ইয়া হাবিবী

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

আহসান হাবীবের ৬০তম জন্মদিন

ইয়া হাবিবী

মাসুদ কামাল হিন্দোল ১২:৫২ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৫, ২০১৭

print
ইয়া হাবিবী

যে দেশ বা সমাজে গুণের কদর করা হয় না। সে দেশ বা সমাজে গুণী মানুষের জন্মও হয় না। এমন কথা প্রচলিত আছে আমাদের সমাজে। তারপরও এ দেশে আমরা অনেক জ্ঞানী-গুণী মানুষ পেয়েছি সৌভাগ্যক্রমে। মরণোত্তর স্বীকৃতি পাওয়া দেশে একজন কার্টুনিস্ট-রম্য লেখক আহসান হাবীব এর ৬০ তম জন্মদিন (১৫ নভেম্বর) হয়তো কোন গুরুত্ব বহন করে না অনেকের কাছেই। কিন্তু আমরা যারা কার্টুন-রম্য-ফান-স্যাটায়ারকে ভালোবেসে এ পথে এসেছি। তাদের কাছে তাঁর ৬০ তম জন্মদিনের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। আরও অগণিত পাঠকের কাছে যে তিনি নন্দিত  তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমাদের দেশে রম্য ফান স্যাটায়ারের মূল্যায়ণ হলো না আজও।

.

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তার সঙ্গে পথ চলা। প্রতিটি ক্ষণ মুহূর্ত উপভোগ করেছি। জেনেছি নতুন নতুন অনেক তথ্য ও তত্ব। তার সঙ্গে পথ চলা মানে বাড়তি আনন্দ। কথায় কথায় হিউমার- ফান-উইট -স্যাটায়ার। অজানা বিষয়ে জানা। ধর্ম থেকে রাজনীতি সবই আলোচনা হয়। সে আলোচনায় কখনো কখনো অ্যাডাল্ট বিষয়ও ‘ফিলার’ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। প্রতিটি আড্ডাতেই নিজেকে সমৃদ্ধ করেছি।

বার বার মনে হয়েছে আমার জানা শোনার সীমাবদ্ধতার কথা। এবং তার কাছ থেকে শিখেছি কত সহজে জীবনের বন্ধুর পথ পাড়ি দেয়া যায়। একই সঙ্গে জানার আগ্রহও রেড়েছে বহুগুণ তার সঙ্গে পথ চলতে যেয়ে। ষাট বছর বয়সেও চির তরুণ। তার তারুণ্য আমাদের মুগ্ধ করে। প্রতিনিয়তই আমরা তার কাছ থেকে শিখছি উন্মাদের পাঠশালায়। যাকে বলে লার্ন উইথ ফান। বিনোদনের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করা। অর্থাৎ এডুটেন্টমেন্ট।

নানাভাবে তার কাছ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছি। কখনো তথ্য দিয়ে কখনো তত্ব দিয়ে। কখনো জটিল সমস্যার সমাধান করে। বইয়ের ভূমিকা লিখে দিয়েছেন, প্রচ্ছদও এঁকে দিয়েছেন। নিজের লেখা বই( অরম্য-রম্য- কথাপ্রকাশ) আমাকে উৎসর্গও করেছেন।

বেকারত্বের দিনে চাকরিও দিয়েছেন। আমার যোগ্যতার চেয়ে অনেক বেশি প্রংশসা করেছেন, প্রিন্ট-ইলেট্রনিক মিডিয়াতে। কখনোবা ঘরোয়া আড্ডাতে। যা আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে যাচ্ছে আজও। তরুণদের উৎসাহ দেয়ার ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা ভার। উন্মাদে আমাদের উর্বর মস্তিকের যে কোন নতুন ভাবনাকে তিনিই প্রথম জোরালো সমর্থন করে আসছেন আজও। উৎসাহ দেওয়ার ব্যাপারে তার কখনো কমতি থাকে না।

অসংখ্য তরুণ তরুণীকে চাকরি দিয়েছেন। যারা এখন প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ বিভিন্ন মাধ্যমে পরিচিত মুখ। অল্প দিনের পরিচয়েও চাকরির জন্য সুপারিশ করেছেন। চাকরি যাতে হয় সে জন্য যা যা করা দরকার তাই তাই করেছেন। উন্মাদ অফিসে বসেই কতজনের চাকরির ব্যবস্থা করেছেন। সে সব কথা অনেকেরই অজনা আজও।

উন্মাদে যারা কাজ করে এবং উন্মাদের সঙ্গে যারা লতায় পাতায় জড়িত তারা সবাই কোন  না কোনভাবে তার সহায়তা বা শুভদৃষ্টি পেয়েছে। এমন কি উন্মাদের কোন কোন ফ্যানও। তার সহযোগিতার হাত অনেক প্রশস্ত। বিশেষ করে তারুণ্যের জন্য।

মানুষকে হাসানো খুব কঠিন কাজ আমাদের মত সমাজে। অথচ সেই কঠিন কাজটি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে  ফান হিউমার স্যাটায়ার বা উইটের মাধ্যমে গত ৪০ বছর ধরে নিরলসভাবে করে যাচ্ছেন আহসান হাবীব। এক সাক্ষাৎকারে তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম কিভাবে লেখক হলেন? উত্তরে তিনি বলেন, ‘লেখক হয়েছি পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে।

আমার বড় দুই ভাই লেখক(হূমায়ুন আহমেদ ও মুহাম্মদ জাফর ইকবাল)। বাবা মাও লিখতেন। আমার বড় বোন লেখালেখি করেন। মূলত পারিবারিক কারণে আমি লেখক হয়েছি। ইদানিং আমাদের পরের প্রজন্মও লেখালেখি শুরু করেছে।’ জোকস্, রম্যরচনা, গল্প, উপন্যাস, শিশুসাহিত্য, সায়েন্সফিকশন-এ সবই তার লেখার বিষয়। জোকসকে কুটিরশিল্প পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।

বিখ্যাত সেই স্প্যানিশ দার্শনিকের মত তিনিও মনে করেন, ‘যে দিনটি হাসা গেল না সেই দিনটি নিদারুণ ভাবেই ব্যর্থ। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশটা সমস্যাসঙ্কুল একটি দেশ। এই দেশে সব সময় ভালো মুডে থাকা সত্যিই কষ্টকর একটি ব্যাপার। এর জন্য সহজ ট্রিটমেন্ট হচ্ছে জোকস... জোকস... এবং জোকস। জোকস নিজে পড়ুন নিজে হাসুন অন্যের সাথেও হাসিটা শেয়ার করুন।

কারণ হাসি হচ্ছে এমন এক মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি যাতে আপনি আত্রান্ত হলেও কোন সমস্যা নেই। চিকিৎসা খরচও নেই।’ ইদানিং গ্রাফিক নভেল লেখা ও আাঁকার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে তার। সম্পাদনা করছেন ভ্রমণবিষয়ক ম্যাগাজিন ট্রাভেল অ্যান্ড ফ্যাশন। অটোমোবাইল বিষয়ক ম্যাগাজিন অটোলাইন এর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘদিন। ম্যাগাজিন নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে পছন্দ করেন। নানা ধরনের বিষয়ভিত্তিক ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেছেন গত চার দশকে।

তার সহজ সরল জীবন আমকে মুগ্ধ করে। বইমেলায় স্টলের ভেতর ঘুমানো তার পক্ষেই সম্ভব। তার জীবন বইয়ের পাতা উল্টানোর মতই সহজ। নিজেকে কখনো সেলিব্রেটি ভাবতে পারেননি। অতি সাধারণ তার চলাফেরা জীবনযাপন। জনপ্রিয়তা সারল্যে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি। সেখানে কৃত্রিমতা কখনো ভর করেনি। গ্রাসও করেনি। তিনি নিজেই নিজেকে ‘গ্র্যান্ড ফাদার অব জোকস’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

এবং তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তার বইয়ে। এটা তার পক্ষেই সম্ভব। যা কিছু করেছেন সবই কার্টুন-রম্য-ফানকে একান্ত ভালোবেসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলে অনার্স-মাষ্টার্স করেন। তারপরও নিশ্চিত ব্যাংকার জীবনের হাতছানিকে উপেক্ষা করে বেছে নিযেছেন উন্মাদ সম্পাদকের অনিশ্চিত পদবী। বিয়ে করেছেন উন্মাদ সম্পাদক পরিচয়েই। স্ত্রী স্কুল শিক্ষিকা আফরোজা আমিন ও একমাত্র মেয়ে শবনম আহসান এষাকে নিয়ে তার সংসার।

এভাবেই আজ উন্মাদের ৪০ আর আহসান হাবীবের ৬০। উন্মাদের উন্মাদনায়  এক এক করে কাটিয়ে দিলেন ৪০টি বছর। উন্মাদ ও আহসান হাবীব এখন বাংলাদেশে ব্র্যান্ড। উন্মাদ ছড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবীতে যেখানে যেখানে বাঙ্গালীরা বসবাস করছেন। ৩০ কোটি বাঙ্গালীর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন কার্টুন- রম্য-ফান স্যটায়ার।

আহসান হাবীরের সঙ্গে আমার বয়সের পার্থক্য অনেক। তারপরও আমাদের সম্পর্কটা বন্ধুত্বপূর্ণ বা বন্ধুভাবাপন্ন। যে কথা কাউকে বলা যায় না। সে কথা তার সঙ্গে অবলীলায় শেয়ার করা যায়। তার মেয়ের বয়সী ছেলেমেয়েদের সঙ্গেও অল্প সময়ে বন্ধুসুলভ হয়ে ওঠেন।

বর্তমানে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার পরও এক বিন্দুও বদলাননি। যেমন দেখেছিলাম প্রথম দিন ঠিক তেমনি আছেন আজও। তিনি অনেক সময় বন্ধুদের আড্ডায় এমন কি সুধী মহলেও আমার মত নগণ্য সাংবাদিক- লেখককেও তার বন্ধু হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তার মত মানুষকেইতো বলা যায় ইয়া হাবিবী (আরবী  ভাষায় হাবিবী অর্থ বন্ধু)।

মাসুদ কামাল হিন্দোল: সাংবাদিক ও রম্যলেখক।
hindol_khan@yahoo.com

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad