টানা ৮ দিন হেঁটে কবরস্থানে রোহিঙ্গা নারীর সন্তান প্রসব

ঢাকা, রবিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ৯ আশ্বিন ১৪২৪

টানা ৮ দিন হেঁটে কবরস্থানে রোহিঙ্গা নারীর সন্তান প্রসব

সালেহ নোমান, টেকনাফ থেকে ৩:১৬ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৭

print
টানা ৮ দিন হেঁটে কবরস্থানে রোহিঙ্গা নারীর সন্তান প্রসব

সহিংসতা শুরুর প্রায় দুই সপ্তাহ পরও মিয়ানমার থেকে দলে দলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসছেন। রাখাইন রাজ্যের বুচিডং থেকে রোববার সন্ধ্যায় উখিয়ার ঠ্যংখালি এসে পৌঁছান রেহানাসহ ২২ রোহিঙ্গা। টানা আট দিন হেঁটেছেন তারা। ঠ্যাংখালি কক্সবাজার টেকনাফ সড়কে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই প্রসব বেদনা ওঠে রেহানার। সঙ্গে থাকা অন্যরা একটু আড়ালে নিলে সেখানেই ঝোঁপের মধ্যে পুত্রসন্তান জন্ম দেন তিনি।

এরপর রেহানা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে নিয়ে যান অটোরিকশাচালক আবুল কাসেম। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রেহানাকে ভর্তি না করে ফেরত দেয়। আবুল কাসেম রেহানাকে আবার নিয়ে আসেন সেই কবরস্থানের কাছে। রাত প্রায় ১২টার দিকে সেখানেই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় রেহানার।

তিনি জানান, বুচিডং থেকে হেঁটে এই পর্যন্ত এসেছেন, বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগের দিন তার স্বামী নুরুল আমিনকে হত্যা করেছে বর্মি সেনারা। বাকি স্বজনরা কে কোথায় আছে তা তিনি জানেন না। এখন কি করবেন তাও বুঝতে পারছেন না রেহানা। স্বামী হারা সদ্যজাত সন্তানের মা নিজ দেশ থেকে পালিয়ে এসে পড়লেন আরেক সংকটে। যেন ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুন!

রেহানার সঙ্গে দুই বছর বয়সী আরেকটি পুত্র সন্তান আছে। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন আরও এক মহিলা। আফছি বেগম পরিচয়দানকারী ওই মহিলা জানান, তারা এক সঙ্গে বাংলাদেশে এসেছেন। দলের অন্য সবাই যে যার মত চলে গেছেন কিন্তু তিনি অসুস্থ রেহানাকে ছেড়ে যেতে পারেননি।

শেষ পর্যন্ত অটোচালক আবুল কাসেম রেহানা, তার সন্তান এবং আফছি বেগমকে পাশের এক বাড়িতে আশ্রয় দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে রেখে যান। 

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযান ও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের হামলায় রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা গর্ভবতী ও শিশুদের পরিস্থিতি ভয়াবহ। পালানোর সময় পথেই অনেক নারী সন্তান প্রসব করছেন। জিরো পয়েন্ট ছাড়াও অনেকে পাহাড়ের জঙ্গলে সন্তান জন্ম দিয়েছেন।

মিয়ানমারের মংডু শহরের ধনবাজার এলাকার বাসিন্দা গর্ভবতী নারী নাফিজা বেগম (২৪) টানা তিন দিন স্বামী আর ছোট ভাইয়ের কাঁধে চড়ে বাংলাদেশ সীমান্তের জিরো লাইনে আসেন। স্বামী জহিরুল ইসলাম ও ছোট ভাই রফিকুলের কাঁধে ভর করে প্রাণঘাতী সীমান্ত পাড়ি দিয়েছেন আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা এই রোহিঙ্গা নারী।

টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল সীমান্তের জিরো পয়েন্টে পরিবর্তন ডটকমের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা হয় নাফিজার পরিবারের। অন্তঃসত্ত্বা নাফিজা বলেন, ‘দীর্ঘ তিন দিন স্বামী আর ছোট ভাইয়ের কাঁধে চড়ে সীমানায় এসেছি। কিন্তু বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে আমাদের।’

তিনি বাংলাদেশে প্রবেশকালে দালালদের দৌরাত্বের কথাও বলেন।

রাখাইন রাজ্যের মংডুর গজিবিল এলাকার খালেদা বেগম (১৮) ও আহমদ উল্যা (২৩) দম্পতি কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন তাদের সদ্য জন্ম নেওয়া যমজ সন্তান নিয়ে। সেখানেও তাদের সঙ্গে কথা হয় পরিবর্তন ডটকম প্রতিবেদকের। জানা যায়, হামলার আগের দিন থেকেই গর্ভপাতের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন খালেদার পরিবার। কিন্তু মিয়ানমার বাহিনীর হামলায় ঘর থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন তারা। পথিমধ্যেই দুই সন্তান জন্ম দেন খালেদ।

পরবর্তীতে নিজেদের জীবন নিয়ে সংশয় থাকলেও টোল-টুপলার সঙ্গে সীমান্ত অতিক্রম করে সদ্যজাত যমজ শিশুদের অতি যত্নে বুকে আগলে ঠিকই বৃহস্পতিবার এ শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন তারা।

উল্লেখ্য, গত ২৪ আগস্ট মধ্যরাতের পর রোহিঙ্গা যোদ্ধারা অন্তত ২৫টি পুলিশ স্টেশন ও একটি সেনাক্যাম্পে প্রবেশের চেষ্টা করলে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়।

এরপর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হেলিকপ্টার গানশিপের ব্যাপক ব্যবহার করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এতে ৩ সহস্রাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম নিহত হয়েছেন। সংঘর্ষে আহত শত শত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু বাংলাদেশে এসেছেন।

মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নে ইতোমধ্যে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। এখনও সীমান্তে প্রত্যেক দিন রোহিঙ্গাদের ঢল নামছে।

ভিডিও...

 এসএন/আরজি

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad