শপিংয়ের সময় হাতিয়ে নেয়া হতো এটিএমের পিন নম্বর

ঢাকা, বুধবার, ২৩ মে ২০১৮ | ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫

শপিংয়ের সময় হাতিয়ে নেয়া হতো এটিএমের পিন নম্বর

পরিবর্তন প্রতিবেদক ৪:৫৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৫, ২০১৮

print
শপিংয়ের সময় হাতিয়ে নেয়া হতো এটিএমের পিন নম্বর

সুপার শপ স্বপ্ন’র কর্মচারী হিসেবে কাজ করার সময়ে গ্রাহকের পিন নম্বর চুরি করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন প্রতারক শরিফুল ইসলাম। রাশিয়ায় পড়াশোনা করতে গিয়ে এই ‘বিদ্যা’ শিখে দেশে ফিরে প্রতারণার কাজে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

বুধবার দুপুরে রাজধানীর মালিবাগে অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম।

তিনি বলেন, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে পাঁচটি ব্যাংকে (ব্রাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইবিএল ব্যাংক, ইউসিবিএল ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া) সংঘটিত জালিয়াতির ঘটনা সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের নজরে আনেন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।



সিআইডির অর্গানইজড ক্রাইম তদন্ত করে দেখতে পায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র গ্রাহকেরা যখন সুপার শপ ও ডিপার্টমেন্টাল সেন্টারে যান, তখন সুকৌশলে গ্রাহকদের তথ্য চুরি করে ক্লোন কার্ড তৈরি করে এটিএম বুথ থেকে টাকা চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের একটি দল অভিযান চালিয়ে শরিফুল ইসলামকে গ্রেফতার করে। প্রতারক শরিফুল সুপার শপ স্বপ্ন’র বনানী শাখায় কাজ করার সময়ে নিজের হাতঘড়ি সংযুক্ত বিশেষ মিনি কার্ড রিডারের মাধ্যমে গ্রাহকের কার্ডের তথ্যাবলি নিয়ে যেতেন। গ্রাহক যখন পিন নম্বর দিত, তখন কৌশলে পিন নম্বর দেখে নিয়ে বিল পরিশোধের পর গ্রাহক চলে গেলে রিপ্রিন্ট দিয়ে কপিটা সংগ্রহ করে তার পেছনে পিন নম্বরটা লিখে রাখতেন।

এরপর শরিফুল তার বাসায় গিয়ে ল্যাপটপ এবং ডিভাইসের মাধ্যমে গ্রাহকের তথ্যাবলি ভার্জিন কার্ড বা খালি কার্ডে স্থাপন করে ক্লোন এটিএম কার্ড তৈরি করে যে কোনো একটি এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নিতেন বলে জানান সিআইডির এই কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, বুথে টাকা তোলার সময়ে সিসি ক্যামেরায় তাকে যেন চেনা না যায় এজন্য শরিফুল পরচুলা, চশমা ব্যবহার করতেন। স্বপ্নে চাকরি করলেও তার মূল পেশা ছিল ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি। এই জালিয়াতির মাধ্যমে আয় করা টাকা দিয়ে তিনি বিলাসী জীবনযাপন করে আসছেন।

মোল্লা নজরুল বলেন, প্রতারক শরিফুল ব্যক্তিগত চলাচলের জন্য একটি টয়োটা এলিয়ন মডেলের গাড়ি ব্যবহার করতেন। তার ব্যাংকের হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে তিনি এই কাজ করে কয়েক কোটি টাকা রোজগার করেছেন।

তিনি বলেন, গ্রেফতার শরিফুল মেহেরপুর জেলার বোয়ালীয়া উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০১ সালে মাধ্যমিক এবং ২০০৩ সালে গাঙনি ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরে তিনি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য রাশিয়া যান। সেখানেই পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনির্ভাসিটি থেকে মাইন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উপরে তিন বছর মেয়াদি ডিগ্রি নিয়ে ২০১০ সালে বাংলাদেশে ফেরত আসেন।

সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, সেখানে পড়াশোনা করার সময়ে তার রাশিয়ান রুমমেট ইভানোভিচের কাছ থেকেই ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির কৌশল শেখেন শরিফুল। পরে তিনি চীন থেকে একটি ক্লোন মেশিন ঘড়িসহ জালিয়াতির সরঞ্জাম সংগ্রহ করেন।

তিনি জানান, দেশে এসেই শরিফুল জালিয়াতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ২০১৩ সালে এই সংক্রান্ত দু’টি মামলা হয়। ওই মামলায় প্রতারক শরিফুল ১৮ মাস জেলে ছিলেন। এরপর কিছুদিন স্টুডেন্ট কনসালটেশন ফার্ম খোলেন। সেখানে তেমন সুবিধা করতে না পেরে আবারও ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

মোল্লা নজরুল বলেন, সুপার শপ, শপিং মলে কিংবা এটিএম কার্ডে টাকা তোলার সময় পিন নম্বর দেয়ার ক্ষেত্রে অন্য একটি হাত দিয়ে ঢেকে রাখা উচিত, যাতে সিসি ক্যামেরা বা অন্য কোনভাবে পিন নম্বর চুরি না হয়।

এর আগে সম্প্রতি সংঘটিত পাঁচটি ব্যাংকের কার্ড জালিয়াতির মূলহোতাকে শরিফুলকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগ।

এসময় তার কাছ থেকে একটি ল্যাপটপ, ১,৪০০ ক্লোন কার্ড, একটি ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ কার্ড রিডার ও রাইটার, তিনটি পজ মেশিন, সচল ডিজিটাল হাতঘড়ি (গ্রাহকদের তথ্য চুরিতে ব্যবহৃত), দু’টি মিনি কার্ড রিডার ডিভাইস, ১৪টি পাসপোর্ট, আটটি মোবাইল সেট, একটি ডাচ-বাংলা ব্যাংকের নেক্সাস ক্রেডিট কার্ড, পরচুলা ও একটি কালো রংয়ের সানগ্লাস এবং তিনটি জাতীয় পরিচয়পত্র উদ্ধার করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার রায়হান উদ্দীন খান, অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মিনহাজুল ইসলাম, অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আসলাম উদ্দিন, রফিকুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার নাজিম উদ্দিন, সহকারী পুলিশ সুপার সুমন কুমার দাস এবং সহকারী পুলিশ সুপার শারমিন জাহান।

এসময় ব্র্যাক ব্যাংকের হেড অব কমিউনিকেশন অ্যান্ড সার্ভিস কোয়ালিটি জারা জাবীন মাহবুব বলেন, কয়েকজন গ্রাহক তাদের মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে জানতে পারেন যে ব্যাংক থেকে কেউ তাদের টাকা তুলে নিয়েছে। তখন তারা আমাদের জানালে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখে তাদের টাকা ফেরত দিয়ে দেই। পরে আমরা বিষয়টি সিআইডিকে জানাই। মার্চ মাসে এ সংক্রান্ত নয়টি অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এমকে/এমএসআআই

 
.

Best Electronics Products



আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad