মালদ্বীপ সংকট ও চীন-ভারতের টানাটানি

ঢাকা, রবিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | ১৩ ফাল্গুন ১৪২৪

মালদ্বীপ সংকট ও চীন-ভারতের টানাটানি

মূল: ওয়াশিংটন পোস্ট, ভাষান্তর: রওশন প্রধান ৪:৫৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৮

print
মালদ্বীপ সংকট ও চীন-ভারতের টানাটানি

মালদ্বীপে যখন রাজনৈতিক সংকট চলছে, তখন ভারত মহাসাগরের এ দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে নিজেদের কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা করছে প্রভাবশালী চীন ও ভারত। প্রাথমিকভাবে দেখলে মনে হয়, গত ১ ফেব্রুয়ারি মালদ্বীপের সুপ্রিম কোর্ট দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্টসহ কয়েকজন রাজনীতিককে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতির সঙ্গে জড়াতে চায় না বেইজিং ও নয়াদিল্লি। চীন ও ভারতের কর্মকর্তারাও বরাবরের মতো কূটনৈতিক সুরেই বলেছেন, দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার ইচ্ছা তাদের নেই।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মালেকে নিয়ে উভয়ের আঞ্চলিক স্বার্থ রয়েছে এবং তা রক্ষার জন্য উভয়ই দেশটিতে তাদের প্রভাব রাখার চেষ্টা করছে।

দেশটির প্রেসিডেন্ট ইয়ামীন আব্দুল গাইয়ুম তার ‘মিত্র দেশ’ চীন, পাকিস্তান ও সৌদি আরবে দূত পাঠিয়ে তার সরকারের অবস্থান (সুপ্রিম কোর্টের রায় প্রত্যাখ্যান) অবহিত করেছেন। এ ছাড়া গত সপ্তাহে দেশে জরুরি অবস্থা জারি ও সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারককে গ্রেফতার করেছেন। তার এই পদক্ষেপে সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়েছে যে, আগামী নির্বাচনে যাতে সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশীদ অংশ নিতে না পারেন তারই চেষ্টা করছেন ইয়ামীন।

অন্যদিকে, ইয়ামীনের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী নির্বাসিত নাশীদ মালদ্বীপের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতের প্রতি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। গত সপ্তাহে টুইটারে তিনি ভারতের প্রতি সামরিক হস্তক্ষেপের এ আহ্বান জানান।

ঐতিহ্যগতভাবেই ৩ লাখ ৯০ হাজার সুন্নি মুসলমানের এই দেশটিতে ভারতের প্রভাব বিদ্যমান। এমনকি ১৯৮৮ সালে, যখন ভাড়াটে সেনারা ক্ষমতা গ্রহণের চেষ্টা করে, ভারত দেশটিতে হস্তক্ষেপও করে। নয়াদিল্লির হস্তক্ষেপ বা সহায়তায় প্রায় তিন দশক ধরে ছোট-বড় ১২০০ দ্বীপের এই রাষ্ট্রটি শাসন করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট মামুন আব্দুল গাইয়ুম। মামুনের পর নাশীদকে নিজেদের মিত্র বানায় ভারত। আর নাশীদই দেশটির ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা মালদ্বীপকে বিশ্ব সমাজে তুলে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন।

কিন্তু ইয়ামীনের আমলে এসে মালে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে গুরুত্ব দেয়। ২০১৩ সালে নাশীদকে পরাজিত করে মালদ্বীপের ক্ষমতায় আসেন সাবেক স্বৈরশাসক মামুন আব্দুল গাইয়ুমের সৎ ভাই ইয়ামীন আব্দুল গাইয়ুম।

নাশীদের আমলে দেশটিতে যে গণতান্ত্রিক উন্নতি হয়েছিল ইয়ামীনের আমলে এসে তা অনেকটাই ম্লান হয়। সম্ভাব্য সব রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে তিনি হয় বন্দি করেন না হয় নির্বাসনে পাঠান। বাক স্বাধীনতার ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। সাংবাদিক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। ২০১৫ সালে এক রায়ে নাশীদকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। যে রায় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মাধ্যমে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। এরপর নাশীদ ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় পান।

শুরু থেকেই বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করে আসছিল চীন।

চীন-ভারত বিষয়ে সিঙ্গাপুরভিত্তিক এস. রাজারত্মম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ মহলক্ষ্মী গণপতি বলছেন, ‘২০১১ সাল পর্যন্ত মালদ্বীপে চীনের দূতাবাস পর্যন্ত ছিল না। অথচ ২০১৮ সালে এসে বেইজিং পুরো ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি বড় খেলোয়াড়।’

গেল ডিসেম্বরে ইয়ামীন যখন বেইজিং সফর করেন তখন দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তি অনুযায়ী, মালদ্বীপের অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে ট্যারিফ অনেকাংশে হ্রাস করা হয়। অন্যদিকে, মালদ্বীপে চীনা পণ্য ও সেবার বাজার উন্মুক্ত হয়। সেইসঙ্গে সন্ত্রাস দমনেও চুক্তি হয়।

চীনা পর্যটকরা ইতোমধ্যে মালদ্বীপের পর্যটন শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হয়েছে। চীনা পর্যটকদের ব্যয়িত অর্থ মালদ্বীপের অর্থনীতিকে সচল রাখতে সহায়তা করছে। তাছাড়া মালদ্বীপের বিমানবন্দর বর্ধিতকরণ, হাউজিং সেক্টর উন্নয়ন এবং অন্যান্য প্রজেক্টে লাখ লাখ ডলার বিনিয়োগ করছে বেইজিং।

চীন যে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সেক্ষেত্রে মালদ্বীপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে চীন গোটা এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করতে চায়।

নাশীদ অভিযোগ করেছেন, সামান্য কিংবা কোনো প্রকার তত্ত্বাবধান ও স্বচ্ছতা ছাড়া চীনা বিনিয়োগে ফ্লাডগেট নির্মাণের মাধ্যমে চীন মালদ্বীপকে কিনে ফেলছে। তবে চীন এ ধরনের অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে।

তবে বেইজিং মালদ্বীপের বিষয়টি খুব সতর্কভাবে প্রত্যক্ষ করছে। কারণ কোনো কারণে যদি রাজনৈতিক পট পরিবর্তন অর্থাৎ নাশীদ দেশটির প্রেসিডেন্ট হয়, সেক্ষেত্রে নয়াদিল্লির প্রভাব বাড়বে।

অন্যদিকে, মালদ্বীপে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিতে উদ্বিগ্ন ভারত। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারত কী পদক্ষেপ নেবে তা খুব বেশি স্পষ্ট নয়।

যতটুকু জানা যায়, সংকট উত্তরনে নাশীদের সেনা মোতায়েনের আহ্বানের ব্যাপারে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। সেইসঙ্গে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইয়ামীনের দূতের সঙ্গেও কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে নয়াদিল্লি।

তবে শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীনের উদ্দেশ্যে একটি সতর্ক বিবৃতি দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘আমরা লক্ষ্য করেছি, চীন বলেছে, চীনা কর্মকর্তা ও মালদ্বীপের প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা দেওয়ার সক্ষমতা মালদ্বীপ সরকারের রয়েছে। আমরা আশা করব, সকল দেশ মালদ্বীপে বিরোধিতার পরিবর্তে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারে।’

ভারত মহাসাগরের কৌশলগত বিষয়ক ক্যানবেরাভিত্তিক দ্য ন্যাশনাল সিকিউরিটি কলেজের বিশেষজ্ঞ ডেভিড ব্রয়েস্টার বলেছেন, ‘ভারত খুবই জটিল অবস্থানে রয়েছে। তারা চায় ইয়ামীনের রিপ্লেসমেন্ট, কিন্তু তারা সেটা কীভাবে করবে সেটা স্পষ্ট নয়।’

তিনি বলেন, ‘মালদ্বীপে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ভারতের প্রাথমিক চাওয়া নয়, বরং দেশটিতে চীনের প্রভাব কমানোই তাদের প্রথম চাওয়া।’

আরপি

 
.

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad