সাইফ উদ্দিনকে স্টুয়ার্ট ব্রড হয়ে ওঠার পরামর্শ

ঢাকা, শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ | ১ পৌষ ১৪২৪

সাইফ উদ্দিনকে স্টুয়ার্ট ব্রড হয়ে ওঠার পরামর্শ

রামিন তালুকদার, চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম থেকে ৭:৩০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৫, ২০১৭

print
সাইফ উদ্দিনকে স্টুয়ার্ট ব্রড হয়ে ওঠার পরামর্শ

শতভাগ সুস্থ্য ছিলেন না। তারপরও খেললেন। কারণ দল পড়ে আছে তলানিতে। দলের এমন অবস্থায় অধিনায়কদেরই সামনে থেকে পথ দেখাতে হয়। শনিবার কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের বিপক্ষে তাই করলেন রাজশাহী কিংসের অধিনায়ক ড্যারেন স্যামি। আর তার অধিনায়কোচিত ইনিংসে খুন হলেন একজন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের তরুণ পেসার সাইফ উদ্দিন। এক ওভারে ৩২ রান তুলে রীতিমত বিপিএলের সবচেয়ে খরুচে বোলারের খাতায় তার নাম লিখিয়ে দিলেন। এমন বেধড়ক পিটুনি খেয়ে আত্মবিশ্বাস কি তলানিতেই গিয়ে পৌঁছালো না সাইফ উদ্দিনের?

.

এই প্রশ্ন আসবে না কেন? কিছুদিন আগে, বিপিএলের ঠিক আগেই দক্ষিণ আফ্রিকায় কিলার মিলার বা ডেভিড মিলারের ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছিলেন এই ২০ বছরের যুবা সাইফ উদ্দিন। এক ওভারে দিয়েছিলেন ৩১ রান। প্রথম ৫ বলেই ছিল ছক্কার মার! দেশে ফিরে সাইফ উদ্দিন এই প্রতিবেদককেই বলেছিলে, যা হওয়ার হয়ে গেছে এবং তিনি ভুলেও গেছেন। অনুরোধ করেছিলেন সবাইকে ভুলে যেতে। অনেকে হয়তো ভুলতে চেয়েছিলেন বা ভুলতে বসেছিলেনও। কিন্তু তা আর হলো কই? পচেফস্ট্রুমের দুঃস্বপ্ন শনিবার ফিরে এলো চট্টগ্রামে। স্যামির প্রচণ্ড মার খেয়ে যে স্নায়ুচাপে এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলেন তার প্রমাণ তখনই মিলল স্পষ্ট। দুইবার বাউন্সার দিতে গিয়ে দিয়েছেন ওয়াইড।

অথচ এ তরুণকে পেয়ে কত না উচ্ছ্বসিত সবাই। বাংলাদেশ জাতীয় দলে একজন পেস অল রাউন্ডারের খোঁজ কতদিনের। আদর্শ পেস অল রাউন্ডার। সেসব গুণ বেশ মেলে সাইফ উদ্দিনের ভেতর। বয়সভিত্তিক দল থেকেই নিজেকে সেভাবে গড়ে ও প্রমাণ করে আসছেন। তাকে দিয়েই তাই জাতীয় দলের সেই শূন্যতা পূরণ করার স্বপ্ন দেখছে গোটা দেশ।

কিন্তু সেই তিনিই কি না ক্যারিয়ারের শুরুতেই এমন তোপে পরলেন। তাও অল্প দিনের ব্যবধানেই দুই দুই বার। মানসিক ভাবে ভেঙে পরাটাই স্বাভাবিক। ঠিক সে কথাই বললেন তার সতীর্থ আল-আমিন হোসেনও, ‘আসলে এমন ওভার গেলে সবাই মানসিক ভাবে হতাশ হয়ে যায়। প্রথম কয়েকটা বলে কেউ যদি ছয়-চার মেরে দেয় ওই ওভারে ফিরে আসা অনেক কঠিন হয়ে যায়। শুরুতে একটা ৬ অথবা ৪ খায় দেখবেন তাতে কমপক্ষে ১০/১২ হয়ে যায় এমনিতেই।’

তবে ক্রিকেটার মানে তো লড়াকু যোদ্ধা। আর যে মানুষটি বল ও ব্যাট হাতে সমান লড়েন তার জন্য ফেরার পথটা চ্যালেঞ্জের হলেও অসম্ভবের মতো আর না। সাইফ উদ্দিনের মতো আল-আমিনও পেসার। জাতীয় দলে এই তরুণের অনেক আগেই খেলেছেন। একসময় ভরসা হয়ে উঠেছিলেন। এখন নেই দলে। তবে ইনিংসের শেষ ওই একটি ওভারকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে দাবি করতে চাইলেন আল-আমিন, ‘ও (সাইফ উদ্দিন) কিন্তু সব মিলিয়ে বিপিএল ক্রিকেটে শেষ ছয়টা ম্যাচে দারুণ বোলিং করেছে। ৫/৬ করে দিয়েছে। একটা ম্যাচে এরকম কিছু হতেই পারে। আশা করি সামনের ম্যাচে ও ভালো ভাবেই ফিরে আসবে ইনশা আল্লাহ।’

এদিন ইনিংসের শেষ ওভারটি করতে এসেছিলেন সাইফউদ্দিন। তার আগে ৩ ওভার বল করেছেন। ৩ উইকেট শিকার করেছেন। ইনিংসে সেরা শিকারী। ততক্ষণে রান দিয়েছেন মাত্র ১৮! স্যামি শেষটায় এসে যাকে পাচ্ছেন মারছেন। শেষে তো ১৪ বলে ৪৭ রান করে ম্যাচের সেরা তিনি। ইনিংসের শেষ ওভারটাতে সাইফ স্যামির হাতে চারের মার খেলেন। তারপর একে একে আরো চার ছক্কার শিকার। মাঝে স্যামি ২ রান দিয়েছেন। বাকি দুই তো মিস্টার এক্সট্রা। সব মিলিয়ে ৩২।

এমন কাণ্ড ব্যাটসম্যানের নাম স্যামি বলেই সম্ভব! এই বিশ্বাসটাই কিন্তু স্যামির দলের ইংলিশ ক্রিকেটার লুক রাইট। এ দানবীয় ক্রিকেটারের সামনে পড়েই সাইফ উদ্দিন কিছুটা ভড়কে গেছেন বলে মনে করেন তিনি, ‘ড্যারেন স্যামি পৃথিবীর অন্যতম সেরা একজন ব্যাটসম্যান এবং সে এটা অনেক আগে থেকেই করে আসছে। দানবীয় একজন ক্রিকেটার। আমার মনে হয় তার (সাইফ উদ্দিন) কিছু ভেরিয়েশন দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত ছিল। তা সে করেও ছিল। এটা করতে গিয়েই ওয়াইড ও শর্ট বল দিয়ে ফেলেছে।’

তবে সাইফ উদ্দিনের বোলিংয়ের সাথে তো এর মধ্যে পরিচিত হয়েছেন রাইট। আরো জানেন, মাত্র টিনএজ পেরিয়েছেন বোলার। তাই এমন ঘটনার শিকার হয়ে ভেঙে পড়ার বা হারিয়ে যাওয়ার মতো কিছু দেখছেন না রাইট। প্রতিপক্ষ বোলারের জন্য কার কণ্ঠে সহমর্মীতার সাথে আশার বানী। আর সেটি ইতিহাস টেনে এনে। কারণ ইংল্যান্ড জাতীয় দলে তার সতীর্থ স্টুয়ার্ট ব্রডকে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ৬ বলে ৬টি ছক্কা মেরে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিলেন ভারতের যুবরাজ সিং। সেটি ২০০৭ দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে। ওটাই ছিল ব্রডের ক্যারিয়ারের প্রথম বড় কোন টুর্নামেন্ট। ক্যারিয়ারের শুরুতে এমন মার খাওয়ার পরও সেই ব্রড পরে দলের সেরা বোলার হয়ে উঠেছেন। ইতিহাস বলছে, তিনি ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা বোলার। এখনও দলে অপরিহার্য।

তাই সাইফ উদ্দিনকেও ব্রডের জীবন এবং তার সাথে ঘটে যাওয়া পরপর দুই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে বললেন রাইট, ‘এটা থেকে তার (সাইফ উদ্দিন) শিক্ষা নেওয়া উচিত। এটা ভালো অভিজ্ঞতা হতে পারে। তার নেটে যাওয়া উচিত এবং নিয়মিত স্কিল অনুশীলন করা উচিত। এটাই ক্রিকেট। সে আজকে শুরুতে খুবই ভালো বল করেছে। আমার মনে হয় সে আরও শক্তিশালী ভাবেই ফিরে আসবে। সে খুব ভালো একজন বোলার।’

তার মানে, ক্রিকেটে এমন ঘটনা ঘটতেই পারে। আল-আমিন ও রাইট তো একই সুরে সেটাই প্রমাণ করতে চাইলেন। ব্যাট করলেন দুর্ভাগা সাইফ উদ্দিনের হয়ে। আর টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও স্বাভাবিক। তবু কথা থাকে। অল্প দিনের ব্যবধানে পর পর দুইবার এমন পরিস্থিতিতে পড়াটা নিশ্চয়ই ভাবিয়ে তুলবে সাইফ উদ্দিনকে। জাতীয় দলের টিম ম্যানেজমেন্টকেও বটে। বিশেষজ্ঞরা মানেন, এতে মানসিক আঘাতটাই হয়তো বড় হয়ে দাঁড়াতে পারে। অবশ্য ভবিষ্যতে এমন ভয়বহতার শিকার যাতে না হতে হয় তার জন্য ব্যবস্থাপত্র নেওয়া তো জরুরি। এটা ঠিক, ঘটতেই পারে। তারপরও। সাইফ উদ্দিনের তাবুতেই আছেন সেরা একজন। কোচ সালাহউদ্দিন। পরের ম্যাচেই হয়তো এই চ্যাম্পিয়ন কোচ দারুণ ভাবে ফিরে আসার পথ নির্দেশিকা দিয়ে মাঠে পাঠাবেন টগবগে শিষ্যকে। যে মানুষটি এই মুহূর্তে বড় নাজুক অবস্থায়!

আরটি/ক্যাট

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad