সীমান্তে-ত্রাণ সংগ্রহে হারিয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গা শিশুরা

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৭ | ৯ কার্তিক ১৪২৪

সীমান্তে-ত্রাণ সংগ্রহে হারিয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গা শিশুরা

সালেহ নোমান, টেকনাফ থেকে ১০:২৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৭

print
সীমান্তে-ত্রাণ সংগ্রহে হারিয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গা শিশুরা

বাংলাদেশে আসার পথে এবং আসার পর কয়েকশ’ রোহিঙ্গা শিশু নিখোঁজ হয়েছে কিংবা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। মূলত তাড়াহুড়া করে সীমান্ত অতিক্রমের সময় এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে ত্রাণের সন্ধানে বাবা-মায়ের ছুটোছুটির কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। গত তিন সপ্তাহে শুধু কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পের তথ্য কেন্দ্রে এসেছে ১২শ’ জন নিখোঁজের। এদের মধ্যে এখনো খোঁজ মেলেনি কমপক্ষে পাচশ’ জনের। এরকম প্রায় প্রতিটি রোহিঙ্গা বসতিতে হয়তো বাবা-মা খুঁজছেন প্রাণপ্রিয় সন্তানকে কিংবা শিশুরা খুঁজে পাচ্ছে না তাদের শেষ আশ্রয় বাবা-মাকে। নিখোঁজদের ৯০ শতাংশই শিশু।

নিখোঁজ হওয়া শিশুদের বেশির ভাগেরই বাবা-মা ত্রাণের সন্ধানে এদিক-ওদিক যাওয়ার পর ফিরে এসে আর খুঁজে পান না প্রাণপ্রিয় সন্তানকে। আবার কেউ কেউ সীমান্ত পার হওয়ার সময়েই তাড়াহুড়োর কারণে নিখোঁজ হয়ে যায়।

সাজেদা বেগম নামের এক রোহিঙ্গা নারী গুলিবিদ্ধ স্বামীসহ প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পারলেও নাফ নদী পার হওয়ার সময় হারিয়ে ফেলেছেন আদরের দুই সন্তানকে।

এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘আমি নৌকায় উঠার সময় ছেলে দুটি নদীর পাড়ে ছিল। এরপর তাড়াহুড়া করে নৌকা ছেড়ে দিয়েছে। সেখানকার লোকজন বলেছে পরের নৌকায় আমার ছেলে দুটি তুলে দেবে। কিন্তু এখনো তাদের খোঁজ পাইনি।’

কুতুপালং নিবন্ধিত ক্যাম্পের প্রবেশমুখের ঘোষণা কেন্দ্র থেকে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটানা শোনা যায় শিশু পাওয়া কিংবা নিখোঁজ হওয়ার ঘোষণা।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঘোষণা কেন্দ্রের টেবিলে বসা দুই শিশু- চার বছরের মোহাম্মদ রিয়াজ আর সাত বছরের হাসিনাকে দেখিয়ে বাবা- মায়ের সন্ধান চেয়ে বারবার মাইকে ঘোষণা দেয়া হচ্ছিল।

এরই মধ্যে পাগল প্রায় রিয়াজের মা ছেনোয়ারা এসে বুকে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে। তিনি বলেন, ‘ত্রাণের জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম অনেকক্ষণ। কিছু চাল আর বিস্কিটের প্যাকেট পাওয়ার পর এসে দেখি ছেলেটা নেই। অনেক খোঁজাখুজির পর এখানে এসে পেয়েছি।’

অপর শিশু হাসিনাকে সাতদিন আগে এক ব্যক্তি দিয়ে যান এই ঘোষণা কেন্দ্রে। এতোদিনেও খুঁজে পাওয়া যায়নি তার অভিভাবককে। বাধ্য হয়ে স্বেচ্ছাসেবক নাজির আহমদ নিজের ঘরে ঠাঁই দিয়েছেন শিশুটিকে।

ঘোষণা কেন্দ্র সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিদিন গড়ে ৫২ জন নিখোঁজের সংবাদ আসছে এই কেন্দ্রে। মূলত রাস্তার পাশে শিশুকে রেখে বাবা-মায়ের ত্রাণের জন্য এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করার কারণে মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যায় শিশুরা।

এরকম প্রায় পাচশ’ জনের কোনো খোঁজ নেই বলে জানিয়েছেন ঘোষণা কেন্দ্রের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান বেসরকারি সংস্থা হ্যান্ডিকেপ ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মাসুদ।

তিনি বলেন, এই পর্যন্ত ১২শ’ নিখোঁজ শিশু ও কিশোরের সংবাদ পাওয়া গেছে। এরমধ্যে সাতশ’ জনকে পাওয়া গেছে যাদেরকে বাবা- মা কিংবা আইনসম্মত অভিভাবকের ফেরত দেয়া হয়েছে।

হয়তো এখানে মানুষের ভিড়ে কোথাও আছে অনেক নিখোঁজ শিশু অথবা কারো সঙ্গে চলে গেছে। হারিয়ে যাওয়া এসব শিশুরা কোথায় আছে আর তাদের ভবিষ্যতইবা কি- এখন এটা বড় উদ্বেগের বিষয়।

এ বিষয়ে জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ বাংলাদেশের চিফ কমিউনিকেশনস অফিসার জিন জ্যাকস সিমন বলেন, ‘হারিয়ে যাওয়া ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া শিশুদের খুঁজে বের করার পাশাপাশি তাদেরকে বাবা-মায়ের কাছে ফেরত পাঠানো এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।’

তিনি বলেন, শরণার্থীদের মধ্যে মানব ও শিশু পাচার একটি স্বাভাবিক ঘটনা। এখানেও সেই রকম আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। তবে এসব শিশু পাচার হয়ে গেছে কিনা তা এখনো নিশ্চিত নয়।

ত্রাণ বিতরণে শৃঙ্খলা না আসা পর্যন্ত এই রকম হারিয়ে যাওয়া শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে ত্রাণ কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফেরাতে শনিবার থেকে মাঠে নামছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

এসএন/এমএস

আরও পড়ুন

রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন ও ত্রাণ বিতরণে সেনাবাহিনী
রোহিঙ্গাদের জন্য ৬ মাসে লাগবে ২০ কোটি ডলার
যুক্তরাষ্ট্র থেকে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি তদারকি করছেন প্রধানমন্ত্রী
রোহিঙ্গা গণহত্যায় দোষী সাব্যস্ত সু চি’র সরকার

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad