত দুই দশকে বাংলাদেশ থেকে আসা অনেক মুসলিম আমাদের চারপাশে বসতি স্থাপন করেছেন।’

তিনি বলেন, ’২০ বছর আগে আমাদের শহরের মোট জনসংখ্যার ৭৫ শতাংশ ছিল হিন্দু। আর আজ মুসলমানরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ।’

আসামের রাজধানী গোহাটি থেকে প্রতীক হাজেলা নামের এক সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের কাছে সাড়ে ছয় কোটি নথিপত্র জমা পড়েছে। এদের অনেকের কাছে হাতে লেখা দলিলপত্র আছে, আবার অনেকের তাও নেই।

নিজেদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায় যারা নাগরিকত্ব লাভে ব্যর্থ হয়েছে তাদের পরিণাম কী হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে হাজেলা বলেন, ‘যারা আবেদন করেছে অথচ বৈধ বলে প্রমাণ হয়নি, তাদের ভাগ্যের কী হবে তা আমি বলতে পারব না।’

প্রক্রিয়াটির বাস্তবায়ন নিয়ে এখনও প্রশ্ন আছে। যদিও ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে ৯০ হাজার লোককে বিদেশি হিসেবে ঘোষণা করেছে (ইন্ডিয়াস্পেন্ড নামের একটি ওয়েবসাইটের তথ্য মতে)।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খুব অল্প সংখ্যক লোককে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে- যদিও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রত্যাবাসন চুক্তি নেই- কিন্তু কর্মকর্তারা (ভারতীয়) বলছেন, তারা আবার ফিরে এসেছে।

পুলিশের রেকর্ড বলছে, আরও ৩৮ হাজার লোক যাদের বিদেশি হিসেবে ঘোষণা করা হবে, তারা সমাজের মধ্যে মিশে গেছে। আবার কয়েক হাজার রয়েছে যাদের নাগরিকত্ব নিয়ে শুনানি চলছে।

ওয়াদুদ বলছেন, ‘বিশেষত, বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে বিদেশি হিসেবে হঠাৎ আটক হয়ে বন্দিশালায় যাওয়ার আতঙ্ক কাজ করছে। এই সম্প্রদায়ের (মুসলিম) মধ্যে ব্যাপক উব্দেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।’

হানিফ খান ছাড়াও এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আরও দুইজনের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।

সুবিমল ভট্টাচার্য নামের একজন বিশ্লেষক, যিনি রাজ্যে কল্যাণমূলক স্কিম পরিচালনা করেন, বলছেন, ‘আমি লোকজনকে বলছি, দ্বিতীয় তালিকা প্রকাশের আগ পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা দরকার। আরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাম অন্তর্ভুক্ত হবে। ভেরিফিকেশন এখনও চলছে।’

আগামী ৩১ মে সরকার যখন চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করবে তখন বিদেশিদের তালিকায় আরও হাজার হাজার লোকের নাম যুক্ত হবে। যদিও তাদের ব্যাপারে কী করা হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বান্দ সেনোয়াল গত মাসে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বিদেশিরা সাংবিধানিক অধিকার হারাবে।

তিনি বলেন, ‘তাদের একটাই অধিকার থাকবে আর তা হলো মানবাধিকার, যা নিশ্চিত করেছে জাতিসংঘ, যেখানে খাদ্য, আশ্রয় ও বস্ত্রের কথা বলা হয়েছে।’

বিতাড়নের বিষয়টি পড়ে আসবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ভারতীয় কর্মকর্তারা রেকর্ডের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে তারা বলেছেন, তাদের প্রত্যাশা ছিল, বাংলাদেশ তাদের প্রত্যেকটি নাগরিককে ফেরত নেবে, যেহেতু এখন এটি ব্যক্তি টু ব্যক্তি করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ বলছে, আসামে তাদের নাগরিক অবৈধভাবে বসবাস করছে এটা তাদের জানা নেই। তাছাড়া আসাম রাজ্য থেকে গণ-বিতাড়নের বিষয়টিও ভারত কখনও বলেনি। ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে বাংলাদেশের যে হাইকমিশন রয়েছে, সেখানকার এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, ঢাকা তার আগের অবস্থানেই রয়েছে।

তবে ওয়াদুদ বলছেন, ‘বিতাড়ন কখনও সম্ভব হবে না। বাংলাদেশ এসব লোক কখনও গ্রহণ করবে না। যদিও আমি কল্পনা করতে পারছি না, এসব লোকের কী হবে, তবে মনে হচ্ছে, কোনো অধিকার ছাড়াই তারা রাষ্ট্রহীন হবে।’

আরপি

 
.




আলোচিত সংবাদ