গবেষক-প্রাবন্ধিক আবুল আহসান চৌধুরী : জন্মদিবসে সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ মে ২০১৮ | ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫

গবেষক-প্রাবন্ধিক আবুল আহসান চৌধুরী : জন্মদিবসে সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা

মাসুদ রহমান ৮:১৪ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৩, ২০১৮

print
গবেষক-প্রাবন্ধিক আবুল আহসান চৌধুরী : জন্মদিবসে সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা

বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কিত গবেষণায় ও বাংলা ভাষায় প্রবন্ধচর্চায় অন্যতম অগ্রগণ্য বাঙালি মনীষী আবুল আহসান চৌধুরী (জ. ১৩ জানুয়ারি ১৯৫৩)। গদ্যে কাব্যিক অনুপ্রাসজাত শব্দ ব্যবহারে একঘেয়েমি তৈরি হতে পারে, সেই ঝুঁকি নিয়েও আমরা প্রথম ও পরিচিতিমূলক বাক্যটিতে ‘বাংলাদেশ’, ‘বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি’, ‘বাংলা ভাষা’, ‘বাঙালি’ শব্দসমূহ ব্যবহার করলাম। কারণ আবুল আহসান চৌধুরীকে বুঝতে হলে, তাঁর গবেষণাসম্ভারের গতিপ্রকৃতি নির্দেশ করতে হলে, এই শব্দরাজির ব্যবহার জরুরি।

তিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রগঠনের সংগ্রামী-সৈনিক, বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রকৃষ্ট ভাষ্যকার, বাংলা ভাষা তাঁর শিল্পমাধ্যম, খাঁটি বাঙালি জীবনাচরণে অভ্যস্ত। সঙ্গত ও অনিবার্যভাবেই একজন নিষ্ঠ ও জাত গবেষক হিসেবে তিনি গবেষণাকর্মে বস্তুনিষ্ঠ, ব্যাখ্যায় নির্মোহ, সিদ্ধান্তে যুক্তিশাসিত। তবে গবেষকের বিশেষত সাহিত্য-সংস্কৃতির শেষত লক্ষ্য তো সত্যের আলোকে দিশা দেওয়া, আত্মআবিষ্কার ও বোধন; আবুল আহসান চৌধুরী সেইসব মহৎ লক্ষ্যকে ব্রতী করেই গবেষণাকর্মে নিরত, প্রবন্ধ রচনায় নিরলস।

তিনি শখসর্বস্ব নন, মত্যানুগত ও শিল্পসমর্পিত সাহিত্যশিল্পি। মৃত্যুপ্রতিক্রিয়ায় তো বটেই, কারো জন্মদিন উপলক্ষে কথা বলতে গেলেও বিস্তর ভাল-ভাল কথা বলাই বিধেয় সেই বিধি মেনে যে আমরা এমনটি বললাম তা নয়। জনাব চৌধুরীর সাহিত্যসাধনার আদি-ইতির সংক্ষিপ্ততম রূপরেখা আঁকলে এ দাবি প্রমাণিত হবে।

অনেকের অজানিত, অথচ কৌতূহলকর তথ্য হলো, আজকের প্রাবন্ধিক-গবেষক আবুল আহসান চৌধুরীর সাহিত্যচর্চার শুরু কিন্তু কবিতা দিয়ে। সেটিও নেহায়েত কৈশোর-যৌবনের স্বভাবজ রঙ্গিন অভিব্যক্তি নয়। মুক্তিযুদ্ধকালে কলকাতা থেকে বেরিয়েছিল তাঁর প্রথম বই ‘স্বদেশ আমার বাঙলা’ নামীয় কাব্যগ্রন্থ।

যুদ্ধ-অভিঘাতের সে চিত্র দেখে অভিভূত কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বইটির ভূমিকায় এই তরুণ কবির পরবর্তী কাব্যসাধনার প্রকৃতি কীরূপ হওয়া উচিত সে সম্পর্কে মত দিয়েছিলেন। অর্থাৎ কবিতার শিল্পি হিসেবে তাঁকে স্বাগত-স্বীকৃতি জানিয়েছিলেন ভালোভাবেই। আহসান চৌধুরীর দ্বিতীয় গ্রন্থও কবিতা-সংকলন। ষাটের দশকের কবিতার ইতিহাসে তাঁর নাম এখনও কেউ কেউ করে থাকেন। সেসময় প্রধান প্রধান পত্রিকায় তাঁর গল্পও দু-একটি বেরিয়েছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত আবুল আহসান চৌধুরী সৃজনশীল সাহিত্যের শাখায় বিচরণ বাদ দিয়ে প্রবন্ধের প্রাঙ্গণে স্থিত হলেন।

গবেষণা-প্রবন্ধের পাঠক স্বল্প, পরিচিতির পরিধি তাই থাকে সীমিত। লেখকশিল্পি তো দেশকাল পেরিয়ে সব মানুষের চেনাজানা হতে চান।

সৃজনশীল সাহিত্যের চর্চায় সেই সুযোগ বেশি। সৈয়দ মুর্তাজা আলীর মতো শুভাকাক্সক্ষীরা আহসান চৌধুরীকে সৃজনশীল সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু স্বদেশি ঐতিহ্যকে প্রাপ্য মর্যাদা প্রদান, অতীতের অন্ধকার অধ্যায়ে আলোকপাত, পূর্বসূরি সংস্কারক ও মনীষীদের যথাযথ মূল্যায়ন ইত্যাকার ইচ্ছা তাঁকে এতোটা পেয়ে বসে যে, গবেষণার কঠোর পথই বেছে নেন। জন্মস্থান কুষ্টিয়া এবিষয়ে হয়তো বিশেষ প্রণোদনা সৃষ্টি করেছিল। পারিবারিক পরিবেশও ছিল অনুকূলে; পিতা ফজলুল বারি চৌধুরী ছিলেন লেখক, মাতুল বিখ্যাত কাজী মোতাহার হোসেন।

কুষ্টিয়া শহরের কেন্দ্রস্থলে তাঁদের বাড়ি আর পশ্চিম প্রান্তে লালনের সমাধি-আখড়া। এ দুটো স্থানকে যুক্ত করেছে শহরের প্রধান যে সড়কটি, তার ধারেকাছে বাস করে গেছেন রবীন্দ্রনাথ, কবি নজরুল, জগদীশ গুপ্ত, অন্নদাশঙ্কর রায় প্রমুখ। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া অপ্রশস্ত গড়াই পেরুলেই উত্তরে রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি; পূর্বে নদীর এপারে মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা ওপারে কাঙাল হরিনাথ ও তাঁর পারিষদদের কর্মযোগধাম। এসব জায়গায় প্রায়ই আসেন গবেষক-প-িতেরা।

আবুল আহসান তাঁদের সঙ্গ পেয়ে আসছেন ছোটবেলা থেকে। বিশেষত মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের সান্নিধ্য তাঁকে বাঙালির উদার-অসাম্প্রদায়িক বৈচিত্রঋদ্ধ মানবিকতাপূর্ণ সংস্কৃতিকে আপন আলোয় উদ্ভাসিত করবার মহৎ সাধনায় আগ্রহী করে তোলে। কর্মচারিত্র্যে তাঁর পূর্বসূরি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদকে সরাসরি পাননি বটে, তবে প্রিয় ছাত্র হয়েছিলেন আহমদ শরীফের। এরই ফলশ্রুতিতে গবেষক হওয়াটা অনিবার্য হয়ে ওঠে তাঁর পক্ষে। শামসুর রাহমান ঘটনাটির এরূপ কাব্যিক বর্ণনা করেছেন : “কোনও এক উদাস বিকেলে, মনে হয়, তোমার পড়ার ঘর/ থেকে সাংকেতিক এক প্রগাঢ় ভাষায়/ তোমাকে দূরের/ সবুজ মাঠের দিকে কেউ টেনে নিয়ে গিয়েছিল। তুমি/ নিজের ভেতরে স্বপ্ন-জাগানিয়া আলোড়ন/ টের পেয়ে তাকারে চৌদিকে বিস্ময়ের ঝলসানি-০লাগা চোখে।”

সেই বিস্ময় থেকে আরো আলো আবিষ্কারের নেশায় মেতে উঠলেন। লালনসহ কুষ্টিয়ার বাউলফকিরদের জীবনী রচনা ও সংগীত সংগ্রহ-সম্পাদনা করেন। মীর মশাররফের প্রামাণিক জীবনী প্রণয়নের পাশাপাশি দুর্লভ গ্রন্থ উদ্ধার ও সম্পাদনা করেন। বাংলা একাডেমির জীবনী-গ্রন্থমালার প্রধান লেখক তিনি। রবীন্দ্র-নজরুলের জীবনীর তথ্য-উপাদান সংগ্রহ করেছেন-পত্রাবলি প্রকাশ করেছেন।

পত্রাবলি সম্পাদনা করেছেন তিরিশ-চল্লিশের কবি-লেখকদের। ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’-এর কার্যবিবরণীর মতো দুর্লভ আরো দস্তাবেজ পাঠকের কাছে পেশ করেছেন। তাঁর নেওয়া সাক্ষাৎকারমূলক গ্রন্থগুলোও এসব কাজের পরিপূরক; সেগুলো যেমন তথ্যে পরিপূর্ণ তেমনি পাঠে উপভোগ্য।

রচনাশৈলীতে সেই সৃজনশীল সাহিত্যসত্তার প্রভাব থাকে বলে তা উপস্থাপনায় মনোহারি হয় ও পাঠে স্বাদুতা লাভ করা যায়। সাহিত্যইতিহাসের শিক্ষার্থী তো বটেই, সৃজনশীল লেখকেরাও তাঁর এসব কর্মের সাথে পরিচিত হয়ে প্রাণিত হন। যেমন, তাঁর সম্পাদিত ‘লালন স্মারকগ্রন্থ’ পাঠের প্রেরণায় অন্নদাশঙ্কর রায় লিখলেন ‘লালন ও তাঁর গান’ নামের গ্রন্থটি। তাঁর ‘লালন সাইয়ের সন্ধানে’ পড়ে ও তাঁর সাথে আলাপের পর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখলেন ‘মনের মানুষ’ নামের বিখ্যাত উপন্যাস।

নাচের মানুষ, নবতীপর বৃদ্ধা, অসমীয় দেবযানী চলিহা তাঁর কাছে লালন-বাউল বিষয়ে জানার পর লালনের গানের অসমীয় অনুবাদগ্রন্থ বের করলেন। এরকম কতো উদারহরণ চয়ন করা যায়, আবার তার কয়েকগুণ নমুনা হয়তো তালিকাভুক্ত করাই যাবে না। কারণ, আবুল আহসানের গবেষণা-প্রবন্ধ পাঠ করে কতো অসংখ্য মানুষই না প্রতিদিন প্রাণিত হচ্ছেন, নতুন তথ্যে সমৃদ্ধ হচ্ছেন, দিশা লাভ করছেন। একজন গবেষক-প্রাবন্ধিকের সার্থকতা এখানেই।

আমাদের দুর্ভাবনা বয়স হয়েছে আবুল আহসান চৌধুরীর, মাঝেমধ্যে তাঁর অসুস্থতার সংবাদও পাই। আমাদের সৌভাগ্য, তিনি বয়স ও অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে সক্রিয় আছেন এই পঁয়ষট্টি বছর বয়সেও। তিনি নীরোগ থাকুন, আয়ুষ্মান হোন, তাঁর লেখনির ধারা চলমান থাকুক এই কামনা আজ তাঁর জন্মদিবসের শুভলগ্নে।

মাসুদ রহমান : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, কুষ্টিয়া সরকারি মহিলা কলেজ, কুষ্টিয়া।
email: masud.kush.bd@gmail.com

 
.

Best Electronics Products



আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad