চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ নিয়ে হরিলুট!

ঢাকা, বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ নিয়ে হরিলুট!

খোরশেদুল আলম শামীম ১:০৪ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২১, ২০১৭

print
চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ নিয়ে হরিলুট!

চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ নিয়ে চলছে হরিলুট। চাহিদার কাছাকাছি বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকলেও কতটুকু বৈধ গ্রাহকদের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুৎ বিভাগের এক শ্রেণির কর্মকর্তার সাথে অসাধু গ্রাহকদের যোগসাজশে চলছে কোটি কোটি টাকার বিদ্যুৎ চুরি। এই চুরির মাধ্যমে অসাধু কর্মকর্তা ও গ্রাহকরা উপকৃত হলেও সরকার হারাচ্ছে মোটা অংকের রাজস্ব। চুরি করা বিদ্যুতের একটি অংশ বৈধ গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিলে সমন্বয় এবং বাকিটা সিস্টেম লসের নামে দায় সারছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।

.

 

চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য মতে, নগরীতে বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ১ হাজার মেগাওয়াটের মতো। আর উৎপাদিত ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নগরীতে বিতরণ করা হয়। এ পর্যন্ত ১২ দশমিক ৬৩ শতাংশ সিস্টেম লস রয়েছে। রাতে হোকিং করে বেডমিন্টন খেলা, বিভিন্ন সভা-সমাবেশে সরাসরি বিদ্যুৎ ব্যবহার ছাড়াও দৈনন্দিন জীবনে বিদ্যুৎ ব্যবহারে অপচয়ের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।ফলে অনেকটা বেওয়ারিশভাবে জনগণকে বিদ্যুৎ সেবা দিচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। লোকবলের সংকট আর সিস্টেম লসের নামে দায় সারাটা এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার বলে মনে করছেন বৈধ গ্রাহকরা। দৈনন্দিন বসতবাড়ি থেকে শপিংমল আর শিল্প কারখানা পর্যন্ত বিদ্যুৎ চুরির ঘটনা ঘটছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, একটি সংঘবদ্ধ টেকনিশিয়ান বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে আঁতাত করে বিদ্যুৎ বিল ফাঁকি দেওয়ার ফায়দা বুঝিয়ে মিটার টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ চুরি করে। তারা বিদ্যুৎ চুরির কিছু অভিনব কৌশল অবলম্বন করে। প্রথমত, মিটার টেম্পারিং করে বিদ্যুৎ বিল কমিয়ে দেওয়া, বাইপাস লাইন, আন্ডারগ্রাউন্ড বাইপাস লাইন, রাতে হোকিং লাইন আর হুবহু নকল মিটার সংযোজন করেও বিদ্যুৎ চুরি করা হয়। এছাড়াও মিটার রিডারদের ম্যানেজিং কারচুপি তো রয়েছেই। গরমকালে বিদ্যুৎ খরচ বেশি হওয়ায় বিলও বেশি আসে। বিদ্যুৎ বিল নির্ধারণের নিয়মানুসারে, ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ১৪ পয়সা, ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট ব্যবহার করলে ৫ টাকা ৬৩ পয়সা এবং ৪০১ থেকে ৫০০ ইউনিট ব্যবহার করলে প্রতি ইউনিটে বিল আসে ৮ টাকা ৩৬ পয়সা। অর্থাৎ ইউনিট শতক পেরুলেই বিলের হারটাও বেড়ে যাচ্ছে। আর গ্রাহক মিটার রিডারকে ম্যানেজ করতে পারলেই গরমকালে শতক না পেরিয়ে শীতকালে তা সমন্বয় করে দেয়া হয়। আর এই ছোট্ট কারচুপির মাধ্যমে সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকা।

একজন বৈধ সংযোগ গ্রহীতা বলেন, আমার বাসায় বিদ্যুৎ বিলের অবস্থা আমি কিছু বুঝি না। এক মাসে আসে ২০০ টাকা আবার এর পরের মাসে আসে ৮০০ টাকা। মনে হয় বৈধ সংযোগ নিয়ে অপরাধ করেছি। এদিকে নগরীতে প্রায় ২০ হাজার নিষিদ্ধ ব্যাটারি চালিত রিকশা রয়েছে। এই রিকশাগুলোর ব্যাটারি চার্জ দেয়া হয় বিভিন্ন গ্যারেজে। নগরীতে প্রায় হাজারের অধিক এরকম গ্যারেজ রয়েছে। গ্যারেজগুলোতে দৃশ্যমান মিটার থাকলেও রাতে হোকিং বা বাইপাস লাইনের মাধ্যমে ব্যাটারিগুলো চার্জ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া কিছু কিছু বিদ্যুৎ চুরি যেন স্বীকৃতি পেয়েছে। যেমন- শীতকাল এলেই অলিগলিতে ব্যাডমিন্টন খেলার জন্য হোকিং করে লাইন নেওয়া, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, সভা- সমাবেশ ও কনসার্টে অবৈধ সরাসরি বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া হয়।

নগরীর বায়েজিদ শিল্পাঞ্চল ও আতুরার ডিপো এলাকার বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বড় বড় শিল্পকারখানাগুলোতে সুরক্ষিত মাটির নিচ দিয়ে বাইপাস লাইনের মাধ্যমে চোরাই ভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নেয়া হচ্ছে। আর এই সংযোগগুলো দিচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা। সাধারণত এই সংযোগগুলো অপেক্ষমান দূরের ট্রান্সফরমার থেকে নেয়া হয়। আবার কোনো অভিযান পরিচালনা করলে এর আগে এসে লাইন বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে যায় বলে জানা যায়। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন আর বিদ্যুৎ চুরির ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভাগ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু মাঝে মধ্যে লোকবল সংকট ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণে লাইন বিচ্ছিন্ন করার পরও আবার চালু করার দৃষ্টান্ত কম নয়।

বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্র খুলশী অফিসের অধীনে অভিযান পরিচালনার তথ্য মতে, গত এক মাসে ৭টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। তার মধ্যে বিদ্যুৎ চুরির নানা তথ্য উঠে আসে একটি অভিযানে। নগরীর বায়েজিদে কুঞ্জছায়া আবাসিক এলাকার ১নং রোডে নুর নবীকে ৬ লাখ ১৮ হাজার টাকা মামলা করা হয়। তিনি মাটির নিচে গর্ত করে বিদ্যুৎ সংযোগের স্টেশনের মতো করে রিকশা গ্যারেজ, অটো চার্জিং স্টেশন, পানির পাম্পসহ দোকানে অবৈধ সংযোগ দিয়ে আসছিলেন। এছাড়াও একই এলাকায় অবৈধ বাইপাস লাইন নিয়ে মোটর চালাতেন কুঞ্জছায়া আবাসিকের শফিকুর রহমান শফির মালিকানাধীন মা মঞ্জিলে।

ভ্রাম্যমাণ আদালত ৩ লাখ ৫ হাজার টাকা জরিমানাসহ লাইন বিচ্ছিন্ন করে। কিন্তু পরে আদেশ অমান্য করে বাড়ির মালিক আবার লাইন চালু করেছেন বলে জানা যায়। এছাড়া বায়েজিদ এলাকার ইউসুফ মিয়াকে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে জরিমানা করা হয় ৪৯ হাজার ৪২ টাকা। পূর্ব নাছিরাবাদে আরিফুল ইসলামকে সিনিয়র ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে বিদ্যুৎ আইন ৩৯ ধারা অনুযায়ী ৯ লাখ ৫ হাজার ৪০৩ টাকার মামলা করা হয়। এছাড়াও ষোলশহর এলাকার মনজুর মোরশেদকে ১ লাখ ২৮ হাজার ৮১০ টাকা এবং একই এলাকায় সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আইরিন পারভিনের অভিযানে ফকিরাপাড়ার খোরশেদ আলমকে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, আতুরার ডিপো থেকে ষোলশহর পর্যন্ত রেললাইনের দুই পাশে গড়ে উঠা বস্তি, দোকানপাটের বেশিভাগেরই মিটার নেই। থাকলেও একটি মিটার থেকে সংযোগ নিয়েছে অনেকে।একটি চক্র এই সংযোগগুলো দিচ্ছে এবং দোকান ও বস্তিবাসী থেকে প্রতিঘর বা দোকান থেকে ২০০ থেকে ৫০০টাকা নেওয়া হয়। যার একটি অংশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পকেটে যাওয়ার অভিযোগও পাওয়ায় যায়।
নগরীতে মোট ৯ লাখ ১৫ হাজার গ্রাহক রয়েছে। যাদের ৪ ডিভিশনের ৩৬টি সাব-স্টেশনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সেবা দেয়া হয়। একটি সাব-স্টেশন থেকে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়। কিন্তু কোথাও কোথাও একই এলাকায় দুইটি সাব-স্টেশন থেকেও সংযোগ নেয়া হয়। যার একটি সংযোগ অবৈধ। অভিযোগ রয়েছে, নগরীর বন সংরক্ষণ কার্যালয়ের অস্থায়ী বসতি ও কার্যালয়ের সামনে লাইটগুলোর সংযোগ নেয়া হয়েছে স্টেশনরোড সাব-স্টেশন থেকে। অথচ এই কার্যালয়ের বৈধ সংযোগ হলো কাজীর দেউরি সাব-স্টেশনের।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী প্রবীর কুমার সেন বলেন, অন্য জায়গার তুলনায় চট্টগ্রামে সিস্টেম লস অনেক কম। তারপরও এই সিস্টেম লসের পরিমাণ জিরো টলারেন্স করার ক্ষেত্রে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও প্রাপ্ত অভিযোগ ও তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান এবং জরিমানা-মামলাসহ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। অনিয়মের ক্ষেত্রে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

কেএএস/এএল/

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad