লাউয়াছড়ায় শতবর্ষীসহ অর্ধশতাধিক গাছ কাটার আয়োজন

ঢাকা, সোমবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২০ | ১৪ মাঘ ১৪২৬

লাউয়াছড়ায় শতবর্ষীসহ অর্ধশতাধিক গাছ কাটার আয়োজন

এম ইদ্রিস আলী, মৌলভীবাজার ৭:০৮ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯

লাউয়াছড়ায় শতবর্ষীসহ অর্ধশতাধিক গাছ কাটার আয়োজন

খাদ্য সংকটে জঙ্গল থেকে বন্যপ্রাণীরা যখন প্রায়ই লোকালয়ে বের হয়ে আসছে, তখন তাদের জন্য ফলের নতুন গাছ না লাগিয়ে উল্টো ৫০ বছর থেকে শতবর্ষী গাছের সঙ্গে আমলকি, জারুল, বহেরা, ডুমুরসহ অর্ধশতাধিক ফলের গাছ কাটার আয়োজন চলছে মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের চাউতলী বিটে।

স্থানীয় বন বিভাগ এ কাজ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এর ফলে বনে থাকা উল্লুক, চশমাপরা হনুমানসহ বিরল প্রজাতির ও পৃথিবীজুড়ে মহাবিপন্ন প্রাণীদের খাদ্য ও বাসস্থান আরো হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লাউয়াছড়ার পাশের বিট চাউতলীর আয়তন ৩২ হেক্টর। ১০ বছর আগে এর ১০ ভাগ জমিতে সামাজিক বনায়ন করে বন বিভাগ। লাগানো হয় আকাশমণি ও বেলজিয়াম গাছ। এখন সময় হয়েছে সেই গাছ কেটে উপকারভোগীদের টাকা ফিরিয়ে দেয়ার। সে জন্য ১০ বছর আগে লাগানো সামাজিক বনায়নের গাছ কাটার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু সামাজিক বনায়নের গাছের পাশাপাশি বনের দুর্লভ এবং বন্যপ্রাণীদের খাবারের প্রয়োজনীয় গাছও কাটার জন্য বাছাই করেছে মৌলভীবাজার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ।

যদিও এসব গাছ ৫০ থেকে একশ বছর আগের। এগুলো বনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন্যপ্রাণীরা এ গাছগুলো থেকে খাবার সংগ্রহ করে।

চাউতলী বিট ঘুরে দেখা যায়, সেখানে ফলের গাছসহ বিভিন্ন বিরল প্রজাতির গাছ কাটার জন্য বিশেষ চিহ্ন (লাল নম্বরযুক্ত) দিয়ে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বহেরা, ডুমুর, হরিতকি, আমলকি, জারুল, রিঠা, ডেউয়া, লটকন, কাঠ বাদাম, লুকলুকি, বন উরি, কাউফল, কাটা জামসহ অর্ধশতাধিক ফলগাছ। এসব অনেক গাছেরই বয়স ৫০ থেকে ১০০ বছর। যার ফল খেয়ে বেঁচে আছে বন্যপ্রাণীরা।

এছাড়াও কাটার জন্য বাছাই করা হয়েছে অতি মূল্যবান ধূপ, শতবর্ষী চাপালিক এবং সাতটি বড় বড় লোহা কাঠের গাছ। এসব গাছ অতি মূলব্যান হওয়ায় কাটা হবে বলে জানা গেছে।

উল্লুক, চশমাপরা হনুমানসহ যেসব প্রাণী ফুল-ফল খেয়ে বেঁচে থাকে তাদের খাবারের গাছ এমনিতেই কমে গেছে লাউয়াছড়ায়। ফলে প্রায়ই লোকালয়ে ছুটে আসছে বন্যপ্রাণীরা। তার ওপর এভাবে গাছকাটা হলে বন্যপ্রাণীর খাবারের অভাব আরও তীব্র হবে বলে মনে করেন প্রাণ প্রকৃতি বিশেষজ্ঞরা।

কেন এসব গাছ কাটার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে জানতে চাইলে বন্যপ্রাণী প্রকৃতি ও সংরক্ষণ বিভাগের শ্রীমঙ্গল রেঞ্জ কর্মকর্তা মোনায়েম হোসেন জানান, ‘১০ বছরের রোটেশনে এখন গাছের আবর্তনকাল। তাই গাছ কেটে উপকারভোগীদের টাকা দেয়া হবে। উপকারভোগীরা এতদিন বাগান রক্ষা করেছে তাদেরকে এখন পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে।’

তবে এ কর্মকর্তা জানান, ‘১০ বছর আগে যখন সামাজিক বনায়ন করার আগে থেকেই সেখানে অনেক গাছ ছিল।’

তাহলে ১০ বছর আগের সামাজিক বনায়নের গাছের সঙ্গে কেন আগের গাছও কাটা হবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বনের উপকারভোগীরা চায় এসব গাছও কাটতে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নেবেন।’

এদিকে লাউয়াছড়ার মতো সংরক্ষিত একটি বনে ৫০ থেকে একশ বছরের গাছ কাটার পরিকল্পনাকে অপরাধ বলে মন্তব্য করছেন পরিবেশবাদীরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ১০ বছর আগে সামাজিক বনায়নের সময় ঠিকমতো টাকা খরচ করেননি তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এখন উপকার ভোগীদের বনায়নের টাকা ফেরত দেয়ার সময় এসেছে। তাই তাদের গাছের সঙ্গে বনের পুরানো গাছও কাটার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে ঝুঁকির মুখে পড়তে চলেছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মূল্যবান প্রাণীজগৎ। সেই সঙ্গে আয়োজন চলছে লাখ লাখ টাকার বনজসম্পদ লুটপাটের পাঁয়তারা।

বন্যপ্রাণী গবেষকরা জানান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান জীববৈচিত্র্য পূর্ণ সংরক্ষিত বন। এখানে উল্লুক, চশমাপরা হনুমান, লজ্জাবতী বানর, উড়ন্ত কাঠবিড়ালিসহ পৃথিবীজুড়ে মহাবিপন্ন নানা প্রাণী রয়েছে। এসব প্রাণী খাদ্যের জন্য সম্পূর্ণ ফলগাছের ওপর নির্ভরশীল। তাই ফলগাছ কেটে ফেললে হুমকিতে পড়বে তাদের অস্তিত্ব।

তারা জানান, এমনিতেই প্রয়োজনের তুলনার ফলগাছের সংখ্যা কমেছে লাউয়াছড়ায়। ফলে প্রায়ই বন্যপ্রাণীরা সেখান থেকে বের হয়ে লোকালয়ে চলে আসে। এ কারণে এ বনে আরো বেশি করে ফলজ গাছ লাগানো দরকার।

এ বিষয়ে নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক (পরিবেশ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ) ড. বিশ্বাস করবী ফারহানা জানান, ‘এসব গাছ কাটা হলে বন্যপ্রাণীরা খাবার এবং বাসস্থানের সংকটে পড়েবে। ছুটে যাবে অন্যত্র। ফলে কিছু প্রাণী মারা যাওয়ারও আশঙ্কা আছে।’

তিনি জানান, ‘ব্যক্তিগত লাভের জন্য এত পুরাতন গাছ কেটে নেয়ার ফলে হুমকিতে পড়বে ন্যাচারাল ইকো সিস্টেম। তাই যেকোনোভাবেই হোক এসব গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে। যেসব ফলের গাছ কাটার জন্য প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে তার সবই বন্যপ্রাণীদের খাবারের জন্য দরকারি। খাবারের অভাব থাকলে বন্যপ্রাণীরা বন থেকে বের হয়ে লোকালয়ে চলে আসতে পারে।’

সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ) আব্দুল ওয়াদুদ পরিবর্তন ডটকমকে জানান, ‘বিষয়টি জানার পর ফলের এবং পুরাতন গাছ কাটার বিষয়টি বাতিল করে দেয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এসব গাছ রক্ষা করা হবে। তবে সামাজিক বনায়নের আওতায় লাগানো আকাশমণি ও বেলজিয়াম গাছগুলোকে কাটা হবে।’

এইচআর

 

চট্টগ্রাম: আরও পড়ুন

আরও