এনু-রূপনের ৫ সিন্দুকে ২৭ কোটি টাকা!
Back to Top

ঢাকা, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২০ | ১৫ চৈত্র ১৪২৬

এনু-রূপনের ৫ সিন্দুকে ২৭ কোটি টাকা!

প্রীতম সাহা সুদীপ ৩:১২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২০

এনু-রূপনের ৫ সিন্দুকে ২৭ কোটি টাকা!

পুরান ঢাকার চিরচেনা অন্য অলিগলির মতোই সরু নারিন্দার এই গলিটি। গলির ভেতর ঢুকেই ১১৯ লালমোহন সাহা স্ট্রিটের একটি ছোট্ট পাঁচ তলা বাড়ি। বাড়িটির নিচতলার ফ্ল্যাটেই টাকার গোডাউনের সন্ধান পায় র‌্যাব। ছোট্ট ওই বাসাটিতে আসবাবপত্র বলতে ছিল শুধু মাত্র একটি চৌকি।

ফ্ল্যাটটির চারটি কক্ষের মধ্যে তিনটি কক্ষ থেকে পাওয়া গেল পাঁচটি লোহার সিন্দুক। সিন্দুকের ভেতর থরে থরে সাজানো এক হাজার টাকার নোটের বান্ডিল। টাকা গণনার যন্ত্র এনে বান্ডিলগুলো গণনা করে দেখা গেল নগদ ২৬ কোটি ৫৫ লাখেরও বেশি টাকা। এছাড়াও ৫ কোটি ১৫ লাখ মূল্যমানের এফডিআর, এক কেজি সোনা, ৯ হাজার ৩০০ ইউএস ডলার, ৫ হাজার ৩৫০ ভারতীয় রুপি, এক হাজার একশ’ ৯৫ চীনের ইয়েন, এক হাজার ৫৬০ থাই মুদ্রা, একশ’ ইউএই দিরহাম উদ্ধার করা হয়। জব্দ করা হয় কিছু ক্যাসিনো সামগ্রীও।

র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সোমবার গভীর রাতে ১১৯ লালমোহন সাহা স্ট্রিটে ওই বাড়িতে অভিযান শুরু হয়। বাড়িটি গেন্ডারিয়া ও নারিন্দা এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা দুই ভাই এনামুল হক ও রূপন ভূঁইয়ার। এই বাসাটিকে তারা টাকার গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করতেন।

ক্যাসিনোকাণ্ডে অভিযুক্ত এই দুই ভাই বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর তাদের একাধিক বাসায় অভিযান চালিয়ে পাঁচ কোটি টাকা, সাড়ে সাত কেজি সোনা ও ৬টি অস্ত্র উদ্ধার করেছিল র‌্যাব।

এরপর সূত্রাপুর ও গেন্ডারিয়া থানায় তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও হয়। ক্যাসিনোকারবারি এই দুই ভাইকে গত জানুয়ারি মাসে গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

মঙ্গলবার দুপুরে র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল রকিবুল হাসান বলেন, ২০১৯ সালে শুরু হওয়া দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের চলমান অভিযান এটি। আমরা সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার সময় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এখানে অপারেশন শুরু করি। অভিযানে নগদ ২৬ কোটি ৫৫ লাখ ৬শ’ টাকা পাওয়া গেছে। এছাড়া ৫ কোটি ১৫ লাখ মূল্যমানের এফডিআর, এক কেজি সোনাসহ অনেক বিদেশি মূদ্রাও উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত সবকিছু থানায় জমা দেওয়া হবে। থানা নিয়মানুযায়ী তা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেবে।

টাকার উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, এই টাকা কিসের, তা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে বের করতে হবে। তদন্ত শেষে সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানানো হবে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বংশগত ভাবেই যুগ যুগ ধরে জুয়ার ব্যবসা চালিয়ে আসছে পুরান ঢাকার এই পরিবার। তাদের আদি নিবাস ধোলাইখালের দক্ষিণ মৈশুন্দি। এনু-রূপনের বাবার নাম সিরাজুল হক। তিনি পুরান ঢাকার ধোলাইখালে ছালা দিয়ে বানানো ঝুপড়ি ঘরে জুয়ার আসর চালাতেন।

সিরাজুলের ৬ ছেলের মধ্যে এলাকায় সবচেয়ে প্রভাবশালী চারজন। তারা হলেন- শহিদুল হক, রশিদুল হক ভূঁইয়া, এনামুল হক এনু ও রুপন ভূঁইয়া। 

তাদের মধ্যে এনামুল হক এনু গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আর রুপন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। অন্যদিকে বড়ভাই রশিদুল হক ভূঁইয়া দক্ষিণ মৈশুন্দি আওয়ামী লীগে উঁচু পদে রয়েছেন। শুধু তাই না, রশিদের ছেলে তানিন এবং তাদের আরেক ভাই শহিদুলের ছেলে বাতেনও ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। স্থানীয়দের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করতে অস্ত্র দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করত এই পরিবার।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বংশগত ভাবে জুয়ার বোর্ড চালালেও এই পরিবারটির আগে কোন রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না। টাকার বিনিময়ে রশিদ-এনু-রুপনরা ক্ষমতাসীন দলের পদ বাগিয়ে নেন এবং তাদের জুয়ার ব্যবসা প্রসারিত করতে থাকেন। 

১৯৮৫ সাল থেকে এনামুল ওয়ান্ডার্স ক্লাব ও রুপন আরামবাগ ক্লাবে নিয়মিত জুয়া খেলত। বছর তিন-চার আগে হঠাৎই দুই ভাই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি কিনতে শুরু করে। গড়ে তুলে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও।

ওয়ান্ডার্স ক্লাবে যে ক্যাসিনো পরিচালিত হয়ে আসছিল, তার অন্যতম শেয়ার হোল্ডার ছিলেন এনামুল। অন্যদিকে আরামবাগ ক্লাবের ক্যাসিনোতে শেয়ার ছিল তার ছোটভাই রুপনের।

৩১ নম্বর বানিয়া নগরে এনামুলের ছয়তলা একটি বাড়ি রয়েছে। বানিয়ানগরের এই বাড়ির পাশেই রয়েছে দুই ভাইয়ের নামে স্টিল শোরুম ‘এনু-রুপন স্টিল হাউজ’।

এছাড়া নারিন্দার ১০৬ নম্বর লাল মোহন স্ট্রিট লেনে রয়েছে ‘মমতাজ ভিলা’ নামে এনু-রুপনের বিলাসবহুল ১০ তলা ভবন। পুরো ভবনটি আধুনিক ও অভিজাত নকশায় নির্মিত। ভবনটির প্রতিটি স্থানে দৃষ্টিনন্দন সব কারুকাজ করা হয়েছে।

সেকেন্দার আলী নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা পরিবর্তন ডটকমকে জানান, এই বাড়ি পুরোটাই এনু-রুপন দুই ভাই ব্যবহার করতেন। দোতলা ও তিন তলায় দুই ভাইয়ের রাজকীয় ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া বাকি ফ্ল্যাটগুলো কাউকে ভাড়া দেওয়া হয়নি। এ ফ্ল্যাটগুলোর কয়েকটিতে এনু-রুপনের আত্মীয়-স্বজন থাকেন। তারা মূলত দুই ভাইয়ের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। বাকি ফ্ল্যাটগুলো ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন অফিস হিসেবে।

এনু-রুপনের বড়ভাই রশিদুল হক ভুঁইয়া নারিন্দা জুনিয়র লায়ন্স ক্লাব চালাতেন। সেখানে তিনি নিয়মিত বসতেন। খেলাধুলার আড়ালে এই ক্লাবেও চলতো জুয়ার আসরসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড।

পিএসএস/এসবি

আরও পড়ুন...
নারিন্দায় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান, ২০ কোটি টাকা উদ্ধার
আ’লীগ নেতা এনামুল-রুপনের বাড়িতে মিলল ৫ সিন্দুকভর্তি টাকা

 

বিশেষ আয়োজন: আরও পড়ুন

আরও