তিনিও এই মর্ত্যেরই এক সাধারণ মানুষ!

ঢাকা, শনিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৭ | ৪ ভাদ্র ১৪২৪

তিনিও এই মর্ত্যেরই এক সাধারণ মানুষ!

পরিবর্তন ডেস্ক ২:২২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৩, ২০১৭

print
তিনিও এই মর্ত্যেরই এক সাধারণ মানুষ!

'কাদম্বিনি মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই'। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্পের অমর লাইনটা মনে না পড়ে উপায় আছে এই ক্ষণে! অমরত্বের পেয়ালায় তিনি চুমু খেয়েছেন সেই কবে। কিন্তু জীবনের শেষ দুই দৌড়ে উসাইন বোল্ট তো বিয়োগান্ত গল্প লিখেই প্রমাণ করলেন তিনি এই মর্ত্যেরই মানুষ। তিনি অজেয় নন। তারও শেষ আছে। আর বিদায় বেলায় সেই শেষের মতো নিষ্ঠুর বুঝি আর কিছু হতেই পারতো না।

বাজি ধরে বলা যায় শনিবার রাতে লন্ডন স্টেডিয়ামের ৬০ হাজার দর্শকের একজনও এমন কিছু দেখতে চাননি। সারা বিশ্বের আনাচে কানাচে টেলিভিশন বা লাইভ মাধ্যমে বোল্টের দৌড়ে চোখ রাখা কোটি কোটি মানুষের কেউ কি চেয়েছেন? কাউকে জিজ্ঞেস না করেই বলা যায় চাননি। বিশ্ব ইতিহাসের সেরা স্প্রিন্টারের এমন নির্মম বিদায় অনেকের চোখে জলও এনেছে। আর বোল্ট তো হতবিহ্বল, বাকহারা। এমন বুকভাঙা শেষ যে তিনিও চাননি!

ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে জীবনের শেষ ১০০ মিটারে বোল্টের হেরে যাওয়াটাই ছিল সবার জন্য বড় ধাক্কা। ওখানে তৃতীয় হয়েছিলেন। বাকি ছিল শুধু ৪ গুণিতক ১০০ মিটারের রিলেটা। যার হিটে দৌড়ে বোল্টই জ্যামাইকাকে ফাইনালে তুলেছিলেন। বরাবরের মতো অ্যাঙ্কর লেগে দৌড়ানোর সময় আসে। বজ্রবিদ্যুতের হাতে ব্যাটন দেখেই বিস্ফোরণ মানুষের সমুদ্র স্টেডিয়ামে। বোল্টের মনের মাঝে অদম্য এক জেদ ছিল বুঝি। জীবনের শেষ দৌড়টা জিততেই হবে।

কিন্তু স্প্রিন্টদেব সারাজীবন তাকে জিতিয়ে এলেও শেষের চিত্রনাট্যটা আলাদা করেই লিখে রেখেছিলেন। তাই স্টেডিয়াম ও টেলিভিশনের অগুনতি চোখ হঠাৎ কেঁপে ওঠে। বোল্টের দৌড়ে এমন দৃশ্য যে কখনো দেখেননি তারা! আর একটু দৌড়ালেই চ্যাম্পিয়ন বোল্ট। আবার দেখা যাবে মানুষের জয়ের সেই অ্যারো। বোল্ট দেখাবেন। অনেক্ষণ ধরে মেতে থাকবে স্টেডিয়াম। বিদায়ী বোল্টকে ঘিরে। কিন্তু গতি বাড়াতে গিয়ে টান লাগে হ্যামস্ট্রিংয়ে।

বোল্ট থমকে যেতে থাকেন। পাশের অন্য অ্যাথলেটরনা বিস্মিত হলেও তারা তো থামতে পারেন না। আর মোটে ৫০ মিটারের মতো বাকি। তারা ছোটেন। বোল্ট পেছনে পড়ে থাকেন।

উসাইন বোল্ট ট্র্যাকে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ। চির অপরিচিত এই দৃশ্য দেখে হতবাক, কিংকর্তব্যবিমুঢ় সবাই।

তবু কি উঠে ছুটতে চেয়েছিলেন বোল্ট? হারতে যে জানতেন না ৮ বারের অলিম্পিক ও ১১ বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন! কিন্তু হায়, অসহায় চোখে চেয়ে চেয়ে দেখেন, ওরা সব ছুটে চলে যায়।



বোল্টকে রেখে অন্যরা ফিনিশিং লাইন পেরিয়ে যান। ভিন গ্রহের স্পিন্টার হয়ে ওঠা বোল্ট জীবনের শেষ দৌড়ে নিজেকে আবিষ্কার করেন খুব সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে।

আহা! কি নিদারুণ দৃশ্য! অসহায় শূন্য দৃষ্টি মাটিতে লুটিয়ে থাকা গতিদানব বোল্টের।

জ্যামাইকান দলে বোল্টের পার্টনাররা এগিয়ে আসেন তার সহায়তায়। বোল্ট কি মনের ভেতর ডুকরে কাঁদছিলেন তখন? তিনি যে শেষ দৌড়ে ট্র্যাজেডির নায়ক হয়ে দল ও দেশকে হারিয়ে দিলেন। নতমস্তকে তখন বোল্ট ট্র্যাকের ভেতর ঢুকে যেতে চান বুঝি।

কিন্তু স্পোর্টসম্যানকে তো মেনে নিতে হয় সব। বোল্টের স্পোর্টসম্যানশিপ নিয়েও প্রশ্ন ওঠেনি পুরো ক্যারিয়ারে। হুইল চেয়ার আসে। বোল্ট তাতে উঠবেন না। তিনি শুনতে পান গোটা স্টেডিয়ামে উঠেছে সমুদ্রের গর্জনের মতো রব, 'বোল্ট' 'উসাইন বোল্ট', 'বোল্ট'।



হেরে গিয়েও তাহলে পরাজিত নন বোল্ট! নিজেরই হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াবেন তখন বোল্ট। এই গর্জনের মধ্যে ডুবে যেতে যেতে লাইটনিং বোল্ট কি মনে মনে সিদ্ধান্তটা পাল্টে ফেলেন? মানুষের জন্যই আরেকটি শেষ দৌড়ের ছক কি কষেছেন হৃদয়ের খুব গভীরে?

ক্যাট

print
 
nilsagor ad

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad