এবি ব্যাংকের ১৬৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ হয় যেভাবে

ঢাকা, সোমবার, ২০ আগস্ট ২০১৮ | ৫ ভাদ্র ১৪২৫

এবি ব্যাংকের ১৬৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ হয় যেভাবে

তাসলিমুল আলম তৌহিদ ১১:২৮ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৮, ২০১৮

এবি ব্যাংকের ১৬৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ হয় যেভাবে

ভুয়া অফশোর কোম্পানিতে বিনিয়োগের আড়ালে দুবাইয়ে এবি ব্যাংকের ১৬৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হক এবং ব্যাংকটির গ্রাহক আটলান্টিক এন্টারপ্রাইজের মালিক সাইফুল হক। এ দুজনের নেতৃত্বেই ভুয়া কোম্পানি খোলার নাম করে বড় অঙ্কের এই টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

সম্প্রতি অনুসন্ধান ও জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দুদকের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় সাতজনের নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

দুদকের দায়ের করা মামলায় আসামিরা হচ্ছেন- এবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হক, হেড অব করপোরেট ট্রেজারি আবু হেনা মোস্তফা কামাল, গ্রাহক আটলান্টিক এন্টারপ্রাইজের মালিক সাইফুল হক, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শামীম আহমেদ চৌধুরী ও ফজলুর রহমান, হেড অব অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট (ওবিইউ) মোহাম্মদ লোকমান, ট্রেজারি শাখার ভিপি মোহাম্মদ মাহফুজ-উল হক ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নুরুল আজিম।

দুদকের দায়ের করা মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, আটলান্টিক এন্টারপ্রাইজের মালিক ও বিএনপি নেতা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খানের (মোরশেদ খান এবি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান) মেয়ের জামাতা সাইফুল হক দুবাইতে অবস্থানকারী আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের সদস্য খুররম আব্দুল্লাহ ও আব্দুস সামাদ খানের পূর্ব থেকেই পরিচিত ও বন্ধু ছিলেন। একই সঙ্গে তৎকালীন এবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ওয়াহিদুল হক পূর্বপরিচিত ছিলেন।

সাইফুল হক এবি ব্যাংক থেকে টাকা পাচার ও আত্মসাতের অসৎ উদ্দেশ্যে ওই প্রতারক চক্রের সাথে এবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ওয়াহিদুল হককে পরিচয় করিয়ে দেন। তারা একাধিকবার দুবাই ও বাংলাদেশে মিটিংয়ের উদ্দেশ্যে মিলিত হন।

পরে চেয়ারম্যান ওয়াহিদুল হক এবং হেড অব ট্রেজারি আবু হেনা মোস্তফা কামাল বোর্ডকে গোচরীভূত না করেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে দুবাই গমন করে প্রতারক চক্রের সাথে মিটিং করেন।

প্রতারক চক্র পূর্ব থেকেই সিঙ্গাপুর ভিত্তিক একটি কোম্পানি পিনাকল গ্লোবাল ফান্ড (পিজিএফ) সৃষ্টি করে এবং দুবাইতে অপর একটি কোম্পানি চেং বাও জেনারেল ট্রেডিং এলসির নামে দুবাইয়ের এডিসিবি ব্যাংকে একটি হিসাব খোলেন। পরে ওয়াহিদুল হক ও আবু হেনা মোস্তফা কামাল নিজস্ব উদ্যোগেই প্রতারক চক্রের সদস্য খুররম আব্দুল্লাহর সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ রক্ষা করে একটি খসড়া ওয়াকালা এগ্রিমেন্ট প্রস্তুত করেন। তা অনুমোদনের জন্য পরে আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম আহমেদ চৌধুরীর যৌথ স্বাক্ষরে বোর্ড মেমো প্রস্তুত করে এবি ব্যাংকের ৫৩৯তম বোর্ড সভায় উপস্থাপন করেন। বোর্ড কয়েকটি শর্ত দিয়ে অনুমোদন করে।

এবি ব্যাংকের বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত ওয়াকালা এগ্রিমেন্টে শর্ত ছিল, পিজিএফের ৬০ মিলিয়ন ডলার ছাড় করার পর এবি ব্যাংক ২০ মিলিয়ন ডলারের ব্যাংক গ্যারান্টি এবি ব্যাংক এবং পিজিএফের প্রতিনিধি যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত একটি ব্যাংক হিসাব জমা দেবে এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন গ্রহণপূর্বক ওই ২০ মিলিয়ন ডলারের ‘ব্যাংক গ্যারান্টি’ ছাড় করা হবে। এছাড়াও বলা হয়, চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে পুনরায় অনুমোদনের জন্য বোর্ডে উপস্থাপন করতে হবে।

তবে অনুসন্ধানকালে দুদকের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ব্যাংকের চেয়ারম্যান ওয়াহিদুল হক, হেড অব ট্রেজারি আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমান অসৎ উদ্দেশ্য ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অনুমোদিত খসড়া চুক্তিপত্রের শর্ত ভঙ্গ করে সুকৌশলে ‘ব্যাংক গ্যারান্টি’ শব্দটি বাদ দিয়ে একটি চুক্তিপত্র প্রস্তুত করে বোর্ডে উপস্থাপন ব্যতিরেকে তাতে এবি ব্যাংকের প্রতিনিধি হিসেবে ওয়াহিদুল হক নিজে এবং ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমান তাতে স্বাক্ষর করেন।

দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, পরে উক্ত চুক্তিপত্র নিয়ে ওয়াহিদুল হক ও আবু হেনা মোস্তফা কামাল দুবাই গমন করে তথাকথিত পিনাকল গ্লোবাল ফান্ড (পিজিএফ)-এর দুজন প্রতিনিধির স্বাক্ষর গ্রহণ করেন। তবে চুক্তিপত্রে পিজিএফের পক্ষে স্বাক্ষরকারী দুজন ব্যক্তির কোনো নাম-ঠিকনা উল্লেখ করা হয়নি।

চুক্তিপত্রে উল্লেখ ছিল, দুবাইয়ে অথরাইজড সিগনেটরি হওয়ার জন্য চুক্তি স্বাক্ষরের ১৫ দিনের মধ্যেই তথাকথিত কোম্পানি পিজিএফ এম ওয়াহিদুল হকের দুবাই রেসিডেন্সি ভিসার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু ওয়াহিদুল হক দুবাই রেসিডেন্সির ভিসা না পাওয়া সত্ত্বেও তিনি এবং আবু হেনা ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে দুবাই গমন করেন এবং ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। সে সময় কোনোরূপ যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হিসাব না খুলেই প্রতারক চক্রের নামে দুবাইয়ের এডিসিবি ব্যাংকে ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার স্থানান্তরের জন্য এবি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।

তাদের নির্দেশে যাচাই-বাছাই ছাড়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়াই ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের ট্রেজারি শাখার কর্মকর্তা নুরুল আজিম, চট্টগ্রামের ইপিজেড ওবিইউ ইউনিট শাখা থেকে দুবাই্য়ের ওই অ্যাকাউন্টে পাঠানোর জন্য এবি ব্যাংকের ওবিইউ শাখা প্রধান মোহাম্মদ লোকমানকে ই-মেইল যোগে আদেশ দেন।

আদেশ পেয়ে মোহাম্মদ লোকমান যাচাই-বাছাই ছাড়াই দুবাইয়ের এডিসিবি ব্যাংকে তিনটি ট্রানজেকশনে (২০ মিলিয়ন ডলার) বাংলাদেশি ১৬৫ কোটি টাকা পাঠিয়ে দেন।

মূলত শামীম আহমেদ চৌধুরী, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মোহাম্মদ মাহফুজ উল ইসলাম, নুরুল আজিম, লোকমান কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে এবং চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া এবং সাইফুল হক ও প্রতারক চক্রের সদস্যদের যোগসাজশে দুবাইয়ের এডিসিবির ব্যাংকে ১৬৫ কোটি টাকা পাচার করে। পরে উক্ত হিসাব থেকে পে-অর্ডারের মাধ্যমে সমুদয় টাকা উত্তোলনের মাধ্যমে টাকার অবস্থান গোপনপূর্বক টাকা আত্মসাৎ করেন।

দুদকের অনুসন্ধান রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দুবাইয়ের এডিসিবি ব্যাংকের বার্ণিত হিসাব থেকে টাকা স্থানান্তরের পরপরই উক্ত ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে দেয় এবং কথিত সিঙ্গাপুরের পিজিএফ নামে কোম্পানিটি ১২ মে ২০১৬ সালে এসে বন্ধ বা অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। এভাবে ১৬৫ কোটি টাকা এবি ব্যাংক থেকে আত্মসাৎ করা হয়।

এদিকে, গত ২৫ জানুয়ারি দুদকের মামলার এই দিন বিকেলে দুদকের সহকারী পরিচালক মো. গুলশান আনোয়ারের নেতৃত্বে দুদকের একটি টিম ঢাকার মৎস্য ভবন এলাকা থেকে এবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হক, ব্যাংকের হেড অব ট্রেজারি আবু হেনা মোস্তফা কামাল এবং ব্যবসায়ী মো. সাইফুল হককে গ্রেফতার করে।

গ্রেফতারের পর তিন আসামিকে ঢাকার হাকিম আদালতে হাজির করে ১০ দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চান মতিঝিল থানার এসআই গোলাম রাব্বানী। তবে মহানগর হাকিম আদালত ব্যবসায়ী সাইফুলকে তিন দিনের রিমান্ড দিলেও ব্যাংকের চেয়ারম্যান ওয়াহিদুল ও আবু হেনা মোস্তফা কামালকে ১০ হাজার টাকা মুচলেকায় জামিন দেন।

অর্থ পাচারের ওই অভিযোগে গত ২৮ ডিসেম্বর ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হক ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম ফজলার রহমানকে এবং ৩১ ডিসেম্বর ব্যাংকটির সাবেক এমডি শামীম আহমেদ চৌধুরী ও ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন অ্যান্ড ট্রেজারি শাখার প্রধান আবু হেনা মোস্তফা কামালকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে গত ২ জানুয়ারি ব্যাংকটির পাঁচ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

এছাড়া ৮ জানুয়ারি ব্যাংকের পরিচালক বি বি সাহা রায় ও ব্যাংকটির গ্রাহক ব্যবসায়ী সাইফুল হককে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

অর্থ পাচারের ঘটনাটি ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের জুনের মধ্যে ঘটে। ২০১৭ সালে এসে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নামে দুদক।

টিএটি/এএল