#জুতাপালিশ-ওয়ালার গল্প #মিসকিন-ভালোবাসা
Back to Top

ঢাকা, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০ | ১৬ চৈত্র ১৪২৬

#জুতাপালিশ-ওয়ালার গল্প #মিসকিন-ভালোবাসা

খাজা রহমান ৩:৩৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২০

#জুতাপালিশ-ওয়ালার গল্প #মিসকিন-ভালোবাসা

হাইওয়েতে হঠাৎ হার্ড ব্রেক করে থামলো একটি ঝকঝকে মার্সিডিজ। কালো সানগ্লাসে এক সৌদি শেখ গাড়ি থেকে নেমে দেখে তার গাড়ির নীচে চাপা পড়েছে একটি বিড়াল। রক্তাক্ত দেহটি পড়ে আছে রাস্তায়।

ঝামেলা এড়াতে আশেপাশে তাকাতেই দেখে একটু দূরে পেট্রোল পাম্পে ঝাড়ু দিচ্ছে মাঝবয়সী এক লোক। ইশারায় লোকটিকে ডেকে আরবীতে অনেকটা ধমকের সুরে বলে যে সে মৃত বিড়ালটিকে সরিয়ে রাস্তাটা পরিষ্কার করে দিতে পারবে কিনা!

‘পারবো‘ বলে বিড়ালটিকে দ্রুত একটা ব্যাগে ভরে আশপাশ পরিষ্কার করে দেয় বাংলাদেশের রুপগঞ্জের বাতেন মিয়া। সৌদিতে ৩ বছরের প্রবাস জীবনে এটাই তার নিয়তি। শেখের বামহাতের উপর আয়েশে বসা বাজপাখিটিও ক্রুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বাতেনকে শাসায়। ৫০ রিয়াল বখশিশ পেয়ে খুশি হয় বাতেন।

একবার বেখেয়ালে পায়ে ঝাড়ু লেগেছিল বলে এক যুবক শেখ কি মারটাই না মেরেছিল বাতেনকে! “দোহাই আল্লাহ্‌র আর মেরো না, আমিও মুসলিম” - বলে পায়ে ধরে ক্ষমা-ভিক্ষা চাইলেও কিছুই শোনেনি যুবক ও তার বন্ধুরা। “মিসকিন!! কি করলি এইটা!!”- বলে এলোপাথারি কিল-ঘুষিতে মুহূর্তেই রক্তাক্ত করে ফেলেছিল তাকে। শরীরে প্রচণ্ড ব্যাথা আর ১০২ ডিগ্রি জ্বর নিয়েও পরদিন কাজে গিয়ে শুধু গোঙানির মতো শব্দ করেছে। কষ্ট পাবে বলে ফোনে তার বউকে বুঝতে দেয়নি। ‘ও কিছুনা, সামান্য জ্বর’ বলে এড়িয়ে গিয়েছিল।

হঠাৎ প্রচণ্ড জিদ চেপে যায় বাতেনের। জালিম শেখদেরকে একটা উচিত শিক্ষা দিতে চায় সে। মৃত বিড়ালটিকে ব্যাগ থেকে বের করে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয় পরিপাটি করে সাজানো এক বাড়ির সদর দরজায়। এরপর দূরে দাঁড়িয়ে রাস্তা ঝাড়ুর অভিনয়ে অপেক্ষা করে কখন বাড়ি থেকে কেউ বের হবে!

কিছুক্ষণ পর বাড়ির মালিক দরজা খুলে দেখে ‘মাছি ভনভন’ অবস্থা। নাকে রুমাল চেপে গজগজ করতে করতে আশেপাশে তাকিয়ে সে বাতেনকে ডেকে ‘আপদ‘ পরিষ্কার করতে বলে। সুযোগ বুঝে ১০০ রিয়াল দাবী করে বসে বাতেন। শেষে ৮০ রিয়ালে রফা হয়। মনে মনে হাসে আর মজা পায় বাতেন।

পরদিন সে বিড়ালটিকে ফেলে একটা বাড়ির বাগানে, এরপর পার্ক করা একটা দামী গাড়ির পাশে, তারপর একটা রেস্তোরাঁর ঠিক সামনে। মৃত বিড়ালটা ধরার অনুপযুক্ত হয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত এভাবে চলতেই থাকে। ২ দিনেই বাতেনের পকেটে ৪০০ রিয়াল বখশিশ জমা হয়।

কিন্তু ততক্ষনে তার সম্বিৎ ফিরে এসেছে। লোক ঠকানো যে মহাপাপ!! কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারে না বাতেন। নিজেকে তার পাশে পড়ে থাকা ওই পচা-গলা বিড়ালটার মতোই মনে হয়। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সেই নাকি ঘুরছে দেশের চাকা, বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ গুণে দাঁতাল হাসির মন্ত্রী-আমলার চোখে তারা শুধুই ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা‘, স্যুট-টাই পরা নিন্দুকের চোখে তারা শুধুই একেকজন কামলা, স্বদেশপ্রেমহীন শ্রমিক বা জুতাপালিশ-ওয়ালা প্রবাসী, আত্মীয়-স্বজনদের চোখে তারা কেবলই ‘টাকা কামানোর মেশিন‘ মাত্র।

এগুলো শুনতে শুনতে বাতেনের এখন আর খারাপ লাগে না। কষ্ট একটাই, তার মতো মিসকিনের ভাগ্যের চাকা কোনদিন ঘোরে না। কাছে পায়না সে দেশে ফেলে রেখে আসা আদরের ৪ বছরের মেয়েটিকে, তার সিঁদুররাঙা লাল টুকটুকে বউকে।

লোক ঠকানোর ক্ষণিকের মোহভঙ্গে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে রেমিট্যান্সের পাগলা ঘোড়ার চালক বাতেন। গভীর রাতের তার সেই চিৎকার জেদ্দা শহরের ইট-পাথরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে একসময় মিলিয়ে যায়। দেশে তখন শান্তির ঘুম শেষে আড়মোড়া ভেঙ্গে চোখ মেলছে বাতেনের পুরো পরিবার।

চড়া সুদে ৪ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে ৩ বছর আগে ৬০০ রিয়াল বেতনে কাজে এসেছিল বাতেন। থাকা-খাওয়ার ৩০০ রিয়াল আর আদম ব্যাপারীর টাকা শোধের পর বাকীটা সে পাঠিয়ে দেয় দেশে, যার জন্য চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকে পরিবারের ৮ জন সদস্য। অথচ দেশে বসে দেশেরই লক্ষ-কোটি টাকা লুটপাট করার মতো "শিক্ষিত আর স্মার্ট" হতে পারলে তাকে ভিটা-মাটি বিক্রি করে ভাগ্যান্বেষণে দেশান্তরি হতে হতো না। ব্যাংক থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা মেরে ঋণ-খেলাপি হলে ‘মিসকিন‘ ডাকা তো দুরের কথা, বিদেশে তাকে ‘সেকেন্ড হোম‘ দিয়ে জামাই ডাকতো। দেশের দূতাবাসে বা বিমানবন্দরে নেমে সীমাহীন লাথি-গুতার বদলে জুটতো ভিআইপি আপ্যায়ন, সালাম-স্যালুটের সাথে কোক-পেপসি-মাখন।

অচেনা এই জেদ্দা শহরে ১০ জনে গাদাগাদির একটা ঘুপচি ঘরের সবাই রাতে ঘুমিয়ে গেলে টর্চলাইটের আলোয় বাতেন তার বউয়ের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে। খুব ইচ্ছে হয় একটা লাল জবাফুল বউয়ের খোপায় গুঁজিয়ে দিতে। চোখের পানি আলতো করে লেপে দেয় ছবিতে, বউয়ের ঠোঁটে। অনেক যত্ন করে নীল খামের পোস্টে ছবিগুলো দেশ থেকে পাঠিয়েছিল তার বউ।

পরদিন কাকডাকা ভোরে কাজে যাবার আগে ফোনে বউকে তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেয় বাতেন। দেশে ফিরে লেগুনা চালাবে, মাথায় চালের বস্তা টেনে ঋণের টাকা শোধ করবে, তবুও পরিবার ছেড়ে একা থাকবে না। খোদার কসম, তিন সত্যি। বউ-মেয়েকে লেগুনায় বসিয়ে গ্রামের পথে পাগলা-ছুটে গান ধরবে “চলে আমার ইঞ্জিন হাওয়ার বেগে উইড়া উইড়া“ আর হোটেলে বসে কড়া-ঝাল তরকারি দিয়ে পেট পুরে ভাত খাবে!! বাতেনের পাগলামিতে ফোনের অপর পাশে লাজুক হাসিতে আঁচলে মুখ লুকায় তার বউ।

একটা টিফিনবক্সে আগের রাতের একদলা আলুভর্তা, ২ টুকরো পিঁয়াজ-কাঁচামরিচ সাদা ভাতের উপর নিয়ে কোম্পানির বাসে কাজে রওনা হয় বাতেন। ঢুলুঢুলু চোখে বাসে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ বিকট শব্দে তার হাতের টিফিন বক্সটি ছিটকে যায়। মাথায় প্রচণ্ড চাপ অনুভব করে সে। তৃষ্ণায় বুকের ছাতিটা ফেটে যায় বাতেনের। মেয়ের মায়াভরা মুখটা স্পষ্ট দেখতে পায় সে! মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে ছোট্ট মেয়েটি আবৃতি করছে, “ছেলে ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো বর্গী এল দেশে....আর ক'টা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি।"

"আশহাদুআল্লাহ্‌ ইলাহা ইল্লাল্লাহু...সর্ব শক্তি দিয়ে পড়তে পড়তে বাতেনের দু'চোখ বন্ধ হয়ে আসে। ঘুমিয়ে যায় সে।

সন্ধ্যায় জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট কর্মকর্তার ফোনে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে বাতেনের পরিবারের, গগনবিদারী চিৎকারে কাঁদতে থাকে তার স্ত্রী। সরকারি কোম্পানিতে চাকুরীর নিয়মানুসারে বাতেনের লাশ সৌদিতেই কবর দিলে পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা অনুদান দেওয়া হবে। স্পষ্ট জানিয়ে দিতে হবে, পরিবার লাশ নিবে নাকি টাকা!!

টাকার পরিমান শুনে বাতেনের পরিবার লাশ নিতে নারাজ। “যে গেছে হ্যায় কি আর ফিরবো? লাশ দেশে আইন্ন্যা কি হইবো? বাতেনের মাইয়াডা বড় হইতাছে, ট্যাকাগুলান পাইলে মাইয়াডার বিয়া দেওনের সময় কামে লাগবো” - পরিবারের ভাষ্য। আড়ালে টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে কামড়া-কামড়ি শুরু হয় বাতেনের পরিবারে।

শুধু বাতেনের বউ তার প্রিয় মানুষটিকে ফিরিয়ে আনতে চায়, শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখতে চায়, যত্ন করে মাখাতে চায় আতর-সুরমা-চন্দন। কবর দিতে চায় বাতেনের নিজ হাতে লাগানো কৎবেল গাছের ছায়ায়। সদ্য বিধবার মিনমিনে প্রতিবাদ কেউই গায়ে মাখে না। বরং বাড়াবাড়ি করলে অত্যাচারের খড়গ নেমে আসবে বলে তাকে কড়াভাবে শাসানো হয়।

“মানুষটাই যখন আর বাইচ্চ্যা নাই, তখন অনুদানের ট্যাকা দিয়া কি হইবো??” – বলতে বলতে মেয়ের হাত ধরে রাস্তায় নামে বাতেনের অভিমানী স্ত্রী। চারিদিকে তখন শত শত যুগল ভালোবাসায় মত্ত, ভালোবাসা দিবসের উচ্ছ্বাসে ভাসছে, শহরের রাস্তায় চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে কোটি কোটি টাকার ফুল। একজন বাতেন হারিয়ে গেলে গণ্ডারের চামড়ার জ্যাকেট পড়া নিষ্ঠুর এই পৃথিবীর কারোরই কোন ক্ষতি হয়না। মরুর তপ্ত বুকে চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে যায় বাতেন, হারিয়ে ফেলে তার ভালোবাসার মানুষগুলোকে।

বাতেনের বউ তার সঙ্গে নেয়া ব্যাগটি শক্ত করে বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে, যাতে যত্ন করে গুছিয়ে নিয়েছে সৌদি থেকে ফেরত আসা সেই নীল খামভর্তি ছবিগুলো, বাতেনের ব্যবহার করা থালা-গ্লাস, চিরুনি, ক্যাসিও হাতঘড়ি, একটি জায়নামাজ, ক্ষয়ে যাওয়া একজোড়া স্যান্ডেল আর সেই মোবাইল ফোনটা।

হাঁটতে হাঁটতে বাতেনের অবুঝ মেয়েটি তার মায়ের কাছে বারবার জানতে চায়, “বলোনা মা, আমরা কি বাবাকে আনতে যাচ্ছি? চুপ করে আছো কেন, বলোনা মা“!!!

 

শিল্প ও সাহিত্য: আরও পড়ুন

আরও