আফ্রিকার কোল ঘেঁষে সিসিলিতে হচ্ছে ভারতের সেনাঘাঁটি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ মে ২০১৮ | ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫

আফ্রিকার কোল ঘেঁষে সিসিলিতে হচ্ছে ভারতের সেনাঘাঁটি

পরিবর্তন ডেস্ক ৫:৫২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৯, ২০১৮

print
 আফ্রিকার কোল ঘেঁষে সিসিলিতে হচ্ছে ভারতের সেনাঘাঁটি

ভারতের সাম্রজ্যবাদী মনোভাব দেশটির জন্মলগ্ন থেকেই। তাই জনগণের আর্থসামজিক দিকের চেয়ে দেশের সামরিকায়নের প্রতি সবসময় নজর ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের। নেহেরু থেকে মোদি- তাদের কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে ছিল ভারতকে পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা। বিশেষ করে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই দেশটির ক্ষমতায় আসে।

 

নিজ দেশের সামরিকায়নের বাইরে বিভিন্ন দেশেও সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নয়াদিল্লি। ভারত মহাসাগরের বুকে সামরিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার জন্য দ্বীপরাষ্ট্র সিসিলির সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

হর্ন অব আফ্রিকা থেকে প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার দক্ষিণে অ্যাসাম্পশন আইল্যান্ডে ভারতীয় সামরিক পরিকাঠামো বাড়ানোর প্রস্তাবে অনুমোদন দেয় সিসিলির মন্ত্রিসভা। এর পরেই শনিবার দু’দেশে নতুন চুক্তি সই করে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শীর্ষ বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার জানায়, দেশটির পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শঙ্কর সিসিলির রাজধানী ভিক্টোরিয়ায় গিয়ে চুক্তি সই করেন। সিসিলির ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী দল উভয়ই এই চুক্তিকে সমর্থন করছে। ফলে পার্লামেন্টে চুক্তিটি সহজেই পাস হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভারত মহাসাগরে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর লক্ষ্যে পূর্বে এবং পশ্চিমে বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গেই যোগাযোগ বাড়াচ্ছে ভারত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তথা ভারত মহাসাগরের পূর্বাংশে ভিয়েতনাম, ব্রুনাই এবং ফিলিপাইনে ভারতীয় নৌসেনার নিয়মিত উপস্থিতি রয়েছে।

ভারত মহাসাগরের পশ্চিমাংশেও একইভাবে সামরিক উপস্থিতি সুনিশ্চিত করতে সিসিলি এবং মরিশাসের সঙ্গে দীর্ঘ দিন ধরে আলোচনা চালিয়ে আসছে নয়াদিল্লি।

গত ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সিসিল সফরের সময়েই চুক্তি সই করেছিল ভারত। কিন্তু চুক্তিটি সিসিলির পার্লামেন্টে আটকে যায়। সেই থেকে ঝুলেই ছিল এই চুক্তি।

সিসিলির প্রেসিডেন্ট জেমস মিশেল ক্ষমতায় থাকতে চুক্তিটি সই হয়েছিল। ২০১৬ সালে পদত্যাগ করেন তিনি। এর পর নতুন প্রেসিডেন্ট হন ড্যানি ফরে।

এরপর ২০১৭ সালে ড্যানি ফরে জানিয়ে দেন, সিসিলি-ভারত চুক্তি আইনিভাবে বৈধ নয়। ভারতের পক্ষে ওই চুক্তির আইনি বৈধতা থাকলেও সিসিলির কাছে তা নেই। কারণ সিসিলির পার্লামেন্ট ওই চুক্তিতে অনুমোদন দেয়নি।

এর পরেই ফের সক্রিয় হয় ভারত। বিদেশ সচিব এস জয়শঙ্কর ২০১৭ সালের অক্টোবরে সিসিলি যান। শুধু প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নয়, বিরোধী দলের সঙ্গেও তিনি বৈঠকে বসেন। কারণ সিসিলির পার্লামেন্টে প্রেসিডেন্টের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যিনি মাত্র ১৯৩ ভোটে হেরে গিয়েছিলেন, সেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত নেতা বেভেল রামকলাবনের দল সিসিলি ন্যাশনাল পার্টিই পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ।

দু’পক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ভারত-সিসিলি চুক্তিতে বেশ কিছু সংশোধনী আনা হয়। ড্যানি ফরে এবং বেভেল রামকলাবন- দু’জনেই চুক্তির শর্তাবলীকে সবুজ সংকেত দেন।

ভারতের বিদেশ সচিব এস জয়শঙ্কর সিসিলির রাজধানী ভিক্টোরিয়ায় গিয়ে ২৭ জানুয়ারি চুক্তি সই করেন। প্রেসিডেন্টের দল পিপলস পার্টি এবং ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সিসিলি ন্যাশনাল পার্টি- উভয়েই এই চুক্তির পক্ষে থাকায় একটি ভোটও এই চুক্তির বিপক্ষে যাবে না বলে ধরে নেয়া যায়।

চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরে জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, স্যেশেলসের এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন বা নিজস্ব অর্থনৈতিক জলসীমাকে সুরক্ষিত রাখতে এবং জলদস্যুদের দমন করতে ভারত ও সিসিলি যৌথ ভাবে কাজ করবে।

এরআগে ২০১৬ সালের মার্চেই সিসিলিতে ভারত কোস্টাল সার্ভিল্যান্স রাডার সিস্টেম চালু করেছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানানো হয়েছে। সিসিলির সামরিক দক্ষতা বৃদ্ধিতেও ভারত সক্রিয় বলে জয়শঙ্কর জানিয়েছেন।

আফ্রিকা উপকূলের কাছে অ্যাসাম্পশন আইল্যান্ডে ভারত সামরিক পরিকাঠামো বৃদ্ধি করবে। ওই দ্বীপে ভারতীয় নৌসেনার উপস্থিতি এবং নজরদারিতে সিসিলির আউটার আইল্যান্ডস অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার হবে এবং সমগ্র দ্বীপরাষ্ট্রের জলসীমা আগের চেয়ে অনেক বেশি সুরক্ষিত হবে বলে নয়াদিল্লি এবং ভিক্টোরিয়া মনে করছে।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিসিলির জন্য শুধু নয়, এই চুক্তি ভারতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভারত মহাসাগরে সামরিক উপস্থিতি দ্রুত বাড়াচ্ছে চীন। ভারতকে ঘিরে বিভিন্ন দেশে বন্দর এবং পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে তারা। ভারতও কয়েকটি পাল্টা পদক্ষেপ করেছে। দেশের বাইরে তথা ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন অংশে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে ভারত।

কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হর্ন অব আফ্রিকায় চীন পুরোদস্তুর সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে ফেলেছে ২০১৭ সালেই। এ খবর ভারতের জন্য খুব স্বস্তিদায়ক ছিল না। ভারত মহাসাগরের পশ্চিমাংশে বড়সড় সামরিক পরিকাঠামো গড়ে তোলা দিল্লির জন্য খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। অবশেষে সিসিলির সঙ্গে চুক্তি করে সেই লক্ষ্য পূরণ করল ভারত।

আফ্রিকার জিবুতিতে চীনের সেনাঘাঁটি থেকে ২,৪৫৩ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত অ্যাসাম্পশন আইল্যান্ডে পুরোদস্তুর সামরিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার ছাড়পত্র পেয়ে গেল ভারত। এই চুক্তি কিন্তু চীনের রক্তচাপ বাড়াবে মনে করছেন সমর বিশেষজ্ঞরা।

এমএসআই

 
.

Best Electronics Products



আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad