নতুন দলের নিবন্ধন: ঠিকানা ঠিক নেই, বাসায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়

ঢাকা, বুধবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৮ | ১২ বৈশাখ ১৪২৫

নতুন দলের নিবন্ধন: ঠিকানা ঠিক নেই, বাসায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়

মো. হুমায়ূন কবীর ১১:৪৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০১৮

print
নতুন দলের নিবন্ধন: ঠিকানা ঠিক নেই, বাসায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিবন্ধন চেয়ে এবার ৭৬টি রাজনৈতিক দল আবেদন করেছে। নিবন্ধন চাওয়া কোনো দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় বাসাবাড়িতে, কোনোটির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এবং একই ভবনে একাধিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছাড়াও বেশ কয়েকটি দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঢাকার বাইরে।

এমনকি বেশকিছু দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের যে ঠিকানা দেয়া হয়েছে, সেখানে তা পাওয়া যায়নি। মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।

এর আগে নতুন দলের নিবন্ধনের জন্য আবেদন চেয়ে ৩০ অক্টোবর গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে কমিশন। এতে আবেদনের শেষ দিন ছিল ৩১ ডিসেম্বর।

এবার যেসব রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে, তার মধ্যে একটি ‘নাকফুল বাংলাদেশ’। দলটি গঠন করা হয়েছে মাত্র আড়াই মাস আগে (গত ২৩ অক্টোবর)। নির্বাচন কমিশনে আবেদন করার সময় দলটির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসাবে রাজধানীর উত্তরার ৭নম্বর সেক্টরের বিএনএস সেন্টারের ১০ম তলা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে কোনা রাজনৈতিক কার্যালয় নেই। যেই কক্ষটিকে দলীয় কার্যালয় হিসাবে দেখানো হয়েছে সেটি একটি গার্মেন্ট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।

নাকফুল বাংলাদেশের সভাপতি (দিনাজপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী) স্বপন রেজা জানান, তিনি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন। তার শখ গান গাওয়া। এ দলের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রায় সবাই নারী। আর দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে সেটি দলের কোষাধ্যক্ষের অফিস।

ইসিতে এবার নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে ‘বেঙ্গল জাতীয় কংগ্রেস-বিজেসি’ নামে একটি নতুন দল। দলটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আবুল হোসেনের নিজ ফ্ল্যাটবাসাকে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় দেখানো হয়েছে। আবাসিক ভবনটি রাজধানীর তেজগাঁওয়ের তেজকুনিপাড়ার আবাসিক ভবন ‘বিজয় স্মরণী টাওয়ার’ নামে পরিচিত।

ভবনের বাইরে ছোট আকারের একটি নতুন সাইনবোর্ড দেখা গেলেও কেয়ারটেকার মাসুদ শেখ জানান, নতুন সাইনবোর্ডটি কখন লাগানো হয়েছে তা নজরে পড়েনি। আর ‘বিজয় স্মরণি টাওয়ার’টি পুরোই আবাসিক। সেখানে রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক কোনো কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি নেই।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ইঞ্জিনিয়ার আবুল হোসেনকে পাওয়া যায়নি। তার ছেলে মানজুর হোসেন জানান, ৫ রুমের বাসাটিতে তারা পরিবারসহ থাকেন।

রাজধানীর পুরান এয়ারপোর্ট সড়কের আওলাদ হোসাইন মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় রয়েছে বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (বিএলডিপি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়। প্রধান সড়ক থেকে সরু গলিতে সিড়ি বেয়ে ভবনের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে দেখা যায়, ওই কার্যালয়ের প্রধান ফটক বন্ধ। ফটকের সামনে আসবাবপত্রে ধুলোর স্তর পড়ে আছে।

ফোনে যোগাযোগ করা হলে বিএলডিপি’র চেয়ারম্যান এম নাজিম উদ্দিন আল আজাদ জানান, তিনি দুইবার মন্ত্রী ও যশোর-৪ আসনের এমপি ছিলেন।

তোপখানা রোডের বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ ভবনটি যেন রাজনৈতিক দলগুলোর আশ্রয়স্থল। ২২/১ তোপখানা রোডে অবস্থিত ওই ভবনের পঞ্চম তলায় ইসিতে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ-বাকশাল ও বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-বাংলাদেশ জাসদ এর কেন্দ্রীয় কার্যালয় অবস্থিত।

বাংলাদেশ মঙ্গল পার্টি প্রধান কার্যালয়ের এই ঠিকানা দেয়া থাকলেও সেটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়া ও ওই ফ্লোরেই আম জনতা খেলাফত পার্টি (এজেকেপি) ও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা জোট নামেও রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ড দেখা যায়। ওই ভবনের নিচতলায় মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যের প্রধান কার্যালয় রয়েছে।

রাজধানীর ৪২/১ সেগুনবাগিচার চারতলায় অবস্থিত বাংলাদেশ ইউনাইটেড ইসলামী পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়। এ ভবনটি মূলত মার্কেট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রয়েছে অনলাইন পত্রিকাসহ কয়েকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অফিস।

এ দলের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, দুই রুমের অফিসে নেতাদের বসার জন্য দুটি এবং কর্মীদের বসার জন্য গোটা পাঁচ-সাতেক চেয়ার। এসব রুমেই রাত্রিযাপন করেন অফিসের স্টাফরা।

কার্যালয়ের অফিস সহকারী মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, দলটির উদ্যোগে বিভিন্ন সময়ে নানান ধরনের জঙ্গিবিরোধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওইসব সমাবেশে আওয়ামী লীগের একাধিক মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতারা অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ জনতা পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও আবাসিক ভবনে। নিউ ইস্কাটন রোডের মনা টাওয়ারের সপ্তম তলায় একটি রুম দলীয় কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ডা. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম। ওই ভবনের পঞ্চম তলায় তিনি সপরিবারে থাকেন।

এছাড়া দক্ষিণ বাড্ডার নিজ বাসভবনকে কেন্দ্রীয় কার্যালয় দেখিয়ে নিবন্ধন চেয়েছেন সাধারণ জনতা পার্টির চেয়ারম্যান ড. ছরোয়ার হোসেন।

এছাড়াও নিবন্ধন আবেদনে কোর্ট স্ট্রিট হাউজের দ্বিতীয় তলার ২০৪ নম্বর রুমকে কার্যালয় হিসেবে দেখিয়েছেন গণতান্ত্রিক ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মো. জাহাঙ্গীর হোসেন।

সাতটি দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় রাজধানী ঢাকার বাইরে
বাংলাদেশ সমাধান ঐক্য পার্টি (বসবাস) কুড়িগ্রাম, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ-ভাসানী গ্রুপ) টাঙ্গাইল, বাংলাদেশ সমাজ উন্নয়ন পার্টি ঢাকার সভার উপজেলার রেজ্জাক সুপার মার্কেট, বাংলাদেশ সত্যব্রত আন্দোলন নরসিংদী, বঙ্গবন্ধু দুঃস্থ ও প্রতিবন্ধী উন্নয়ন পরিষদ ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ তৃণমূল জনতা পার্টি গাজীপুর, বাংলাদেশ রামকৃঞ্চ পার্টি টাংগাইল, লিবারেল পার্টি-এলপি ঢাকার কেরাণীগঞ্জ।

এবিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নতুন নতুন ধলের আবির্ভাব শুভ লক্ষণ নয়। আবেদন করা অনেক দলই নামসর্বস্ব ও আদর্শহীন বলেই মনে হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন এসব দল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবে বলে আশা করি।

ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ জানান, নিবন্ধনের জন্য ৭৬টি রাজনৈতিক দল আবেদন করেছে। এসব দল নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করেছে কিনা তা যাচাইয়ে একটি উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা মাঠপর্যায়ে খোঁজ নেবেন। এছাড়া গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনও নেব।

একাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এই আবেদন আহ্বান করে নির্বাচন কমিশন। নিবন্ধনের ক্ষেত্রে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, তিনটির মধ্যে একটি শর্ত পূরণ হলেই তারা নিবন্ধনের যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। শর্তগুলো হলো-
১. দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যেকোনো জাতীয় নির্বাচনের আগ্রহী দলটি যদি অন্তত একজন সংসদ সদস্য থাকেন।
২. যেকোনো একটি নির্বাচনে দলের প্রার্থী অংশ নেওয়া আসনগুলোয় মোট প্রদত্ত ভোটের ৫ শতাংশ পায়। এবং
৩. দলটির যদি একটি সক্রিয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়, দেশের কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ (২১টি) প্রশাসনিক জেলায় কার্যকর কমিটি এবং অন্তত ১০০টি উপজেলা/মেট্রোপলিটন থানায় কমপক্ষে ২০০ ভোটারের সমর্থন সম্বলিত দলিল থাকে।

ইসি সূত্র জানায়, এর আগে দশম সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আগ্রহী নতুন ৪৩টি রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের আবেদন করেছিল। এর মধ্যে ৪১টিই নির্বাচন কমিশনের কাছে নিজেদের ‘যোগ্যতার’ প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়।

মাত্র দুটি দল শর্ত অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে কার্যালয় ও কমিটি থাকার তথ্য দিয়েছিল। এরপর তাদের নিবন্ধন দেয় কমিশন। দল দুটি হলো- বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) ও সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রথা চালু করে ইসি। প্রথম বছরে ১১৭টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ৩৯টি দল নিবন্ধন পায়। এর মধ্যে স্থায়ী সংশোধিত গঠনতন্ত্র দিতে না পারায় ২০০৯ সালে ফ্রিডম পার্টির নিবন্ধন বাতিল করে ইসি। আর আদালতের আদেশে ২০১৩ সালে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ হয়।

এছাড়া ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল) নামে নতুন একটি দলের নিবন্ধন দেয়া হয়। বর্তমানে ইসির নিবন্ধনে ৪০টি রাজনৈতিক দল রয়েছে।

এইচকে/এমএসআই

 
.




আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad