মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে কী বলেছিলেন খান আতা?

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭ | ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে কী বলেছিলেন খান আতা?

পরিবর্তন প্রতিবেদক ১:৫১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৬, ২০১৭

print
মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে কী বলেছিলেন খান আতা?

নাট্য ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর মন্তব্য ঘিরে চলছে বিতর্ক। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের এক সম্মেলনে তিনি সম্প্রতি বলেন, ‘খান আতা অনেক বড় শিল্পী কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি রাজাকার ছিলেন।’ এ প্রসঙ্গে উঠে আসে নানা প্রশ্ন। অবশ্য ফেসবুক পোস্টে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন বাচ্চু।

.

তবে এ বিতর্ক বেশ পুরনো। নির্মাতা, প্রযোজক ও সংগীতজ্ঞ খান আতাউর রহমান জীবদ্দশায় এ সব বিষয়ে কথা বলেছেন নানা সময়।

বাংলা একাডেমি থেকে ২০০০ সালে প্রকাশ হয় জীবনীধর্মী বই ‘খান আতাউর রহমান’। মাহবুব আজাদ রচিত বইটিতে খান আতার কীর্তির বিবরণীর পাশাপাশি রয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন কর্মকাণ্ড নিয়ে বক্তব্য।

ওই বইয়ের ১২৬ নং পৃষ্ঠায় খান আতার একটি সাক্ষাৎকার থেকে উদ্ধৃত করা হয়ে এভাবে— “মুক্তিযুদ্ধ চলছে। পাকসেনাদের হাতে অগণিত নীরিহ মানুষ এবং মুক্তিযোদ্ধারা মৃত্যুবরণ করছে, অগণিত মা-বোনেরা ধর্ষিতা হচ্ছে আর মানবতার প্রতি এ নিষ্ঠুর অত্যাচারেও আমার পুরুষসিংহসত্তা হুংকার দিয়ে উঠছে না— আমি শুধু সংসারের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটাচ্ছি। কারো কারো বিবেচনায় আমার ব্যবহার ক্ষমার অযোগ্য— যদিও তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীনতাযুদ্ধের পূর্বকাল পর্যন্ত আমার যে কর্মকাণ্ড রেডিও এবং টেলিভিশনে, তার সবই ছিলো বাংলাদেশকে স্বাধীনতা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করা, আজ দেশ ছেড়ে চলে না যাবার অপরাধেই আমি কারো কারো চোখে হয়ে গেলাম অপরাধী।”

একই বইয়ের ১২৫ নং পৃষ্টায় উদ্ধৃত সাক্ষাৎকারে খান আতার স্ত্রী সংগীতশিল্পী নীলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে খান আতার ভূমিকা বিষয়ে বলি, জীবদ্দশায় এ ব্যাপারটি ওকে ভীষণভাবে পীড়িত করতো। যার সততা, সাহস ও দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন উঠানোর কিছু নেই, তাকে মুক্তিযোদ্ধের প্রশ্নে হেয় প্রতিপন্ন করার অপপ্রয়াস কেন? একাত্তর সালে দেশ ছেড়ে যায়নি ওটাই কি ওর অপরাধ? মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যক্তিগত অসুবিধার জন্য ওর পক্ষে সম্ভব হয়নি দেশের বাইরে চলে যাওয়া। কারণ তখন আমার কোলে ছিলো এক মাসের শিশু, বাসায় ছিলেন আমার বৃদ্ধা শাশুড়ি যার নড়াচড়ার ক্ষমতাও ছিলো না। তাছাড়া আমার ননদ, দেবর ও অন্যান্য আত্মীয়রা সবাই আমাদের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন। অন্যদিকে ওর ছিলো ব্যক্তিগত অফিস এবং অফিসের কর্মচারীদের প্রতি মাসের বেতন চালাতে হতো।’

তিনি আরো বলেন, ‘কিন্তু দেশ ছেড়ে না গেলেও পঁচিশ মার্চ-এর রাতের পর দুই তিন দিন ধরে ওকে দেখেছি, বাসায় দেশাত্মবোধক গানের যতো ম্পুল ও টেপ ছিলো সব খুঁজে খুঁজে বের করতে। পরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেগুলো মুক্তিযোদ্ধা ছেলেদের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পাঠিয়ে দিয়েছে।’

আরো জানান, ঔষধ সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পাঠিয়েছেন। এমনকি টেলিভিশনের লাইভ অনুষ্ঠানে বাচ্চাদের যে সব গান শিখিয়েছেন সেখানে রূপক অর্থে দেশের কথা তুলে ধরেছেন। বলেন, বন্দুকের মুখেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছিলেন।

উল্লেখ্য ওই বিবৃতিতে মুনীর চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম, নূরুল মোমেন’সহ বিভিন্ন অঙ্গনের ৫৫জন বিশিষ্ট ব্যক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। 

একই বইয়ের ১২৪ নং পৃষ্টায় জানানো হয়, পরিচালক আলমগীর কবিরের অভিযোগ খণ্ডনে খান আতা ‘পূর্বাণী’তে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেন। ওই চিঠির জবাবে ‘খান আতা একজন বহুরূপী’ শিরোনামের লেখায় আলমগীর কবির লেখেন, “তাকে যখন একাত্তরের মার্চ অসহযোগে শহীদ মিনার চত্ত্বরে বিক্ষুব্ধ শিল্পীদের মাঝে দেখেছি তখন শ্রদ্ধা অনুভব করেছি। কিন্তু পরবর্তীকালে কী দেখলাম? ইয়াহিয়া-টিক্কার হত্যাযজ্ঞের মাঝে তিনি টিভিতে পাকিস্তানি দেশাত্মবোধক গান শেখাচ্ছেন। শিল্পীদের নিয়ে রাও-ফরমান আলীর সঙ্গে দহরম মহরম। এ জে কারদারের বাঙালি বিরোধী ছবি ‘বিট্টেয়াল’-এ ‘দুষ্কৃতিকারী’ (মুক্তিযোদ্ধা) বিরোধী সাক্ষাৎকার। পরে স্বাধীন বাংলায় ‘আবার তোরা মানুষ হ’। এই বহুরূপী ভূমিকার পথে নিশ্চয় তাঁর নিশ্চয় যুক্তি আছে। কিন্তু আমি তা কোনো দিনই বুঝবো না।”

উত্তরে ‘আমি তো বহুরূপী বটেই’ শিরোনামে চিঠি লেখেন খান আতা। তিনি জানান, বাধ্যতামূলকভাবে টিভিতে বাচ্চাদের গান শেখালেও সে সব গানে কোনোদিন ‘পাকিস্তান’ শব্দটি উচ্চারিত হয়নি। দুটি গানের উদাহরণ দেন— যেমন; ‘দেশকে ভালোবাসে বসে থাকলে চলবে নারে’।

জানান, রাও-ফরমান আলী বক্তৃতা দেওয়ার হুকুম দিলে বলেছিলেন, ‘আপনি মেশিনগান, রাইফেল ও সঙ্গীনধারী সৈনিকদের বসিয়ে রেখেছেন প্রচার ভবনে প্রবেশ দ্বারে অথচ শিল্পীদের বলছেন যে, তারা যেন সহজ ও স্বাভাবিক গান-বাজনা-নাটক ও জীবন্তিকা পরিবেশন করেন— এটা কী করে সম্ভব?’

খান আতা একইসঙ্গে একজন বাংলাদেশি চলচ্চিত্র অভিনেতা, গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, গায়ক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, কাহিনীকার এবং প্রযোজক। তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘জাগো হুয়া সাভেরা’। চলচ্চিত্রকার এহতেশাম পরিচালিত ‘এ দেশ তোমার আমার’ তার অভিনীত প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র।

‘নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা’ (১৯৬৭) এবং ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০) চলচ্চিত্র দিয়ে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। ‘সুজন সখী’ (১৯৭৫) চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার হিসেবে ১ম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। পরে ‘এখনো অনেক রাত’ (১৯৯৭) চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক ও শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালে নির্মাণ করেন ‘আবার তোরা মানুষ হ’; যার বিষয়বস্তু ছিল যুদ্ধ পরবর্তী প্রেক্ষাপট।

ডব্লিউএস

আরো পড়ুন... 
‘খান আতা বড় শিল্পী কিন্তু সে রাজাকার’
‘খান আতা রাজাকার’, জবাবে কী বললেন আগুন!
খান আতা কত বড় রাজাকার ছিলেন? পড়ুন বাচ্চুর জবাব

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad