বিমল গুহর কবিতা এবং অনুভবের অন্তর্লীনতা   

ঢাকা, শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ | ১ পৌষ ১৪২৪

বিমল গুহর কবিতা এবং অনুভবের অন্তর্লীনতা   

ড. সৌমিত্র শেখর ১০:১৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৬, ২০১৭

print
বিমল গুহর কবিতা এবং অনুভবের অন্তর্লীনতা   

মানবিক অভিব্যক্তি প্রকাশের প্রধান অবলম্বন কবিতা; অন্তত বিমল গুহ তা-ই মনে করেন। ‘নিকাংজিদ তকিদা’র ভূমিকায় তিনি লিখেছেন (১লা ফেব্রুয়ারি, ২০০১) : ‘এখন কবিতা লিখতেই হবে এমন একটা মানসিক অবস্থানে এসে গেছি, তা না হলে মনোবেদনায় ডুকরে কেঁদে ওঠা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। কবিতা এখন হাসিকান্না, ক্রোধ, প্রতিবাদ, ঘৃণা কিংবা ভালোবাসা প্রকাশের প্রধান অবলম্বন; যেনো কবিতার প্রলম্বিত এক মানব-অধ্যায় আমি রচনা করে চলেছি।’বলতেই হয়, এই রচনার সূত্রপাত সত্তরের দশক থেকে; যদিও বিমল গুহর প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে, ‘অহংকার তোমার শব্দ’শিরোনামে।

.

এরপর থেকে আজ অবধি, কবির ৫০তম বর্ষপূর্তির প্রাক্কাল পর্যন্ত, সব মিলিয়ে বেরিয়েছে তাঁর কবিতার আটটি গ্রন্থ এবং ইতিমধ্যেই তিনি জানান দিতে পেরেছেন কবি হিসেবে নিজের অবস্থান। বিমল গুহর কাব্যগ্রন্থাবলির তালিকাটি এরকম: ১. অহংকার, তোমার শব্দ (১৯৮২), ২. সাঁকো পার হলে খোলাপথ (১৯৮৫), ৩. স্বপ্নে জ্বলে শর্তহীন ভোর (১৯৮৬), ৪. বিমল গুহের ভালোবাসার কবিতা (১৯৮৯), ৫. নষ্ট মানুষ ও অন্যান্য কবিতা (১৯৯৫), ৬. প্রতিবাদী শব্দের মিছিল (২০০০), ৭. নির্বাচিত কবিতা (২০০১), ৮. পোয়েট্রি (নির্বাচিতহ কবিতায় ইংরেজি অনুবাদ) (১৯৮৯)। তালিকা থেকে স্পষ্ট, বিমল গুহর কবিতার প্রকাশিত মৌলিক গ্রন্থের সংখ্যা, এ পর্যন্ত ছয়। বর্তমান বিবেচনায় এগুলোই হবে প্রধান অবলম্বন।

ক.
বাংলাদেশের বাংলা কবিতার ক্ষেত্রেই শুধু নয়, ক্ষদ্র জাতিগোষ্ঠীর অন্যান্য ভাষাতেও যে উল্লেখ বা অনুল্লেখ্য কবিতা রচিত বা সৃষ্ট হয়েছে, তাতে সত্তরের দশক সময়গুণেই অতি বিস্তারী প্রভাবশীল। এর প্রধান কারণ ১৯৭১-এর স্বাধীনতা আন্দোলন ও অর্জন, স্বপ্ন জাগানিয়া মনের অভিব্যক্তি ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় মথিত- মনের মুখ থুবড়ে পড়া। অতি উচ্ছ্বাস এবং আঘাত এই দুই চরমের সমন্বয় দেখা যায় এই দশকে। বাঙালি কবিদের এই দশক স্পর্শ করে ঘটনা ও সম্ভাবনা প্রভাব ফেলে ব্যাপকভাবে।

অমিয় চক্রবর্তী কবিতায় লেখেন: ‘বাংলাদেশ অনন্ত অক্ষত মূর্তি জাগে।’তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় রচনা করেন ‘১৯৭১’নামের উপন্যাস। আবার ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্নদাশঙ্কর রায় কবিতায় উচ্চারণ করেন; ‘বাংলাদেশ! বাংলাদেশ! থেকো নাকো নীরব দর্শক/ ধিক্কারে মুখর হও, হাত ধুয়ে এড়াও নরক।’ এরকম একটি দশকে কাব্য রচনা শুরু করে বিমল গুহ যথেষ্ট ব্যতিক্রম তাঁর সময় থেকে। অবশ্য তিনিও বলেছেন উচ্চকণ্ঠে :

আমরা মিলেছি এসে সত্তর দশকে কাকলিমুখর

নবীন উজ্জ্বল কবিকুল এক সাথে, কঙ্কাল সময় থেকে

আমরা এনেছি তুলে সোনালি ফসল

উত্তোলিত হাতের মুঠোয় জোড়া জোড়া রক্ত গোলাপ।’

[সত্তর দশক, নষ্ট মানুষ ও অন্যান্য কবিতা]

যে ফসল তুলে আনার কথা ব্যক্ত হয়েছে, বিমল গুহর অবস্থান এর অনুকূলে সর্বদাই, সন্দেহ নেই। কিন্তু ১৯৮২ থেকে ২০০১ এই বিশ বছরে গ্রন্থভুক্ত হয়েছে যে কবিতাগুলো, লক্ষ করলে দেখা যাবে, বিষয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তি থেকে নৈর্ব্যক্তিক তিনি প্রায়শ। স্বদেশ প্রেম, বর্ণবাদ বিরোধিতা, সমকালের খণ্ডবিখণ্ড ছবিও কবিতায় তিনি ধারণ করেছেন। আবার কবিকল্পনায় সংরাগ, অনুভবের তীব্রতা, আত্মদ্বন্দ্বও তাঁর কবিতায় লক্ষণীয়। তবে বিমল গুহর প্রথম কাব্যগ্রন্থ অহংকার, তোমার শব্দ মূলত প্রেমপ্রধান। উল্লেখ আছে, এর কবিতাগুলো ১৯৭২ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে রচিত। যদি তা-ই হয়, তবে মানতেই হবে, সময়ের অতিরাগ এবং অতিবিরাগ থেকে মুক্ত তিনি; অথবা ওই কাব্যগ্রন্থের সময়কে যথাযথভাবে ধারণ করা সম্ভব হয়নি ‘প্রলম্বিত এ মানব-অধ্যায়’রচয়িতা এই কবির পক্ষে। সংশয়টি মেনে নিয়েই বিমল গুহর কবিতা-বিচার করতে হয়।

খ.
স্বদেশ প্রেম সত্তরের কবি সবার মধ্যে যেমন পাওয়া যায়, বিমল গুহরও তেমনি আছে। এরকম দুটো কবিতা ‘স্বদেশের দিকে মুখ’ ও ‘তোমার ভুবনে’। প্রথমটিতে বাংলার শ্বাশত রূপ ও নিজের বিমুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন বিমল গুহ। দ্বিতীয়টিতে ব্যক্ত হয়েছে প্রত্যয়, স্বদেশকে সাজাবার কল্পনা! যে দেশ বারবার লুণ্ঠিত হয় অপহারকের হাতে, মে দেশে নবীন সাহসে অগ্রবর্তী হতে চান তিনি :

‘ইচ্ছে করে চোখ তেকে ক্লান্তির জড়তা মুছে

হেঁটে চলি নবীন সাহসে

দশ দিক দ্বিখণ্ডিত করে ভেঙে ফেলি হিংসার আকাশ

তোমার ভুবনে, বাংলাদেশ।’

                         [তোমার ভুবনে: স্বপ্নে জ্বলে শর্তহীন ভোর]

এই স্বদেশপ্রিয়তা পরবর্তীকালে তাঁকে সময়সচেতন করে তোলে। প্রথম কাব্যগ্রন্থে প্রেমনির্ভরতা ছাড়া স্বাধীনতাপ্রাপ্তি, পঁচাত্তরের মধ্য আগস্টের ঘটনাবলি কিংবা ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ সামরিক শাসনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বিষয়ে বিমল গুহ যেন বাদ পড়েননি। ১৯৮২ সালের সামরিক শাসনের বন্ধ্যা সময় উঠে আসে তাঁর কবিতায়; তবে তা কয়েক বছর বাদে:

 ‘এ কেমন বন্ধন মানুষের!

এ কি তবে গ্রিসের নিয়তি

অনিবার্য ঘটে যেতে হবে!

মানবতা তুমি আজ কোন পথে যাবে

এই দিনে কাকে দেবো বিশ্বাসের তৃণ?

এ রকম পারিপার্শ্বিকতায় কোনো স্বস্তি নেই।’

          [কোন স্বস্তি নেই : সাঁকো পার হলে খোলাপথ]

গ.
গ্রিক নিয়তিবাদের সাযুজ্যে দুর্বিষহ সমকাল যদিও এখানে উল্লেখিত, ‘যে কোন মুহূর্তে’ কিংবা ‘অঙ্গরাজ্যে শত্রুসেনা’কবিতায় সরাসরিই ব্যক্ত মিছিলে চলন্ত ট্রাক তুলে ছাত্রহত্যা বিংবা বাংলাদেশি রাজনীতির তৎকালীন ছলনা। এরশাদের পতন যে গণ-আন্দোলনের মধ্যে হয়, ১৯৯০ সালের সেই মানবীয় মহাপ্লাবনকালে বিমল গুহ নির্লিপ্ত নন। তিনি লেখেন :     

‘আবার আড়মোড়া কেটে দুপায়ে দাঁড়ায়

বাংলাদেশ সদর রাস্তায়

যুব উল্লাসে হাতছানি দিয়ে ডাকে

আগামীর পৃথিবীকে।

গণতন্ত্রের উত্তাল তরঙ্গে

বাংলাদেশ হেঁটে চলে নিরিবিলি গঞ্জে ও শহরে

কপালের শিরা উপশিরায় দগদগ করে গণতন্ত্রের স্লোগান।’

[উনিশ শ নব্বই : নস্ট মানুষ ও অন্যান্য কবিতা]

ঘ.
গণতন্ত্রকামী বাংলাদেশের জন্য আকুল কামনা ব্যক্ত যে কবির কবিতায়, লক্ষ করা যায়, সময় এগিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অনুভূতিকে সমকাল স্পর্শ করে এবং কবিতায় তা প্রতিফলিত হয় আগের তুলনায় অনেক বেশি। এ কারণে প্রেমজ উচ্চারণসমেত অহংকার, তোমার শব্দ দিয়ে যে কবির কাব্যগ্রন্থের নামকরণ আরম্ভ হয়, ১৯৯৫ থেকে ২০০০ সালে লেখা কবিতা নিয়ে তাঁরই বের হয় প্রতিবাদী শব্দের মিছিল (২০০০) নামে কবিতার বই। এ সময়ের কবিতাগুলোতে বিমল গুহ প্রায়শ বিক্ষুব্ধ বিদ্রোহ ভাবাপন্নও বটে। প্রতিক্রিয়াপন্থিদের দ্বারা বাংলাদেশের আরেকজন কবি যখন আক্রান্ত হন, ওই আততায়ী সমকালের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার। শামসুর রাহমানকে কুঠার হাতে আক্রমণ করার প্রতিক্রিয়ায় তাই তিনি রচনা করেন :

‘রক্তলোলুপ দৃষ্টি মেলে ধরে আকাশের দিকে, হাঁটে

অন্ধ বাদুড়ের মতো জন্মান্ধ পাতকী, 

পৃথিবীর প্রান্ত থেকে ঘোরে, অনায়াসে

রক্তচোষা এই প্রাণিকুল, নিরালোয় চোখ বুজে

অন্ধকারে বোনে গোর মাকড়সায় জাল।

কলমকে বড় ভয়, কলম ওদের কাছে চকচকে

চাইনিজ কুড়ালের চেয়ে শক্তিমান, তারা জানে

 অন্ধকার পথ ভিন্ন অন্য পথে বাদুড়ের গমন নিষেধ।’

             [প্রতিবাদী শব্দের মিছিল : প্রতিবাদী শব্দের মিছিল]

এখানে অজ্ঞানতার বিরুদ্ধে যুক্তি, অন্ধত্বের বিরুদ্ধে আলোর কথন আছে, আছে প্রতিবাদ! বিমল গুহ যেন আগের তুলনায় অনেক বেশি সমকাল-বিম্বিতের পক্ষে কলম ধরেন। তাই দেখা যায়, প্রথম কাব্যগ্রন্থে ‘তুমি মহাশ্বেতা’ বলে যে ‘আলোকবর্তিকা’ তিনি জ্বালিয়েছিলেন, ‘প্রতিবাদী শব্দের মিছিলে’ তার সমর্পণ। যুক্তিনির্ভরতার এই ধারাতেই তিনি বিরোধিতা করেন আফ্রিকার বর্ণবাদের। তাঁর প্রত্যাশা :

‘প্রবল বর্ষণে সব হিংসা ও বিদ্বেষ মুছে গেলে

মানুষ নামের সেই শব্দ থেকে

 মুছে যাবে হিংস্র জড়তা

আমরাও অপেক্ষায় আছি

বর্ণবাদী মানুষেণর পাংশুটে এই গিট

খুলে যাবে পৃথিবীর যৌথ ঘৃণায়।’

           [বর্ণবাদী পাংশুটে গিট, স্বপ্নে জ্বলে শর্তহীন ভোর]

ঙ.
আন্তর্জাতিক এই দৃষ্টিভঙ্গি তিনি লালন করেন সব সময়ই। হয়তো সে কারণেই নেলসন মেন্ডেলার কারামুক্তি উপলক্ষে বিমল গুহ আবার একই বিষয় নিয়ে লিখেন কবিতা। তবে তখন তিনি আরো অগ্রবর্তী দৃষ্টির আলোকে সমস্যা বিশ্লেষণ করেন এবং তাই বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সাযুজ্য খোঁজেন বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের চেতনায়। তিনি লেখেন,

বিমল গুহর কবি-কল্পনায় যেমন বোধ ও বুদ্ধির সমন্বয় অনুভব করা যায়, তেমনি সাম্প্রতিক অনুষঙ্গ ব্যবহার কবিতার মেজাজ বদলের ক্ষেত্রে তাঁর প্রয়াসও আমাদের দৃষ্টি এড়ায় না। সত্তরের কবি হলেও বিমল গুহ যে ওই দশকের চড়াতেই আটকে নেই তা বোঝা যায়, যখন তিনি কবিতায় ব্যবহার করেন বর্তমানকালের যন্ত্র এবং যন্ত্রানুভব।

প্রতিবাদী শব্দের মিছিল গ্রন্থের কয়েকটি কবিতা পাঠ করে এই প্রতীতি দৃঢ়তর হয় যে, বিমল গুহ আধুনিক কবির সর্বময় বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছেন। তিনি যখন কবিতায় কম্পিউটার, স্ক্রিণ, ওয়াই-টু-কে, ইন্টারনেট, ই-মেইল, সিডি-রম ইত্যাদির উল্লেখ করেন, নব্বই দশকের কবিগণ মেজাজের বিচারে বিমল গুহকে তখন সমকালেরই ভাবেন হয়তো। বিমল গুহ যন্ত্রসভ্যতাকে ব্যঙ্গ করেছেন এটা তাঁর বিশ্বাসের প্রতিফলন। কিন্তু কবিতার শরীরে আধুনিক যন্ত্রনাম যে তিনি স্থাপন করলেন এই স্বীকার তাঁকে সময়ের বহমানতারসঙ্গেই এগিয়ে নিয়ে আসে। তাই যাঁর মাথায় এক দিন শয়তান চেপেছিলো, তার মস্তকে তখন খেলা করে বিজ্ঞানের আবিষ্কার

‘কীভাবে কী হয়ে যায়। মগজের কোষে

খেলা করে শতাব্দীর ক্ষুদ্রতিক্ষুদ্র অনুজীব,

ঝিম ধরে বসে আছি একাকী সন্ধ্যায়

আকাশ বাতাস তোলপাড় করে

হাওয়া উড়ে যায় কানের পর্দা কেঁপে ওঠে,

মগজের কোষ থেকে কোষে ছুটোছুটি করে

বিজ্ঞানের অণু, ইন্টারনেট, ই-মেইল, সিডি-রম

মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অবধি

বৈদ্যুতিক আকর্ষণ হয়।’

[ছায়াপিণ্ড: প্রতিবাদী শব্দের মিছিল]

বিমলগুহর কবিতায় বিষয় ও অনুভবের নতুনত্ব এবং বাঁক ফেরা কবি হিসেবে তাঁর ক্রম-অগ্রগামিতার কথাই জানান দেয়।

চ.
বিমল গুহর কবিতায় উল্লেখযোগ্য বহু গুণের পরিচয় যেমন লাভ করা যায়, তেমনি কোথাও কোথাও দুর্বলতা চোখে পড়ে। কবিতা বিবরণ করতে চায় না। বিমল গুহর কবিস্বভাবে বিবৃতি-প্রদান রীতিমতো বিরুদ্ধ কর্ম। তিনি যখন এটা অতিক্রম করে বিবরণ দিতে চান কবিতায়, তখন কাব্যভাষা গতি হারায়। উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হলো তিনটি পঙ্ক্তি :

‘এই সেদিনও প্রাক-স্বাধীনতার আমলে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে)

বাংলার মানুষ যেই শিঙ্গারে ফুৎকার দিলো

তখনই লেঙ্গুর তুলে পালালো হেলমেটপরা সেনার বহর।’

[প্রতীক : সাঁকো পার হলে খোলাপথ]

কবিতায় এই বিবৃতিধর্মী উপস্থাপনার সঙ্গে কোনো কোনো কবিতায় ক্রিয়াপদের পৌনঃপুনিক ব্যবহারের ফলে এর গাম্ভীর্য হারিয়েছে। কোথাও কোথাও এসব শুধু শাব্দিক কলরবে পরিণত হওয়ায় কবিতা প্রার্থিত আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনি। যেমন :

‘হারাতে হারতে তুমি নতুন পাওয়ার জন্যে ছুটে যাবে একা,

ছুটতে ছুটতে যাবে, যেমন ছুটতে ছুটতে যায় নদী

ছুটতে ছুটতে মিশে অন্য এক স্রোতের ধারায়।’

[হারিয়ে পাওয়া সহজ নয় : স্বপ্নে জ্বলে শর্তহীন ভোর]

এ প্রসঙ্গে ‘বিলাস’ কবিতায় ব্যবহৃত একই বিশেষণ ও ক্রিয়াপদের বহু ব্যবহারের কথাও বলা যায়। বিমল গুহর কবিতায় উপস্থাপনাগত এই দুর্বলতার পাশাপাশি বড়ো কবিদের অনাত্মস্থ কিছু কাব্য-উপাদানের পরিচয় পাওয়া সম্ভব। একজন কবি অগ্রজদের থেকে রস গ্রহণ করতেই পারেন। মাইকেল মিল্টন থেকে, রবীন্দ্রনাথ কালিদাস থেকে, তিরিশের কবিগণ পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের বিভিন্ন অগ্রজ সাহিত্যিকদের কাছ থেকে রস গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু পড়লে বোঝা যায়, ও সবই আত্তীকৃত। বিমল গুহর যেন কোথাও কোথাও আত্তীকরণে বিঘ্ন ঘটেছে। নিচে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে :

১.‘ শেষ বিকেলের রোদ সমান্তরাল শুয়ে আছে সদর রাস্তায়।’

[লিফলেট বোঝাই ট্রাক : সাঁকো পার হলে খোলাপথ]

২. ‘কত দূর নিয়ে যাবে আর? কী দুঃসহ

সময় যাপন নিশিদিন,...

[কত দূরে নিয়ে যারে আর : প্রতিবাদী শব্দের মিছিল]

৩. ‘একটি কথার থরোথরো দ্বিধা

তোমার লাজুক ঠোঁটে বার বার কেঁপে উঠেছিলো ,

বলেছিলে ভালোবাসি।’

 [যাই : সাঁকো পার হলে খোলাপথ]

৪. ‘কে তুমি শব্দের বুকে বিঁধে দিয়ে দৃশ্যমান সূঁচ

শরীর রক্তাক্ত করো হাই তোলো আড়ামোড়া কেটে,

হো-হো হাসি অবজ্ঞায় অনুজ্জ্বল চোখে দাও এঁটে

রঙিন চশমা একা অন্ধকারে? অপয়া অশুচ

স্বপ্নে কিংবা তন্দ্রাচ্ছন্ন মোহে কি বিভোর ছিলে?

[সমালোচকের প্রতি : স্বপ্নে জ্বলে শর্তহীন ভোর]

উল্লিখিত উদ্ধৃতিগুলোর প্রথমটি পড়তে গিয়ে পাঠকের মনে পড়া অস্বাভাবিক নয় টি এস এলিয়টের বিখ্যাত সেই কবিতা ‘লভ্ সঙ্ অব প্রুফ্রক’; যার প্রথম দিকটা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় : ‘চলো যাই দুজনায়,/ যেখানে সন্ধ্যা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে/ আকাশের অপারেশন টেবিলে’/ দ্বিতীয় উদ্ধৃতিতে বিমল গুহ যখন ‘কত দূরে নিয়ে আর? বলে বিস্মিতপ্রায়, তখন পাঠকের মনে পড়তেই পারে রবীন্দ্রনাথের ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’; যেখানে তিনি বলেছেন : আর র কত দূরে নিয়ে যাবে মোরে হে সুন্দরী?’ টি এস এলিয়ট বা রবীন্দ্রনাথকে যদি-বা মনে পড়ে একপু দেরিদে, উল্লিখিত তৃতীয় উদ্ধৃতিটি পাঠ করলে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের বিখ্যাত ‘শাশ্বতী’ কবিতা তাৎক্ষণিকভাবে স্মরণে আসবে পাঠকদের। আর জীবনানন্দ দাশের ‘সমারূঢ়’ কবিতার ঢঙেই রচিত হয়েছে উল্লিখিত চতুর্থ উদ্ধৃতির পুরো কবিতা শিরোনামেও সে পরিচয় মিলবে। এখানে কোনো নতুনত্ব নেই। নতুনত্ব না থাকলে অনুজ কবির কৃতিত্ব কোথায়?

এতদ্সত্তে¡ও বলতে হয়, বিমল গুহ প্রকাশিত তাঁর কাব্যগ্রন্থসমূহে নিজের কাব্যশক্তির পরিচয় দিয়েছেন যথেষ্ট। তাঁর বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থ পাঠ করে এই প্রতীতি দৃঢ়তর হয় যে, সমকাল ধারণ করে প্রতিবাদ, বিদ্রোহ বা বিক্ষোভের কবিতা রচনার চাইতে আত্মলীনতায় একান্ত বোধের প্রকাশক কবিতাসমূহে বিমল গুহ অপেক্ষাকৃত অধিক স্বতঃস্ফূর্ত এবং সফল।

কবিতায় স্নিগ্ধতা ও সৌন্দর্য সৃষ্টিতে প্রথম থেকে তিনি যে পথ ও বিষয় গ্রহণ ও নির্বাচন করেছিলেন, উত্তরকালে সে থেকে কখনো দূরে সরে যাওয়া, আমার মতে, তাঁর আন্তঃমনে লালিত কবি ধর্মের বিরোধী হয়েছে।

বিমল গুহর বিষয় এসেছে কবিতা রচনার প্রয়োজনে, বিষয়ের জন্য কবিতা নয়। যেখানে তিনি কবিতায় বিষয়কে আরোপ করেননি সেখানেই তিনি সফল। আর এই সফলতাই কবি বিমল গুহর ক্ষেত্রে সত্য। নরম কাব্যভাষা, বোধের ছন্দ ও অনুভবের তীব্রতা তাঁর কবিতার প্রধান গুণ।

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad