কেঁচো সারের গ্রাম দাপনা, উদ্যেক্তা সবাই নারী

ঢাকা, শুক্রবার, ২৭ এপ্রিল ২০১৮ | ১৪ বৈশাখ ১৪২৫

কেঁচো সারের গ্রাম দাপনা, উদ্যেক্তা সবাই নারী

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি ৮:৫৮ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১১, ২০১৮

print
কেঁচো সারের গ্রাম দাপনা, উদ্যেক্তা সবাই নারী

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার দাপনা গ্রাম এখন কেঁচো আর কম্পোস্ট সারের গ্রামে পরিণত হয়েছে। শতভাগ বাড়িতে সার উৎপাদন হচ্ছে। গ্রামের শতাধিক পরিবার এখন আর রাসায়নিক সার ব্যবহার করে না। নিজেদের উৎপাদিত পরিবেশবান্ধব কম্পোস্ট সার দিয়েই জমিতে চাষাবাদ করছে। মাসে তারা ৫০ হাজার টাকার সার ও কেঁচো উৎপাদন করছে।

নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে এখানকার কম্পোস্ট সার সৌদি আরব, দুবাইসহ মধ্যপ্রচ্যের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হচ্ছে। আর এই কাজটি যারা করছে তারা সবাই গৃহিণী। বাড়ির প্রয়োজনীয় কাজের শেষে তারা বাড়তি কাজ হিসেবে এই কাজটি করছে। আর এই কাজে তাদের সহযোগিতা করেছেন জাপানভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড ও উপজেলা কৃষি অফিস।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলা থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার পূর্বের গ্রাম দাপনা। প্রত্যেকের বাড়িতেই ২ থেকে ৮টি পর্যন্ত গরু আছে। তারা তাদের গরুর গোবর কাজে লাগিয়ে সার তৈরি করছে। যে সার পরিবেশবান্ধব। এই গ্রামে শতভাগ বাড়িতে কম্পোস্ট প্লান্ট বানাতে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন রেবেকা ও সোনাভান নামের দুই গৃহবধূ।

তারা প্রথম পর্যায়ে হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ডের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহযোগিতায় এই কাজ শুরু করেন। এরপর সারা গ্রাম। প্রতি মাসে তারা প্রায় ৪০০ কেজি কম্পোস্ট ও প্রায় ১০ কেজি কেঁচো উৎপাদন করছে। এক কেজি কম্পোস্ট সার ১০ টাকা আর এক কেজি কেঁচো ১৫০০-১৮০০ টাকায় বিক্রি করছেন।
একই গ্রামের কৃষাণী শাহনাজ, সোনাভান, সুখজান, হাজেরা বেগম, আহরনসহ ৬০টি পরিবারের সকল গৃহিণী তাদের বাড়িতে কেউ মাটির রিং স্লাব, কেউবা পাকা করে কম্পোস্ট প্লান্ট তৈরি করেছে।

দেশের যশোর, চুয়াডাঙ্গা, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লার ব্যবসায়ীরা এখান থেকে ট্রাক ভরে সার ও কেঁচো কিনে নিয়ে গিয়ে পরে সেগুলো প্যাকেটিং করে মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে বিক্রি করছে। কেঁচো কম্পোস্ট সার বিশেষ করে ধান, পান চাষী, সবজি জাতীয় চাষাবাদে বেশি উপকার পাচ্ছে।

কৃষাণী সোনাভান বলেন, আমি এ পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার সার ও ১০ হাজার টাকার কেঁচো বিক্রি করেছি। কেঁচো কম্পোস্ট সার উৎপাদন করতে বেশি টাকা খরচ হয় না। দরকার আগ্রহ। গরুর গোবর, লতাপাতা, কলাগাছ আর কেঁচো এই দিয়েই প্রতি তিন মাস অন্তর সার উৎপাদন করা হয়।

এই সারের গুণগত মানও ভালো। যশোর মৃত্তিকা গবেষণা কেন্দ্রে তারা এ জৈব সার পরীক্ষা করে দেখেছেন বাজারের যেসব টিএসপি পাওয়া যায় তার মান ৪৫%, অন্যদিকে কম্পোস্ট সার বা অর্গানিক সারের মান ৮৫%(সার্বিক)।

শুধু তাই নয়, এই গ্রামের কৃষাণীরা সবাই মিলে একটি মহিলা সমবায় সমিতি করেছেন। সার বিক্রির একটি অংশ তারা সমবায় সমিতিতে জমা রাখেন। এই সমিতির বর্তমান মূলধন প্রায় ৩ লাখ টাকা। তারা ইতোমধ্যে সমিতির মাধ্যমে একটি পাওয়ার ট্রিলার, ২টি গরু কিনেছেন। আর নগদ টাকা সমিতির সদস্যদের মধ্যে ঋণ দিয়েছেন। এমনকি গ্রামের বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের তারা লেখাপড়ায় বিভিন্ন সময় সহযোগিতা করেন।

সফল কৃষাণী ও মহিলা সমিতির সভানেত্রী রেবেকা বেগম বলেন, আমাদের স্বপ্ন আর যেন কেউ রাসায়নিক সার ব্যবহার করে জমিগুলো নষ্ট না করে। আমরা সারা বাংলাদেশকে দেখিয়ে দিতে চাই নিজেদের তৈরি সার জমিতে ব্যবহার করেই স্বাবলম্বী হওয়া যায়।

তিনি আরো বলেন, আমাদের স্বামীরা আমাদের অনেক সহযোগিতা করেন। এই গ্রামের প্রত্যেক নারীর হাত খরচ, চিকিৎসার টাকা স্বামীদের কাছ থেকে নিতে হয় না। বরং আমরা আরো স্বামীদের টাকা দিই। আমাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা হল এই সারগুলো নিজেরাই প্যাকেটজাত করে মার্কেটে ছাড়া। এর জন্য প্যাকেটিং মেশিন দরকার এবং সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।

স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ডের প্রোগ্রাম অফিসার হাফিজুর রহমান জানান, এ গ্রামের বেশিরভাগ নারীর কেঁচো আর কম্পোস্ট সার তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তারা অন্য নারীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার জাহিদুল করিম জানান, কম্পোস্ট সার পরিবেশবান্ধব। এই সার জমিতে পরিমাণে বেশি লাগে তবে ফসল ভালো হয়। এই গ্রামের কৃষাণীরা যে নিজেদের উৎপাদিত সার জমিতে ব্যবহার করছে এটা ভালো উদ্যোগ।

এসএএস/বিএইচ/

 
.




আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad