বারকাত ও মুনতাসিরকাণ্ডে বাড়ছে বিষোদগার

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ মে ২০১৮ | ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫

বারকাত ও মুনতাসিরকাণ্ডে বাড়ছে বিষোদগার

খোলা কাগজের সৌজন্যে ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০৭, ২০১৮

print
বারকাত ও মুনতাসিরকাণ্ডে বাড়ছে বিষোদগার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অধ্যাপকের কাণ্ডে মানুষ ক্ষুব্ধ, বিরক্ত এবং ব্যথিত। তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের বিষোদগারও বাড়ছে। ওই দুই শিক্ষক হলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত এবং ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মুনতাসির মামুন।

ড. আবুল বারকাত সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘ঠিকমতো হিসাব করলে দেশের অর্ধেক ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাবে। দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যবসায়ীরা সামাজিক বা অন্য কোনো কারণে একত্রিত হলে বাড়ি ফেরার সময় পণ্যমূল্য বাড়ানোর কূটকৌশল সঙ্গে নিয়ে যান।’ 

এই অর্থনীতিবিদ একাধারে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক। তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যানও ছিলেন। 

বিশিষ্ট এ অর্থনীতিবিদের কেলেঙ্কারির ঘটনায় খোদ দেশের অর্থমন্ত্রীও হতবাক। খোদ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেই ফেলেছেন, জনতা ব্যাংক এক সময় সেরা ব্যাংক ছিল। কিন্তু আবুল বারকাতই ব্যাংকটি শেষ করে দিয়েছেন।

জানা গেছে, বারকাত যখন জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন তখন এক গ্রাহককে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে চাতুর্যের আশ্রয় নেয় জনতা ব্যাংক। ঋণ কম দেখাতে ব্যাংক তাদের নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদনে তিনটি পৃথক গ্রুপ বলে উল্লেখ করে। নিয়মনীতি ভেঙে এক গ্রাহককে বেশি ঋণ দেওয়ার তথ্য লুকাতেই এই ছল-চাতুরীর আশ্রয় নেওয়া হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দেওয়া প্রতিবেদনেও পাঁচ হাজার কোটি টাকার ঋণকে তিনটি পৃথক গ্রুপ হিসেবে দেখিয়েছে জনতা ব্যাংক। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো প্রশ্ন তোলেনি খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকও। 

ব্যাংকটির নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে দেশের গণমাধ্যম।  তবে পাওনা বাড়তে থাকায় ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ এখন ২২ প্রতিষ্ঠানের পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণকে একক গ্রুপের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে-বেনামে অনেকে থাকলেও প্রকৃত সুবিধাভোগী ইউনুস বাদল নামে এক ব্যক্তি। আর তার গ্রুপের নাম এননটেক্স। আর এই ঋণ কেলেঙ্কারির শুরু ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবুল বারকাতের সময়ে।

ফারমার্স ব্যাংক কাণ্ডে জড়িত মুনতাসির মামুন 
অনুমোদন পাওয়ার পর ২০১২ সালে ফারমার্স ব্যাংক তাদের কার্যক্রম শুরু করে। এরপর থেকেই অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে ব্যাংকটি। আস্থার সংকট তৈরি হলে আমানতকারীদের অর্থ তোলার চাপ বাড়ে। পরিস্থিতির অবনতি হলে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে দাঁড়ান সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও নিরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান মাহাবুবুল হক চিশতী। এরপর ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম শামীমকে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু আমানতকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট কাটছে না। 

ব্যাংকটিতে অর্থ তুলতে গিয়ে আমানতকারীদের বেশিরভাগই খালি হাতে ফিরছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ফারমার্স ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের ৫০৮ কোটি ১৩ লাখ ২৯ হাজার টাকা জমা রাখা হয়েছে। তার মধ্যে ৪৫৫ কোটি ৩২ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে, যা নগদায়নের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু টাকা দিচ্ছে না ব্যাংকটি। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন এ ব্যাংকটির পরিচালক। পরিচালক হিসেবে তিনি এ ব্যাংকের জালিয়াতির ঘটনার দায় এড়াতে পারেন না। ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান মহীউদ্দীন খান আলমগীর মুনতাসির মামুনের চাচা। মুনতাসির মামুন বিভিন্ন সময় অনেক উপদেশমূলক কথা বললেও তিনিও একজন লুটেরা বলে সবাই মনে করেন। তা না হলে তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পত্রপত্রিকায় কলাম লিখলেও ফারমার্স ব্যাংকের দুর্নীতি নিয়ে কেন লিখছেন না। তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সবচেয়ে বেশি বই লিখেছেন অথচ সুযোগ থাকলেও তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি। 

বারকাত এবং মুনতাসির কাণ্ডে সরব ফেসবুকও

হাসান মামুন নামে একজন সাংবাদিক তার ফেসবুকে লেখেন, ‘ড. আবুল বারকাত আমাদের ‘পলিটিকাল ইকোনমি’ পড়াতেন এবং ভালো পড়াতেন তিনি। তার রুমে গিয়ে মাঝে মাঝে আলাপেরও সুযোগ পেতাম। সাংবাদিক হওয়ার পর স্যারের একাধিক সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম বলে মনে পড়ছে। এমনি গিয়েও আড্ডা দেওয়ার সুযোগ হতো। তবে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার পর তার সঙ্গে আর দেখা হয়েছে বলে মনে পড়ছে না। একবার শুধু একটি বিজনেস ডেইলির কী একটা দরকারে তার গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বসে থেকে ক্লান্ত হতে হতে দেখেছিলাম, কত লোক তার সঙ্গে দেখা করছে আর কত কথা বলছে! বিরক্ত হয়ে চলে এসেছিলাম আমি। কারণ একবারও উঠে এসে তিনি তার ছাত্রকে বলেননি যে, একটু বসো বা ঘুরে আসো কিংবা আরেকদিন এসো। সেদিন তার মধ্যে বড় একটা পরিবর্তন আন্দাজ করেছিলাম। এরপর তাকে কেবল ফলো করে গেছি আর ‘মুগ্ধ’ হয়েছি নতুন করে। ড. বারকাতকে জড়িয়ে বড় ঋণ কেলেঙ্কারি বিষয়ে প্রকাশিত খবরে আমি তাই বিস্মিত হচ্ছি না।

রাখাল রাহা নামে ড. বারকাতের আরেক ছাত্র এবং একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘তিনি (ড. আবুল বারকাত) গণমানুষের অর্থনীতিবিদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত অধ্যাপক। বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা। পৃথিবীকে মৌলবাদের অর্থনীতি নামের একটি যুগান্তকারী তত্ত্ব উপহার দিয়েছেন। তিনি জনতা ব্যাংক লুটপাটের সঙ্গে জড়িত থাকতেই পারেন না!

রাহা ড. মুনতাসির মামুন সম্পর্কে লেখেন, ‘তিনি গণমানুষের ইতিহাসবিদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত অধ্যাপক। মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারেননি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গবেষক হয়েছেন। শত শত বই লিখেছেন। তিনি ফারমার্স ব্যাংক লুটপাটের সঙ্গে জড়িত থাকতেই পারেন না! আর কি? এই মাদার অব হিউম্যানিটি-র দেশে খোদা তাদের রহম করুন! গরিবের রক্ত নিংড়ানো টাকাগুলো! (রাখাল রাহা, ৬ই ফেব্রুয়ারি ২০১৮)। 

আবু সায়ীদ আহমেদ নামে একজন তার ফেসবুল স্ট্যাটাসে লেখেন, আবুল বারকাত ছিলেন মিস্টার ৫ টু ২০%। জনতা ব্যাংকের মাটি খুঁড়লে সাপ নয় দুর্নীতির ডাইনোসর বের হবে। 
আদিত্য আরাফাত নামে একজন লেখেন, ‘আবুল বারকাত সততার বুলি ছাড়তেন। অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলতেন। পেশাগত কাজে বেশ কিছু অনুষ্ঠানে তার বক্তৃতাবাজি শুনে তাকে ধান্ধাবাজ মনে হয়নি। চেতনার কথা শুনে ভালো মনে হতো। পাঁচ বছর জনতা ব্যাংকে চেয়ারম্যানগিরি করার সময়ও তার দুর্নীতি ধরা পড়েনি। ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্নীতি চাপা থাকলেও এখন অকাট্য প্রমাণসহ প্রকাশ হচ্ছে তার আমলে দুর্নীতির চিত্র। জনতা ব্যাংক থেকে এক ব্যক্তিকেই নামে-বেনামে জালিয়াতির মাধ্যমে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ অনুমোদন দিয়েছেন। ওই সময়ে বারকাতই চেয়ারম্যান ছিলেন। কি ভয়ঙ্কর জালিয়াতি! এ জালিয়াতির কারণেই ব্যাংকটির মেরুদণ্ড কার্যত নড়বড়ে হয়ে গেছে। এ ব্যাংক কবে দাঁড়াতে পারে তা অনিশ্চিত। প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীর সাইনবোর্ডধারী অধ্যাপক আবুল বারকাত সম্পর্কে খোদ অর্থমন্ত্রীই বলে ফেললেন, ‘বারকাতই ব্যাংকটি শেষ করে দিয়েছেন’। বারকাতের মুখোশ খুলে গেছে এখন। দয়া করে আপনি আর কোথাও সুশীল সেজে কথা বলবেন না। আপনার ভালো বেশধারী কথা আমি নিজেও তুলে ধরেছিলাম গণমাধ্যমে। এখন গা জ্বলছে। 

আইএম

 
.

Best Electronics Products



আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad