লাশ টেনে কেটেছে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস

ঢাকা, বুধবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৮ | ১২ বৈশাখ ১৪২৫

লাশ টেনে কেটেছে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস

অচিন্ত্য মজুমদার, ভোলা ৭:১০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০১৮

print
লাশ টেনে কেটেছে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস

স্বধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন দ্বীপ জেলা ভোলায়ও পাকবাহিনী আসতে শুরু করে। এর আগেই হাজার হাজার মানুষ প্রাণভয়ে পাড়ি জমায় ভারতে। বাকিরা আশপাশের শহরতলীতে আশ্রয় নিতে থাকেন। লাখ লাখ শরণার্থীর সাথে ঠাঁই মেলে শতাধিক দলিত পরিবারের। তাদের একজন মানিক লাল ডোম। প্রাণভয়ে আশ্রয় নিয়েও কাজে ফাঁকি দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। অনেকটা বাধ্য করেই তাদের শহরে নিয়ে আসা হয়। এরপর হুকুম হয় লাশ বহন করা এবং মাটি দেয়ার কাজ করার।

ক্যাপ্টেন সাহেবের কাছে বাঙালি মানেই মুক্তিযোদ্ধা। তাই তার সাফ কথা মুক্তিযোদ্ধার লাশ গর্তে ফেলে দেও। কাঁধে লাশ, চোখে জল- সব মিলে একাকার হয়ে যায়। তবুও কাজ করতে হবে গর্ত খোঁড়া আর লাশ মাটিচাপা দেয়া। এভাবেই লাশ টেনে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস কাটে মানিক লালের।

সরেজমিন কথা হয় শহরের বাপ্তা পৌরকোলনির বাসিন্দা মানিক লাল ডোমের সাথে। তিনি জানান, নৌপথ যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হওয়ায় প্রায় প্রতিদিনই গানবোট লঞ্চে পাকবাহিনী যাতায়াত শুরু করে। তাই সারা দেশের মতো ভোলার লোকজন আতংক-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে থাকে। প্রাণভয়ে লাখ লাখ শরণার্থী ভোলার শহরতলীতে আশ্রয় নিতে শুরু করে।

এসময় ভোলায় ডোম কলোনি ছিল বর্তমান গাজীপুর রোডের মহিলা কলেজ মাঠে। সেখানে প্রায় দেড় শতাধিক প্রান্তিক সংখ্যালঘু বসবাস করতেন। পাকিস্তানি আর্মিদের ভয়ে তারাও পালাতে শুরু করেন। ধনিয়া ইউনিয়নের আলগী গ্রামে আশ্রয় নেয় তারা। খুব আদর যত্নেই কাটছিল তাদের। কিন্তু ১০ দিন যেতে না যেতেই পৌর চেয়ারম্যানের তলব আসে। ভয়ের কাছে কাজের রেহাই নেই। আবার সেই কলোনিতে ফিরে আসা। শান্তি কমিটির প্রধান ইলিয়াছ মাস্টারের নির্দেশে যুগীর ঘোল ওয়াবদায় ও নতুন বাজার টাউন হলে পাকিস্তানি আর্মিদের ক্যাম্প পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন মানিক লাল, সুখ লাল, রমেশ লাল, বাবু লাল, মন্টু লাল, লক্ষ্মী রাণী, দুর্গা রানীসহ ১০ জন।

চারদিকে শুধু মৃত্যুর মিছিল আর হত্যাযজ্ঞ। ওয়াবদা পাকবাহিনীর ক্যাম্পে প্রতিদিনই ধরে আনা হতো নিরীহ বাঙালিদের। এরপর চলতো নির্যাতনের স্ট্রিম রোলার। একপর্যায়ে গুলি করে হত্যা করা হতো। সকাল হলেই ডাক পড়তো মানিক লালের। ক্যাপ্টেন সাহেবের কড়া নির্দেশনা। ‘মুক্তি শালেকো লে যা, অর কুয়েমে ডাল দে মুন্না।’ যেখানে হত্যা সেখানেই মানিক লালের তলব। সঙ্গীয়দের নিয়ে কাঁধে করে লাশ আনতে হবে। শহরের পৌর শ্মশানের পাশে একটি গণকবর ছিল। ক্যাম্পের বাইরে যাদের হত্যা করা হতো তাদের লাশ ওই গণকবরেই রাখা হতো। আর ওয়াবদা ক্যাম্পের পেছনের জঙ্গলে ছিল অন্য একটি গণকবর। ক্যাম্পে এনে যাদের হত্যা করা হতো তাদের সেখানে মাটি চাপা দেয়া হতো কোনমতে। শত শত লাশ মানিক লাল কাঁধে করে দুই হাতে মাটিচাপা দিয়েছেন। ক্যাম্পের ক্যাপ্টেন সাহেব তাকে খুব ভালোবাসতেন। তাদের মতই পরিষ্কার উর্দু বলতে পারেন মানিক লাল। তাই খুব শখ করে ক্যাপ্টেন সাহেব তাকে মুন্না বলে ডাকতেন। এই সুবাদে ক্যাম্পে ধরে আনা বেশ কজনের জীবন বাঁচিয়েছেন মানিক লাল। এর মধ্যে রায় মোহন করঞ্জাইয়ের ছেলে প্রশান্ত করঞ্জাই অন্যতম। তাকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে আসার পর যখন নির্যাতন শুরু করে পাক সেনারা। এসময় রুটি আর কলা নিতে মানিক লালকে ভেতরে ডাকে ক্যাপ্টেন। তখন প্রশান্ত করঞ্জাইকে দেখে মানিক চিনতে পারেন। আপনি এখানে বাবু- প্রশান্তকে জিজ্ঞেস করেন তিনি। তখন ক্যাপ্টেন জানতে চায় ইছকো পেহেচানো (ওকে চিন তুমি)। তখন মানিক বলে চিনি স্যার। আচ্ছা আদমি। ক্যাপ্টেন বলে “শালে মুক্তি”। তখন মানিক লাল বলেন- নেহি স্যার এ আদমি মুক্তি নেহি হে। এ কথা শুনে ক্যাপ্টেন বলে- মুন্না তুম কেহেতাহ এ আদমি মুক্তি নেহি। ওকে হাম মানলিয়া। এভাবেই প্রশান্ত করঞ্জাইকে পাক সেনাদের হাত থেকে মুক্ত করতে কাজ করেন মানিক লাল।

কিন্তু সেই সারি সারি লাশের দৃশ্য মনে পড়লে এখনও শিউরে ওঠেন মানিক লাল। দীর্ঘ ছিচল্লিশ বছর ধরে এসব না বলা কথা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। স্বাধীনতা পরবর্তী এসব কথা কখনো জানতে আসেনি কেউ। কখনও নিজেও কাউকে বলেননি এসব কথা। নয় মাস বাঙালি শহীদের লাশ টেনে কাটলেও তার কোনো প্রতিদান চান না তিনি। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠির অধিকার আন্দোলন ভোলা জেলা শাখার সভাপতি হিসেবে দলিতদের অধিকার আদায়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এর কাজের স্বীকৃতি মিলেছে বেশ কবার। আর তা নিয়েই শান্তিতে দিন কাটছে তার।

এএম/এএল

 
.




আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad