‘বাংলাদেশ যে কোন দলকে হারানোর ক্ষমতা রাখে’

ঢাকা, সোমবার, ২৬ জুন ২০১৭ | ১২ আষাঢ় ১৪২৪

‘বাংলাদেশ যে কোন দলকে হারানোর ক্ষমতা রাখে’

রামিন তালুকদার ৯:৩১ অপরাহ্ণ, মে ১০, ২০১৭

print
‘বাংলাদেশ যে কোন দলকে হারানোর ক্ষমতা রাখে’

শাহরিয়ার নাফীস, বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক উজ্জ্বল তারকার নাম-এক আক্ষেপের নাম। বাংলাদেশ দলে এক সময় ছিলেন প্রাণ ভোমরা। ভবিষ্যৎ অধিনায়কও ভাবা হতো তাকে। তবে কালের স্রোতে এখন তিনি ব্রাত্যই হয়ে গেছেন জাতীয় দলে। তবে চলতি বছরে ব্যাট হাতে দারুণ উজ্জ্বল বাঁহাতি নাফীস। গেল মার্চে শেষ হওয়া চার দিনের ঘরোয়া ফার্স্টক্লাস আসর বিসিএলে ছিলেন তৃতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। চলতি ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগেও রান পাচ্ছেন তিনি। প্রাইম দোলেশ্বরের হয়ে ৮ ম্যাচে ৩৬ গড়ে ২৫২ রান করেছেন এরই মধ্যে। দোলেশ্বরের হয়ে অনুশীলন করার ফাঁকে পরিবর্তন ডট কমের ক্রীড়া প্রতিবেদক রামিন তালুকদারের মুখোমুখি হয়েছিলেন নাফীস। জানিয়েছেন নিজের দুঃখ, কষ্ট ও আক্ষেপের কথা। কথা বলেছেন নিজের ব্যাটিং ও ফিটনেস নিয়ে। পাশাপাশি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে বাংলাদেশের সম্ভবনার বিষয়টিও উঠে এল তার কথায়। সাক্ষাৎকারের উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরা হলো পরিবর্তনের পাঠকদের জন্য।

পরিবর্তন: কেমন আছেন?

নাফীস: আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভালো আছি, সুস্থ আছি। প্রিমিয়ার লিগ চলছে, একজন খেলোয়াড় হিসেবে যেহেতু খেলার মধ্যে আছি। খুব ভালো যাচ্ছে।

পরিবর্তন: প্রিমিয়ার লিগ খেলছেন। কী লক্ষ্য নিয়ে এবার মাঠে নেমেছেন?

নাফীস: প্রিমিয়ার লিগে আমাদের দলগত লক্ষ্য সুপার লিগ নিশ্চিত করা। আর পাশাপাশি আমার ব্যক্তিগত লক্ষ্য হচ্ছে দলের জয়ে অবদান রাখা।

পরিবর্তন: গত তিন চার বছর ধরেই ঘরোয়া আসরগুলোতে দারুণ ব্যাটিং করছেন তা যে পরিসরের ক্রিকেটই হোক না কেন, আপনার ব্যাট কথা বলছেই এমন ব্যাটিংয়ের পেছনের গল্পটা যদি একটু বলতেন? ব্যাটিং নিয়ে আসলে কি কাজ করেন?

নাফীস: যেহেতু আমি একজন পেশাদার খেলোয়াড় তাই চেষ্টা করি খেলাটা খুব সিরিয়াসলি খেলার ও কঠোর পরিশ্রম করার। আমার জন্য পরিশ্রমটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিন চার বছর থেকে আমি জাতীয় দলের বাইরে তারপরও পরিবার আমাকে যথেষ্ট সমর্থন করছে।  পাশাপাশি ফাহিম (নাজমুল আবেদীন ফাহিম) স্যার আমার ব্যাটিংয়ে অনেক সাহায্য করছেন। বিসিবির যে ফিটনেস ট্রেনার ও ফিজিও আছে তারাও অনেক সাহায্য করছে। আমিও অনেক কঠোর পরিশ্রম করছি। আমি চাচ্ছি ভালো খেলে যেন খেলাটাকে ছেড়ে আসতে পারি, খেলা যেন আমাকে ছেড়ে না দেয়।

পরিবর্তন: ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ফিটনেসটাও আপনার দারুণ দিন দিন যেন আরও তরুণ হয়ে উঠছেন ফিটনেস নিয়ে বাড়তি কোন কাজ করছেন?

নাফীস: এখন আমার যত বয়স তাতে ফিটনেস ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। আমার এখন ৩২ চলছে, হয়তো ক্রিকেটীয় দিক থেকে চিন্তা করলে খুব বেশি না। তবে আমাকে এখন প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে ২০/২১ বছরের ছেলেদের সঙ্গে। আমি যখন ১০/১২ বছর আগে জাতীয় দলে ঢুকেছি তখন হয়তো তারা মাত্র ব্যাট হাতে নিয়েছে। তাদের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে আমাকে ফিটনেস ধরে রাখতে হবেই। এখন ব্যাটিং অনুশীলনের চেয়ে ফিটনেস নিয়ে বেশি কাজ করি। আমার যে স্কিল ও অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে ফিটনেসটা ধরে রাখতে পারলে দলকে শতভাগ দিতে পারবো। মাঠে অবশ্যই ২০/২১ বছরের ছেলেদের মত ক্ষিপ্র থাকতে হবে। ওইটাই চেষ্টা করছি।

পরিবর্তন: দীর্ঘদিন থেকে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলছেন, প্রায় ১৮ বছর এতো বছরে কী পরিবর্তন দেখলেন ঘরোয়া ক্রিকেটে?

নাফীস: ঘরোয়া ক্রিকেটে পারফরম্যান্সতো অনেক উন্নতি হয়েছে। যখন শুরু করেছি তখন পুরো মৌসুমে দেখা যেত যে দুইটা শতরান। এখন প্রায় প্রত্যেকটা ম্যাচেই দেখা যাচ্ছে ১/২টা করে শতরান হচ্ছে। আগে দেখা যেত একজন বোলার ডমিনেট করছে, এখন দেখা যায় ৫/৭ জন বোলার ডমিনেট করছে। আগে দুইটা মাঠে খেলতাম, এখন ৪/৫টা মাঠ হয়েছে। সার্বিকভাবে অনেক এগিয়েছে বাংলাদেশ। আমার বিশ্বাস সঠিকভাবে পরিচালনা করা যায় বাংলাদেশ ক্রিকেট আরও এগিয়ে যাবে।

পরিবর্তন: আগামী জুনে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে খেলবে এই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির একটি আসরে আপনার সুখস্মৃতি আছে সেঞ্চুরি করেছেন, এখন পর্যন্ত আপনি এ টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান করেছেন সেই অনুভূতির কথাটা একটু যদি বলতেন?

নাফীস: চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সে আসরটা আমার জীবনের প্রথম বড় টুর্নামেন্ট। ওইখানে গিয়ে ভালো খেলতে পারা এখনও আমার জন্য অনুপ্রেরণার। ওই বয়সে, যখন আমার কোন অভিজ্ঞতা ছিলনা। এখন আমি অনেক পরিণত। আল্লাহর রহমতে খেলাটা এখন অনেক বুঝি। তখন যদি পারি এখন যেই লেভেলেই খেলিনা কেন আমি পারব। এই বিশ্বাসটা কাজ করে। আর আমি এটাও বিশ্বাস করি, আমি যখন পেরেছি এখনকার খেলোয়াড়রা আরও ভালো করবে। কারণ তারা আমার তুলনায় অনেক বেশি প্রতিভাবান, অনেক বেশি স্কিলফুল।

পরিবর্তন: একটা দীর্ঘ বিরতির পর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে খেলবে বাংলাদেশ, কেমন করবে বলে মনে করছেন আপনি?

নাফীস: বাংলাদেশ নিজ যোগ্যতায় চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির মূল পর্বে খেলছে। এটা একটা বিরাট ব্যাপার। গত দুই তিন বছর ধরেই দারুণ ক্রিকেট খেলছে বাংলাদেশ। হাথুরুসিংহে, মাশরাফি ও বিসিবির দারুণ কম্বিনেশনে বেশ ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে এবার বেশ ভালো ফলাফলই করবে বাংলাদেশ।

পরিবর্তন: আমরা এবার এ টুর্নামেন্টে খেলতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে পেছনে ফেলেছি, যারা কিনা দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এটাকে কিভাবে দেখছেন?

নাফীস: এটা অনেক বড় অর্জন। বাংলাদেশ ক্রিকেট যে প্রতিনিয়ত উন্নতি করছে এটাই তার লক্ষণ। আমাদের এখন সমস্ত সেক্টরে উন্নতি হচ্ছে। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং সবখানেই। শুধু আন্তর্জাতিকে নয়, ঘরোয়া ক্রিকেটেও। কোচিং স্টাফ যারা আছেন, বয়সভিত্তিক দলে কিংবা নিচু লেভেলেও যারা আছেন সবাই অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। সবার সম্মিলিত পরিশ্রমেই আজকে এ অবস্থানে এসেছে। আশা করি এ চেষ্টা অব্যাহত থাকবে এবং যত দিন যাবে তত বাংলাদেশ আরও উন্নতি করবে।

পরিবর্তন: চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে এবার আমাদের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের মত  দল। বাস্তবিক অর্থে তাদের বিপক্ষে আমাদের সম্ভাবনা কতটুকু বলে আপনি মনে করেন?

নাফীস: কন্ডিশনটা কিন্তু একটা ব্যপার। আমরা যে কন্ডিশনে খেলবো সেখানে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের মত দলের বিপক্ষে খেলাটা কঠিন হবে। তবে বাংলাদেশ এখন কোন দলকে ভয় পায় না, যে কোন দলকে হারানোর ক্ষমতা রাখে। সেই বিশ্বাস থেকে আমার মনে হয় বাংলাদেশ ভালো ফলাফল করবে।

পরিবর্তন: তিন প্রতিপক্ষের এক দল অস্ট্রেলিয়া, যাদের আমরা ইংল্যান্ডের মাঠে একবার হারিয়েছি আর তখনকার অস্ট্রেলিয়া ছিল দুর্বার এবার আমরা কি পারবো তেমন কিছু করতে? এছাড়াও ওদের বিপক্ষে আপনার একটা দারুণ সেঞ্চুরি আছে, যদিও টেস্টে সেটা নিয়েও যদি একটু বলতেন?

নাফীস: ওই ইনিংসটা আমার জীবনের সেরা ইনিংস। আমি ওইসময় অনেক রোমাঞ্চিত ছিলাম, অনেক নার্ভাসও ছিলাম। এরকম একটা দলের সঙ্গে খেলতে যাচ্ছি। মাঠে গিয়ে চেষ্টা করছি বল বাই বল খেলা। ছোট বেলায় যখন ১০/১২ বছর বয়স ছিল তখন শেন ওয়ার্নের বোলিং দেখতাম অ্যাশেজে। ওকে যখন ফেস করেছি তখন খুব রোমাঞ্চিত ছিলাম। যখন খুব ভালো মত ফেস করতে পেরেছি, তখন আত্মবিশ্বাসটা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। ওই যে বললাম আমার চেয়ে অনেক ভালো এখনকার খেলোয়াড়রা। আমার বিশ্বাস বাংলাদেশ ভালো ফলাফলই নিয়ে আসবে।

পরিবর্তন: এখনও আপনার অনেক লম্বা ক্রিকেট ক্যারিয়ার আছে তারপরও সম্প্রতি ইমার্জিং টিমস এশিয়া কাপের ফাইনালে আপনি টিভি ধারাভাষ্য দিয়েছেন সেটা দেখেই বলছি ক্যারিয়ার শেষে ধারাভাষ্যকার হওয়ার কোনো ইচ্ছা আছে কিনা?

নাফীস: আমার ইচ্ছা আছে খেলা ছাড়ার পর ক্রিকেটের সঙ্গে থাকার। কোচিং কিংবা ধারাভাষ্য দুইটা অপশন আছে। যেখানে ভালো সুযোগ পাবো সেটাই করবো। ক্রিকেটের সঙ্গে যেহেতু এ দুইটা সম্পৃক্ত তাই এ দুটোতেই থাকবো। অন্য কিছু করার আমার ইচ্ছা নেই।

পরিবর্তন: একটা ভিন্ন প্রসঙ্গ দিয়ে শেষ করি, আপনার ছেলে বড় হচ্ছে, ওকে ক্রিকেটে আনার কি কোনো পরিকল্পনা আছে? ও ক্রিকেট খেলতে কতটা আগ্রহী?

নাফীস: আমাদের পরবর্তী যে প্রজন্ম তারা কিন্তু রোল মডেল পেয়ে বড় হচ্ছে। আমরা যখন ক্রিকেট খেলেছি তখন আকরাম ভাই, বুলবুল ভাই, নান্নু ভাই, দুর্জয় ভাইদের পেয়েছি। আমাদের স্বপ্ন ছিল ঘরোয়া ক্রিকেট খেলবো। উনারা যখন আইসিসি ট্রফি জয় করলেন তখন কিন্তু আমাদের স্বপ্ন বড় হয়েছে। আর এখন আমাদের ছেলেরা ছোট বেলা থেকেই স্বপ্ন দেখে টেস্ট ক্রিকেট খেলবে। তারা চোখের সামনে টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান দেখছে, বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডার দেখছে, তারা অনেক কিছু দেখছে। তাদের অনুপ্রেরণাও অনেক বেশি। আমার ছেলে যদি ক্রিকেট খেলতে চায় তাহলে অবশ্যই তাকে আমি সার্বিকভাবে সহায়তা করবো। তবে বলে কয়ে তো কিছু হতে পারেনা। 

আরটি/এসএইচ

print
 

আলোচিত সংবাদ