'আমরা দুর্বল হলে নারী ক্রিকেট তো বডি বিল্ডাররাই খেলতো!'

ঢাকা, বুধবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৭ | ৩ কার্তিক ১৪২৪

'আমরা দুর্বল হলে নারী ক্রিকেট তো বডি বিল্ডাররাই খেলতো!'

রামিন তালুকদার ৭:৩৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৭, ২০১৭

print
'আমরা দুর্বল হলে নারী ক্রিকেট তো বডি বিল্ডাররাই খেলতো!'

জাহানারা আলম। বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের পোস্টার গার্ল। ফাস্ট বোলার হিসেবে মাঠে যেমন আগ্রাসী, হিসেবী, ব্যক্তি জীবনেও হাসিখুশী একজন মানুষ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের নারী পেসার বলতে সবার আগে জাহানারারই নাম। গেল টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের অধিনায়ক ছিলেন। এখন নন। প্রতিনিয়ত আরো শাণিত হয়ে ওঠা ২৪ বছরের মেধাবী ফ্যাশনেবল জাহানারার বিশেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রামিন তালুকদার। জাহানারার কষ্ট, চলমান নারী বিশ্বকাপে যে তাদেরও খেলার কথা ছিল!

পরিবর্তন : এমন একটা বয়সে আপনি দাঁড়িয়ে যেটিকে নারী পেস বোলারদের জন্য আদর্শ বলা যায়। নিজের সেরাটায় কি এখনো পৌঁছাতে পেরেছেন বলে মনে হয়?

জাহানারা : এটা বিচার করা আসলে খুব কঠিন। তবে আমি এটুকু বলতে পারি আগে যে টুর্নামেন্ট খেলতাম তা থেকে এখন অনেক এগিয়ে আসছি। আমার কাছে মনে হচ্ছে আগের চেয়ে ভালো। ২০১৬ বিশ্বকাপে আমি আমার গতি মেপেছিলাম। ঘণ্টায় ১২০ কিমি বেগে বল করতে পেরেছি। আর গড় ছিল ঘণ্টায় ১১৭/১১৮ কিমি। এরপর আর মাপা না হলেও মনে হচ্ছে আগের চেয়ে এখন ভালো অবস্থায় আছি। টুর্নামেন্ট না হলে এটা বোঝা মুশকিল।

পরিবর্তন : আপনার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সেরা পারফরম্যান্স গত বিশ্বকাপ বাছাইয়ে, ফেব্রুয়ারিতে। ৩ উইকেট ২১ রানে। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে। মাঝে লম্বা সময় কিন্তু খুব ভালো বল করলেও উইকেট তেমন পাননি। এসবের কারণ কি হতে পারে?

জাহানারা : এমনিতেই আমরা আন্তর্জাতিক ম্যাচ কম পাই, তার উপর আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেট অনেক কম হয়। দেখা যায় বছরে একটা বা দুইটা ঘরোয়া আয়োজন হয়। বাকি সময়টায় অনুশীলন করা খুব কঠিন হয়ে যায়। আমাদের এখানে অনুশীলনের সব সুবিধা আছে। তবে কোনো একটা টুর্নামেন্ট সামনে রেখে যে অনুশীলনটা থাকে তা আসলে নিজে নিজে হয় না। যা হয় তা নিজেকে ধরে রাখা। এটা আসলে একটা লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

পরিবর্তন : পুরুষ ক্রিকেটাররা অনেক সুযোগ সুবিধা পায়। আপনাদের কি নিজেদের বঞ্চিত লাগে? আপনারাও তো জাতীয় দলের সদস্য।

জাহানারা : আসলে সুযোগ সুবিধা সবই আছে আমাদের। আমার যখন ইচ্ছা অনুশীলন করতে পারি। তবে নানা কারণে সব হয়ে ওঠেনা। ধরেন বৃষ্টির সময়ে মাঠে অনুশীলন করা আর যায় না। কিন্তু ইনডোর আছে। চাইলে করা যায়। যেটা হচ্ছে একটা লক্ষ্য থাকলে একটা তাড়া থাকে নিজের। টুর্নামেন্ট থাকলে এ তাড়াটা থাকে। কিন্তু সামনে যদি কোনো টুর্নামেন্ট না থাকে তাহলে মনে হবে যে দুই তিন বিশ্রাম নেই। পরে আবার করবো।

পরিবর্তন : এই মুহূর্তে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে কি কি সমস্যা আপনি দেখেন? সেগুলো কিভাবে দূর করা যায়?

জাহানারা : আমাদের যখন প্রিমিয়ার লিগ হওয়ার কথা ছিল তখন ছেলেদের লিগ শুরু হয়ে গেলো। এরপর আমাদের লিগটা শুরু হওয়ার কথা ছিল কিন্তু তখন হঠাৎ জাতীয় লিগ শুরু হলো। এখন আমাদের প্রিমিয়ার লিগ হবে। সামনে যেহেতু আন্তর্জাতিক ম্যাচ নেই আমাদের ঘরোয়া টুর্নামেন্টে জোর দিতে হবে। আমাদের তিনটা টুর্নামেন্ট হয়, এর সঙ্গে আর দুইটা বাড়ানো গেলে ভালো হবে। পাঁচটা টুর্নামেন্ট হলে আপনার পাইপলাইনে খেলোয়াড় তৈরির জন্য যথেষ্ট। তখন আমরা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভালো ফলাফল আশা করতে পারি। তবে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আন্তর্জাতিক ম্যাচই। এর সঙ্গে ঘরোয়া ক্রিকেটের সঙ্গে মিলবে না। আরও বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে পারলে ভালো হয়। অভিজ্ঞতা বাড়বে। আমরা আসলে অভিজ্ঞতায় অনেক পিছিয়ে।

পরিবর্তন : আপনার ইকোনোমি রেট খুব ভালো। কিন্তু সেই হিসেবে উইকেট নেওয়ার রেটটা অতো উজ্জ্বল নয়। ২৯ ম্যাচে ২৫ উইকেট। নতুন বলে ভালো পেস বোলিং পার্টনার সেভাবে পান না বলে এমনটা হয় কি?

জাহানারা : আমি যখন বোলিং করি তখন সম্পূর্ণ আমি আমার চরিত্রে ঢুকে যাই। তখন আমার কাজ থাকে কিভাবে আমার ওভার শেষ করবো এবং ভালোভাবে। দেখা যায় আমি একটু আঁটসাঁট বোলিং করেছি। এতে আমার পার্টনার উইকেট পেয়েছে হয়তো সে একটু বেশি রান দিয়েছে। আমি চাপ তৈরি করেছি ও উইকেট পেয়েছে। ক্রিকেট দলীয় খেলা দল এতে লাভবান হয়। এতেই আমি খুশি। এমনকি ঘরোয়া ক্রিকেটেও এমন হয়। আমাকে ব্যাটাররা একটু দেখেই খেলে ফলে আমি অনেক ভালো বল করে রান কম দিলেও উইকেট অনেক কম থাকে। দেখা যায় অন্যকেই বাজে বল করেও উইকেট পায়। আমার বলে কেউ যদি পরাস্ত হয় তাহলে আমার খুব খুশি লাগে। আমি ডটের জন্য বল করি উইকেটের জন্য না। আমি ভালো বল করলে আমার পার্টনারও উৎসাহিত হয়। তখন দুই প্রান্তে ভালো বল হলে ব্যাটসম্যানদের টিকে থাকার কোন রাস্তাই থাকে না। এটাই বোলিং পার্টনারশিপ।

পরিবর্তন : নিজের বোলিংয়ের কোন দিকটাকে আপনার শক্তিশালী মনে হয় এবং প্রতিপক্ষরা আসলে আপনার কোন দিকটিকে ভয় পায়?

জাহানারা : আমার অস্ত্র যদি আমি জানিয়ে দেই তাহলে তো সতীর্থরা জেনে যাবে। হয়তো জানে। তবে জানা এক ব্যাপার আর নিজে থেকে বলে মনে করিয়ে দেওয়া আরেক  ব্যাপার। তারপরও বলছি আমার নতুন বলের আউটসুইংটা খেলা একটু কঠিন। পুরাতন বলে ভালো রিভার্স সুইং হয়। ২৫/৩০ ওভারের পর থেকেই আমি রিভার্স সুইং পাই। আর ওইখান থেকে আমি আউটসুইংও করাতে পারি। আর আমার অফ কাটারটাও খুব ভালো পারি। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমার অনেক উইকেট আছে।

পরিবর্তন : বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা বেশিদিনের নয়। আর বাংলাদেশ ম্যাচ খেলে বেশ বিরতি দিয়ে দিয়ে। এই যে অনেকদিন পর পর ম্যাচ খেলার সুযোগ পান, সেটি কি নিয়মিত খুব ভালো পারফর্ম করার ক্ষেত্রে বড় বাধা কি না?

জাহানারা : দেখুন পারফরম্যান্স এখানে আপডাউন হবেই। আমরা যাদের সঙ্গে খেলতে যাই দেখা যায় আমরা ছয় মাসে একটা টুর্নামেন্ট খেলি তারা খেলে ছয়টা টুর্নামেন্ট। তারা ক্রিকেটে থাকে ফলে অভিজ্ঞতা হয়। রানেও থাকে, ধারাবাহিকতা থাকে। সেখানেই আমরা পিছিয়ে যাই। এর জন্যই আমাদের ব্যাটিং ভেঙে পরে। এমনকি বোলিং এবং ফিল্ডিং যেটা আমাদের শক্তির জায়গা তাতেও পিছিয়ে পড়ি।

পরিবর্তন : আপনাদের দলের দুর্বলতা হিসেবে ব্যাটিংকে বলা হয় সবসময়। কি কারণে এই দুর্বলতা দূর করা যাচ্ছে না?

জাহানারা : মূল কারণ উইকেটের সঙ্গে সম্পর্কটা। আগেই বললাম ধারাবাহিকভাবে না খেলা। অনেক দিন পর পর খেলছি আর প্রতিপক্ষ নিয়মিত খেলছে। তাদের যে আত্মবিশ্বাসটা থাকে আমাদের তেমনটা থাকেনা। আসলে এখানে মূল পার্থক্যটা ওই অভিজ্ঞতাই। পাকিস্তানের কথা দেখেন একসময় মনে হতো ওরা আমাদের নিচে আছে। এখন ওদের আসে পাশেই আমরা যেতে পারিনা। শ্রীলঙ্কাকে আমরা বারবার হারিয়েছি। এখন উল্টো ওদের কাছে বারবার হারছি আমরা। একটাই কারণ ওরা অনেক ম্যাচ খেলে। বিশ্বকাপে দেখেন ওদের তিন চারটা খেলোয়াড়ই খেলে। ওদের যে বোলিং বিভাগ আমাদের কাছে তা কিচ্ছু না।

পরিবর্তন : ফিটনেসের ঘাটতির কোনো ব্যাপার নয় তো?

জাহানারা : ছয় মারতে কিন্তু শারীরিক শক্তি অনেক দরকার হয়না। তাহলে বডি বিল্ডারই খেলতো। এটা একটা কম্বিনেশন। আপনার শক্তিশালী খেলোয়াড়ের পাশাপাশি ভালো মেধা ও স্কিলের দরকার। টেকনিক আর টেকটিস তবে সঙ্গে শক্তিরও দরকার হয়। এটা আসলে সব মিলিয়েই হয়। আমার কাছে মনে হয় ফিটনেসের ঘাটতির কারণে এটা হয় না। অভিজ্ঞতার অভাবটাই মুখ্য। তবে আমি অবশ্যই বলবো আমাদের ফিটনেস আরও ভালো করতে হবে। এটা স্বীকার করি যে ফিটনেসে আমরা একটু পিছিয়ে আছি।

পরিবর্তন : দল হিসেবে বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোন অবস্থায় আছে?

জাহানারা : আমার মনে হয় আমাদের দলটা বিশ্বকাপে খেলার মতো অবস্থায় ছিল। সেক্ষেত্রে সেরা আটের মধ্যে থাকা উচিত ছিল। আমাদের জায়গায় এখন শ্রীলঙ্কায় আছে। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। আমরা আমাদের প্রাপ্যটা আদায় করে নিতে পারেনি।

পরিবর্তন : বিশ্বকাপ বাছাই তার আগে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে দেখা গেছে এই যে বিশ্বকাপ খেলছে যে ৮টি দল তাদের সাথে বাংলাদেশের অনেক পার্থক্য। তাদের সাথে বাংলাদেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারে না। কি কি কারণে এমনটা হয়?

জাহানারা : আপনি যদি ভারতের নারী দলের দিকে তাকান। ওদের দল কিন্তু এতো উন্নত কখনোই ছিলোনা। দুই তিন বছর আগেও ওরা অনেক হেরেছে। আজ তারা ইংল্যান্ডের মাটিতে ইংল্যান্ডকে হারিয়েছে খুব সহজেই। যারা যে কয়টা ম্যাচ খেলেছে ভালোভাবেই জিতেছে। আসলে আমাদের ম্যাচ খেলতে হবে। ম্যাচ না খেললে কখনোই সম্ভব না। শুধু ভিডিও সেশন দেখে একটা দলের বিপক্ষে ভালো করা কঠিন। খেলতে খেলতেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা আমরা ভালো করতে পারবো।

পরিবর্তন : একটু পেছনে তাকালে দেখা যায় ওয়ানডে মর্যাদা পাওয়ার পর পুরুষ জাতীয় দল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুরুর দিকে যে অবস্থায় ছিল আপনারা নারী দলও তেমন অবস্থায় এখন। আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ডের সাথে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দক্ষিণ আফ্রিকাকে ঘরের মাটিতে হারিয়ে দেওয়া...এই পর্যন্তই। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে পুরুষ দল দ্রুত উন্নতি করেছে। আপনাদের সেই উন্নতির পথটা সত্যিকার অর্থে কি তৈরি হচ্ছে?

জাহানারা : পথতো খোলাই। সঠিক পথটা চিনে নিতে হবে। সামনে ২০২১ সালে বিশ্বকাপ আছে ওইটা আমাদের খেলতেই হবে। তাহলে চার বছরের মধ্যে আমরা একটা ভালো র‍্যাঙ্কিংয়ে আসতে পারবো। আগামী বছরই টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব আর এ বছরই টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস আমরা এটা খেলতে পারবো। আর এ পথ আমাদের নিজেদের করে নিতে হবে। ছেলেদের দলে দেখেন পাঁচ সাতশত খেলোয়াড় আছে। কিন্তু আমাদের দেখবেন ৩০টাও ভালো খেলোয়াড় নেই। আমাদের অনেক ঘরোয়া টুর্নামেন্ট আরও বাড়াতে হবে। পেছনে কেউ একজন এসে বলবে তুমি সরে দাঁড়াও আমি আছি তখন পারফরম্যন্সের ক্ষুধা বেড়ে যাবে। তখন আপনি পারফরম্যান্স করতে বাধ্য। আর সবার পারমরফ্যান্স ভালো হলে দলের ফলাফলও ভালো হবে।

পরিবর্তন : আপনার স্বপ্নপুরণের পথে কি বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট আছে? আপনার চোখে বর্তমানে কোন অবস্থায় আছে, কাছাকাছি ভবিষ্যতে এই দেশের নারী ক্রিকেট কোথায় পৌঁছতে পারে বলে মনে হয়।

জাহানারা : আমি প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী। আমি চার বছর আগেও এ কথাই বলেছি। এখনো আমার কথার কোন পরিবর্তন হয়নি কারণ আমি নিজেকে যতটা বিশ্বাস করি তার চেয়ে বেশি বাংলাদেশ দলকে বিশ্বাস করি। আমার বিশ্বাস এ দল র‍্যাঙ্কিংয়ে পাঁচে আসার মতো। এর জন্য আসলে সুযোগ করে দিতে হবে। আপনাকে যদি জোনটা তৈরি করে না দেওয়া হয় তাহলে কিন্তু মনের মতো কাজ করতে পারবেন না। আজকে আমরা একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়ে যাবো। ভবিষ্যতে যারা আসবে তারা হয়তো এটাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে ভারত দলের মতো। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমরা আসতে পারবো একটা ভালো অবস্থানে।

আরটি/ক্যাট

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad