ঋণ চক্রে জেলে জীবন!

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৭ | ৯ কার্তিক ১৪২৪

ঋণ চক্রে জেলে জীবন!

কাদের পলাশ, চাঁদপুর ৩:৩০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৭

print
ঋণ চক্রে জেলে জীবন!

আবুল বাশার দর্জি। বয়স ছেচল্লিশ। সুঠাম দেহের অধিকারি। কালো মুখমণ্ডলে আধপাকা দাঁড়ি। হাসি ল্যাপ্টে আছে মুখে। চেহারায় কোনো হতাশা নেই, দুঃখ নেই কিংবা কোনো আফসোস। অথচ এ লোকটিই প্রতিনিয়ত বয়ে বেড়াচ্ছেন পাঁচ লাখ টাকার ঋণের বোঝা। জেলে জীবনের ঋণ গত ত্রিশ বছরেও শোধ করতে পারেনি বাশার।

তের কি চোদ্দ বছর বয়সে বাবার সাথে নদীতে প্রথম মাছ ধরতে যাওয়া। তারপর ধীরে ধীরে মেঘনা নদীর সাথে গড়ে উঠে চমৎকার সখ্য। প্রথমে অন্যের নৌকায় কামলা খাটা। তারপর মনের ভেতর মহাজন হওয়ার সাধ জাগে। স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে ঋণ ধারকর্য করে নৌকা তৈরি করা হয়। কথায় কথায় বলছিলেন জেলে-মহাজন আবুল বাশার দর্জি।

নৌকা চালানোর ইঞ্জিন, মাছ ধরার জাল কিনতে না পারায় নদীতে মাছ ধরতে যাওয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। সর্বশেষ একজন দাদনদার তথা আড়ৎদারের কাছ থেকে টাকা দাদন নিয়ে ইঞ্জিন আর জাল কিনে শুরু হয় মহাজনি জীবন। যদিও তিনি মহাজন হয়ে বসে থাকেননি। নৌকার সাথে নিজেই ছিলেন, মাছ ধরেছেন, জাল মেরামত করেছেন। নদী জীবনের প্রায় তিন দশক পর শনিবার সকালে চাঁদপুর সদর উপজেলার হানারচর ইউনিয়নের হরিনা এলাকায় আবুল বাশার দর্জির সাথে কথা হয়।

দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক আবুল বাশার দর্জি গোবিন্দিয়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘নদী জীবনের প্রথম দিন থেকেই আমরা ঋণী। অর্জন শুধু ছেলে মেয়েদের মানুষ করা। মেয়েদের ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিতে পারলেই হলো। জীবনে যা ঋণ আছে নৌকা জাল বিক্রি করলেও আরো দুই লাখ টাকা ঋণ থেকে যাবে। অর্থাৎ আমরা কখনো ঋণ মুক্ত হতে পারবো না। আজো কেউ পারেও নি। অনেকে জেলে পেশা ছাড়লেও জমি বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। অথবা অন্য কাজ করে কেউ কেউ ঋণ পরিশোধ করেছে।’

মেঘনা নদীতে অন্যের নৌকায় ১৭ বছর কামলা খাটছেন রুহল আমিন (৭২)। আগে লবণ কারখানায় কাজ করলেও শারীরিক অক্ষমতার দরুন ১৭ বছর আগে আসেন জেলে পেশায়। বাড়ি চাঁদপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের রামদাসদী এলাকায়। পাঁচ ছেলে মেয়ের পিতা তিনি। ছেলে মেয়ে যার যার মতো সংসার করছেন। নিজের সংসার চালাতে গিয়ে কাজ করতে হয়। প্রতিদিন ছেলেদের কাছে সংসার খরচ ও হাত খরচের টাকা চাইতে ভালো লাগে না। তাই নদীতে মাছ ধরেন। স্বামী-স্ত্রীর সংসার চালাতে গিয়ে মাঝে মাঝে হিমশিম খেতে হয়।

ঋণ কত আছেন জানতে চাইলে দীর্ঘশ্বাস ছেরে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ ছেলে ব্যবসা করতে গিয়ে মাইর খাইছে। তহন একলাখ টাকা ঋণ নিছিলাম। হেইটা চালাইতে অয়। আর আমার ছোট্ট একটা কিস্তি আছে।’

চাঁদপুরের প্রায় প্রতিটি জেলে জীবনের গল্পই এমন। অবশ্য আড়ৎদাররা একটু ব্যতিক্রম। আড়তে একটা গদি নিয়ে বসেন। যদিও এর আগে নৌকা মালিক বা মহাজনদের অন্তত ৫-১০ লাখ টাকা দাদন দিতে হয়। না হয় গদিতে জেলেরা মাছ দেবে না। নৌকা মালিক আড়ৎদারের সাথে একটা মৌখিক চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী নৌকা মালিককে টাকা দাদন মানে ধার দেন। কারণ এ টাকার কোনো ঋণ নেই। শুধু শর্ত হচ্ছে প্রতিদিনের মাছ নির্দিষ্ট আড়ৎদারের কাছে বিক্রি করতে হবে। দাদনদার বিনিময়ে শতকরা ১০ টাকা নিবেন আড়ৎদারি। যদিও দাদনদাররাও ঋণগ্রস্ত আছেন কেউ কেউ

হরিণা এলাকার আড়তদার বাচ্চু ছৈয়াল ও বিলাল হোসেন জানান, এ বছর চাঁদপুরের সীমানায় মাছের আমদানী কম। যে কারণে ঋণের টাকা পরিশোধতো দূরের কথা আরো ঋণের বোঝা বাড়ছে। গত বছর গুলোতে মা ইলিশ রক্ষা কার্যক্রম ও জাটকা রক্ষা কার্যক্রম প্রায় শত ভাগ সফল হওয়ার পরও চাঁদপুরের নদীতে মাছ একেবারে কম। তার উপর কয়েকদিন পরে শুরু হচ্ছে মা ইলিশ রক্ষা কার্যক্রম। আমরা সব সময়ই সরকারি এসব কর্মসূচি মেনে আসছি ভবিষ্যতেও মানবো।

চাঁদপুর মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, আগামী ১ অক্টোবর থেকে ২২ দিন ইলিশ ধরা নিষেধ থাকবে। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম উপলক্ষে আগামী ১ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশের অবাধ প্রজনন অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে সারাদেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাত করণ ও বিক্রয় নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

চাঁদপুর মৎস্য কর্মকর্তা মো. সফিকুর রহমান জানান, কর্মসূচি সফল করতে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। ইতোমধ্যে মাইকিং, পোস্টার ও অবহিতকরণ সভা করা হয়েছে। যদি কেউ আইন অমান্য করে তাকে কমপক্ষে এক থেকে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। এছাড়া এ বছর আমরা প্রায় ৪৫ হাজার জেলের জন্যে খাদ্য সহায়তা চেয়ে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি।

কেপি/এসএফ

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad